ইরানে যখন এই সপ্তাহান্তে বোমা পড়া শুরু হলো, তখন বিশ্বের বাকি অংশের মতো অধিকাংশ আমেরিকানও বিস্মিত হয়। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি জোরদার হচ্ছিল, কিন্তু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা তখনও চলমান ছিল। এমনকি মার্কিন সেনাবাহিনী হামলার প্রস্তুতি নিলেও ট্রাম্প প্রশাসন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য গোপন রাখে। জাতীয় পর্যায়ে প্রায় কোনো বিতর্ক হয়নি, মিত্রদের সঙ্গে ছিল অল্প আলোচনা, আর কংগ্রেসে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো ভোটই হয়নি। যুদ্ধ শুরুর দুদিন পরও প্রশাসন এটি কীভাবে শেষ হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট রূপরেখা দেয়নি। নির্ণায়ক শক্তি প্রয়োগের বদলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অগ্রাধিকার দিচ্ছেন নমনীয়তাকে। রেড সি থেকে ভেনেজুয়েলা পর্যন্ত তার বিভিন্ন হস্তক্ষেপে এই নতুন যুদ্ধধারা দৃশ্যমান—যা শক্তি প্রয়োগ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে উল্টে দেয়।
অনেক দিক থেকেই ট্রাম্পের শক্তি প্রয়োগের ধরনটি পাওয়েল নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় জেনারেল কলিন পাওয়েল যে নীতি প্রণয়ন করেন, তার মূল বক্তব্য ছিল—সব অহিংস উপায় ব্যর্থ হওয়ার পরই কেবল শক্তি প্রয়োগ করা উচিত। যুদ্ধ প্রয়োজন হলে তা হতে হবে স্পষ্ট লক্ষ্য, সুস্পষ্ট প্রস্থান কৌশল এবং জনসমর্থনসহ। শত্রুকে দ্রুত ও সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সব সম্পদ একত্রে ব্যবহার করতে হবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া এই শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, উচ্চ প্রাণহানি ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন এড়ানোর জন্য তৈরি হয়েছিল।
আফগানিস্তান ও ইরাকে ব্যর্থতা
২০০১ সালে আফগানিস্তান এবং ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ছিল এই নীতির বড় পরীক্ষা। তালেবান ও সাদ্দাম হোসেনের প্রতি চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করার পরই যুদ্ধ শুরু হয়। কংগ্রেসের অনুমোদনও নেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—আল-কায়েদার আশ্রয়স্থল ধ্বংস করা এবং ইরাককে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থেকে মুক্ত করা। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছুই এগোয়নি। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়াতে গিয়েই যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে। বিপুল ব্যয়, প্রাণহানি ও বিভাজন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপকে গত দুই দশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন বিপরীত পথে হাঁটতে শুরু করে। তারা মনে করে, নির্দিষ্ট ও কঠোর নীতির বদলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অধিক কার্যকর হতে পারে।
নতুন শক্তি প্রয়োগের ধারা
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই এই পদ্ধতির সূচনা হয়। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আইএসের নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিকে হত্যা, ২০২০ সালে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা—এসব পদক্ষেপ ছিল আকস্মিক ও সীমিত পরিসরের। পরে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা, উত্তর নাইজেরিয়ায় জঙ্গিদের ওপর আক্রমণ এবং চলতি বছরে ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান—সবই একই ধারার অংশ।
এই পদ্ধতিতে স্পষ্ট লক্ষ্য বা জনসমর্থন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা ছিল না। কংগ্রেসে কোনো ভোটও হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন প্রকাশ্যে যুদ্ধ এড়াতে চাওয়ার কথা বললেও হঠাৎ করেই অভিযান শুরু হয়েছে। আকস্মিকতা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি ছিল কৌশলের অংশ।
স্পষ্টতার বদলে নমনীয়তা
পাওয়েল নীতিতে যেখানে স্পষ্টতা জরুরি, ট্রাম্প সেখানে নমনীয়তাকে অগ্রাধিকার দেন। ইরানে হামলার সময় লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছিল ‘আসন্ন হুমকি প্রতিহত করা’। পরে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। কখনো বলেন শাসন পরিবর্তনই লক্ষ্য, আবার কখনো বলেন নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। ভেনেজুয়েলাতেও প্রথমে মাদক ও গ্যাং দমন, পরে মাদুরোকে বিচারের মুখোমুখি করা—লক্ষ্য বদলাতে থাকে। ফলে যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা অস্পষ্টই থেকে যায়।
এই অস্পষ্টতাই ট্রাম্পের প্রস্থান কৌশল। প্রয়োজনে তিনি দাবি করতে পারেন যে লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, এমনকি তা শুরুতেই স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না থাকলেও।
সীমিত শক্তি, সীমিত ফল
ট্রাম্প সাধারণত স্বল্পমেয়াদি, তীক্ষ্ণ সামরিক পদক্ষেপে জোর দেন—বিশেষত বিমানশক্তি ও বিশেষ বাহিনী ব্যবহার করে। স্থলবাহিনীর বৃহৎ মোতায়েন এড়ানো হয়। এর ফলে দ্রুত আঘাত হানা সম্ভব হলেও স্থায়ী সমাধান আসে না। সিরিয়ায় হামলার পরও আসাদ ক্ষমতায় ছিলেন। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের দাবি করা হলেও পরবর্তীতে আবার হুমকির কথা বলা হয়। ভেনেজুয়েলায় মাদুরো সরলেও তার শাসনব্যবস্থা টিকে আছে।
‘যথেষ্ট ভালো’ কি যথেষ্ট?
কিছু ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ফলপ্রসূও হয়েছে। হুথিদের সঙ্গে সীমিত চুক্তি, ইরানের কিছু পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস—এসবকে আংশিক সাফল্য বলা যায়। নমনীয়তা, আকস্মিকতা এবং সীমিত শক্তি প্রয়োগ দীর্ঘস্থায়ী কাদামাটি এড়াতে সহায়ক হতে পারে।
কিন্তু ইরানে বর্তমান অভিযান ট্রাম্পের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ। স্থলবাহিনী ছাড়া, শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর মুখোমুখি হয়ে, এত বড় দেশে শাসন পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন। সম্ভাব্য ফলাফলের মধ্যে রয়েছে সামরিক একনায়কতন্ত্র বা গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি।
তবু ট্রাম্পের কৌশল তাকে পথ খোলা রাখে। যদি শাসন পরিবর্তন ব্যর্থ হয়, বা জনসমর্থন কমে যায়, তিনি ঘোষণা করতে পারেন যে লক্ষ্য ছিল কেবল ইরানকে দুর্বল করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো—এবং সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।
এতে আরেকটি পাওয়েল নীতি ভেঙে পড়ে—‘তুমি ভাঙলে, তোমাকেই মালিক হতে হবে’। ইরানি শাসন ভেঙে পড়লে তার পরিণতির দায় যুক্তরাষ্ট্র নেবে না—এমন ইঙ্গিত ট্রাম্প আগেই দিয়েছেন। আর যদি শাসন টিকে যায়, তবে ওয়াশিংটন অন্য অগ্রাধিকারে এগিয়ে যাবে।
এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি করে না; বরং সংঘাতকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখে।
রিচার্ড ফন্টেইন 



















