আট মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক হামলা চালিয়েছে। গত জুনে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল প্রায় পুরোপুরি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্রের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে এবং ইসরায়েল সামরিক কমান্ডার, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও উৎপাদন কেন্দ্র এবং পারমাণবিক অবকাঠামোসহ বিস্তৃত কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যাপক যৌথ অভিযান চালায়। বছরের শুরুতে নিজেদের সরকারের হাতে বিক্ষোভকারীরা নির্মমভাবে দমন হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প “শাসন পরিবর্তন”-এর আহ্বান জানান। শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, দুই দেশের সামরিক বাহিনী ইরানজুড়ে শত শত স্থাপনায় হামলা চালায় এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করে। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিহত হন।
তবে এই সংঘাতের পরবর্তী ধাপগুলো গত বছরের হামলার তুলনায় অনেক বেশি জটিল। ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে পরিচিত আগের অভিযানটি ছিল সাহসী কিন্তু সীমিত; ইরান আগাম বার্তা দিয়ে কাতারে খালি করে দেওয়া একটি মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, স্থাপনাগুলো সামরিক পরিকল্পনাকারীদের পরিচিত, এবং দুই পক্ষই উত্তেজনা বৃদ্ধির চক্র এড়িয়ে চলে।
কিন্তু সাম্প্রতিক ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কার্যত একটি প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে। এখানে স্পষ্ট কোনো অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নেই, নেই উত্তেজনা কমানোর পরিষ্কার পথও। হামলার আগে ইরান প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, যা এখন তাকে কোণঠাসা অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে এবং সামগ্রিক ঝুঁকি বাড়িয়েছে। দুর্বল অবস্থাতেও শাসনব্যবস্থার হাতে উল্লেখযোগ্য প্রাণঘাতী সক্ষমতা রয়ে গেছে। গত জুনের পর থেকে তারা দ্রুতগতিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠন করছে বলে ইসরায়েলি সামরিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, স্বার্থ ও মিত্রদের দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে এবং আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের অবশিষ্ট অংশ সক্রিয় করতে পারে।
হামলার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে উদ্দেশ করে বলেন, “আমরা শেষ করলে তোমরাই সরকার দখল করো।” কিন্তু জনপ্রিয় বিদ্রোহের মাধ্যমে শাসন উৎখাতের পথ মোটেই সুস্পষ্ট নয়। বোমা অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে, সক্ষমতা দুর্বল করতে পারে, নেতৃত্ব সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারে না। ইরানি সমাজ নিরস্ত্র, বিভক্ত এবং অঞ্চলের সবচেয়ে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখোমুখি। দুর্বল হলেও শাসনের হাতে এখনো রয়েছে বিপ্লবী গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর মতো দমনযন্ত্র—যেগুলো এমন মুহূর্তের জন্যই নির্মিত।
প্রতিবাদের মোড়
ডিসেম্বরের শেষদিকে যখন বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামে, তখনই ট্রাম্প এই হামলার ইঙ্গিত দেন। শুরুতে জাতীয় মুদ্রার পতনে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ কেন্দ্রীভূত থাকলেও দ্রুত তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং শাসনের পতনের দাবিতে রূপ নেয়। এরপর শুরু হয় রক্তক্ষয়ী দমন অভিযান; কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়। ২ জানুয়ারি ট্রাম্প সতর্ক করেন যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র “প্রস্তুত” রয়েছে।
অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ ছিল বিবৃতি, নিন্দা ও নিষেধাজ্ঞায়। কিন্তু এবার ট্রাম্প সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উত্থাপন করেন। তাঁর প্রথম পদক্ষেপ ছিল অর্থনৈতিক—ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে বাণিজ্যকারীদের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং ইরানি ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ নেটওয়ার্ক ও শাসনকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা। এরপর তিনি ইন্টারনেট বন্ধ মোকাবিলায় ইলন মাস্ককে যুক্ত করেন এবং স্টারলিংক ইউনিট পাঠানোর উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে দমন-পীড়ন চললে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। সব মিলিয়ে তিনি ইরানিদের আহ্বান জানান, “প্রতিবাদ চালিয়ে যাও—প্রতিষ্ঠান দখল করো।”
তেহরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দেয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর যেকোনো হামলার জবাব বড় আকারে দেওয়া হবে এবং পুরো অঞ্চলে মার্কিন সেনা ও তাদের নিরাপত্তা অংশীদারদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
যদি ইরানের নেতৃত্ব ট্রাম্পকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থেকেও থাকে, তবে তারা আরও বেশি বিচলিত ছিল রাস্তায় ফুঁসে ওঠা জনরোষে। নির্মমতার পরিচিত ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তারা দ্রুত হাজারো মানুষকে হত্যা করে আন্দোলনের গতি থামায়। সামরিক প্রস্তুতির দৃশ্যমানতা না থাকায় ট্রাম্পের হুমকি উল্টো শাসনকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রণোদিত করতে পারে—যেকোনো মূল্যে, যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলজুড়ে বাহিনী মোতায়েনের আগেই।
উত্তেজনার বিস্তার
উত্তেজনা বাড়তে থাকলে আঞ্চলিক মিত্ররা ওয়াশিংটনকে তাড়াহুড়ো না করার অনুরোধ জানায়, কারণ ইরানের পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি তাদেরই নিতে হবে। জানুয়ারির মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলজুড়ে সামরিক শক্তি বাড়ায়—দুটি বিমানবাহী রণতরী ও বহু যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে, যা ইরাক যুদ্ধের পর এত বড় সমাবেশ দেখা যায়নি। ট্রাম্প তেহরানকে সতর্ক করে বলেন, জুনের চেয়েও “ভয়াবহ” হামলা আসতে পারে, যদি না তারা পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগসহ ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন ও আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধে সম্মত হয়।
ওমান ও সুইজারল্যান্ডে ফেব্রুয়ারিতে তিন দফা আলোচনা হলেও পারমাণবিক ছাড় ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে যায়। অ-পরমাণবিক বিষয়গুলো আলাদা করার ইরানের চেষ্টা ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা পূরণ করেনি।
তবু সংঘাতের দিকে অগ্রসর হওয়া গতি থামেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে কট্টরপন্থীরা যুদ্ধের পক্ষে সওয়াল করে। স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরান আবারও “অশুভ উচ্চাকাঙ্ক্ষা” অনুসরণ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
কিন্তু কোনো হুমকিই তাৎক্ষণিক ছিল না। আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার না দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নে বর্তমানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চলছে না, অস্ত্রমানের তো নয়ই। জুনের হামলায় ইরানের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানার সম্ভাবনা বহু বছরের দূরত্বে। তবু ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প হামলার অনুমোদন দেন।
টিকে থাকার লড়াই
ইরান যখন ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে, তাদের যুক্তি স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক আঘাত হতে পারে, বিশেষত তিনি সামরিক জড়িয়ে পড়া এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তেহরান হয়তো ধারণা করছে, ট্রাম্প দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে অনিচ্ছুক এবং সীমিত ও প্রদর্শনমূলক অভিযান পছন্দ করেন।
কিন্তু এটি ব্যয়বহুল ভুল হিসাব হতে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর থেকে ইরান বারবার নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেখেছে এবং প্রতিপক্ষের দৃঢ়তা কম করে দেখেছে। স্বল্পমেয়াদে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি এখনো প্রবল। যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার সম্ভাবনা কম, কারণ বড় জুয়া ব্যর্থ হয়েছে এমন চিত্র তারা এড়াতে চাইবে। আর বিদেশি হামলা জনগণকে একত্র করবে—এমন ধারণাও ভুল হতে পারে, কারণ শাসন নিজেই সদ্য হাজারো মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে।
যদি যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব হয় যে আকাশপথের হামলা ওপর থেকে কাজ শেষ করবে আর নিচে ইরানিরা তা সম্পূর্ণ করবে, তবে সেই হিসাবের পক্ষে সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক নজির নেই। বরং কল্পনা করা সহজ যে বিপ্লবী গার্ড আরও সরাসরি ক্ষমতা কুক্ষিগত করবে, অথবা শাসন উৎখাতে আগ্রহী ও তা রক্ষায় মরিয়া পক্ষগুলোর মধ্যে দীর্ঘ গৃহসংঘাত শুরু হবে।
আলি ভাইজ 



















