০২:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ারে ওরাকলের বড় উত্থান, ২০২৭ সালের আগেই আয়ে নতুন রেকর্ডের ইঙ্গিত পিরিয়ড ট্যাক্সের বিরুদ্ধে তরুণ আইনজীবী মাহনূর ওমরের লড়াই, পাকিস্তানে শুরু নতুন জাতীয় বিতর্ক ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ার বাজারে নামতে প্রস্তুত ইলন মাস্কের স্পেসএক্স ক্রিপ্টো দুনিয়ায় দ্রুত উত্থান ‘স্টেবলকয়েন’-এর, ডলার নির্ভর এই মুদ্রা ঘিরে বাড়ছে ঝুঁকি ও সম্ভাবনার বিতর্ক ইরানপন্থী সমাবেশের আশঙ্কা, লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল নিষিদ্ধ করলেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমানিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর অনুমোদন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ; তেল ছাড়তে প্রস্তুত জাপান ও জার্মানি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই থাইল্যান্ডের জাহাজে হরমুজ প্রণালীতে অজ্ঞাত হামলা, নিখোঁজ তিন নাবিক

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি: সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কখনও তিনি বলেছেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এর কারণ, কখনও বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের ওপর ইরানের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর অতীত হামলার ইতিহাসের কথা। আবার কখনও তিনি ইরানে জনগণের ওপর দমন–পীড়নের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ভেনেজুয়েলার ওপর হামলার ক্ষেত্রেও তিনি আলাদা যুক্তি দিয়েছেন—মাদক পাচারে তাদের সম্ভাব্য জড়িত থাকা এবং তাঁর ভাষায় “আমাদের” তেল চুরি করা। একই সঙ্গে তিনি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ, পানামা খালের ওপর আবার প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং এমনকি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলেছেন।

আকাশবাণী_সংবাদ_কলকাতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, এক সাক্ষাৎকারে,  দাবি করেছিলেন, ভারত, আমেরিকার পণ্যের উপর থেকে সমস্ত শুল্ক ...

এই সব যুক্তির মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে। সেটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র চাইলে অন্য দেশের নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারে এবং অন্য দেশের ভূখণ্ডে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত নিয়মের তোয়াক্কা না করেই। ট্রাম্প একবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, “আমার নিজের নৈতিকতা, আমার নিজের মন—এটাই আমাকে থামাতে পারে।”

অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সাম্রাজ্যবাদী। এই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনশৈলীর সঙ্গেও মিল রাখে—উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে চমকপ্রদ সহিংসতা এবং আইনের সীমাবদ্ধতার প্রতি অবজ্ঞা।

একসময় মার্কিন ডেমোক্র্যাট নেতারা বিদেশে সাম্রাজ্যবাদ এবং দেশে স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে সম্পর্কটি বুঝতেন। উনিশ শতকের শেষ দিকে ট্রাম্পের এক রাজনৈতিক আদর্শ প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ১৯০০ সালের নির্বাচনে ম্যাককিনলির প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট নেতা উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান যুক্তি দিয়েছিলেন, এসব বিজয় শুধু আমেরিকার বাইরের মানুষের অধিকারকেই পদদলিত করে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের স্বাধীনতাকেও বিপন্ন করে। তিনি বলেছিলেন, “সাম্রাজ্যবাদ হয়তো দেশের ভূখণ্ড বাড়াতে পারে, কিন্তু জাতির উদ্দেশ্যকে সংকুচিত করে। এটি বৃহত্তর ভবিষ্যতের দিকে এগোনো নয়; বরং রাজা ও সম্রাটদের সংকীর্ণ চিন্তার দিকে ফিরে যাওয়া।”

উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান - উইকিপিডিয়া

ব্রায়ানের এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রাচীন একটি ধারার অংশ। উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র যখন পুরো মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছিল—স্থানীয় আদিবাসীদের জমি দখল করছিল, বহু মানুষকে হত্যা করছিল এবং দাসপ্রথা বিস্তার করছিল—তখনও অনেক প্রভাবশালী আমেরিকান তাদের দেশকে স্বাধীনতাপ্রেমী প্রজাতন্ত্র হিসেবে এবং ইউরোপকে সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারী হিসেবে দেখতেন।

১৮২১ সালে জন কুইন্সি অ্যাডামস সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি জনগণের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়, তবে দেশের নীতির মৌলিক ভিত্তি ধীরে ধীরে স্বাধীনতা থেকে শক্তি প্রয়োগের দিকে সরে যাবে। কয়েক দশক পরে মেক্সিকো–মার্কিন যুদ্ধে দার্শনিক রালফ ওয়াল্ডো এমারসন যুক্তি দেন যে, অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা এবং বিদেশি বিজয় একসঙ্গে চলতে পারে না। তিনি লিখেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোকে জয় করবে, কিন্তু এটি হবে যেন একজন মানুষ বিষ খেয়ে ফেলেছে—যা শেষ পর্যন্ত তাকেই ধ্বংস করবে।”

জন কুইন্সি অ্যাডামস | জীবনী, ঘটনা, এবং প্রেসিডেন্সি | ব্রিটানিকা

সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা আমেরিকায় বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে একত্র করেছিল। দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের নেতা ফ্রেডেরিক ডগলাস এবং চিন্তাবিদ হেনরি ডেভিড থোরো প্রেসিডেন্ট জেমস পোলকের মেক্সিকো আক্রমণের বিরোধিতা করেছিলেন। একইভাবে সিনেটের অন্যতম দাসপ্রথা–সমর্থক নেতা জন সি. ক্যালহুনও এর বিরোধিতা করেছিলেন। আবার ম্যাককিনলির ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন একদিকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত ডব্লিউ. ই. বি. ডু বোয়িস এবং অন্যদিকে বর্ণবাদী দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সিনেটর জন লাউনডস ম্যাকলরিন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন প্রেসিডেন্টরা সরাসরি অন্য দেশের ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা কমিয়ে দেন। তবে কমিউনিজম এবং পরে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে তারা বিদেশি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে থাকেন। এর প্রতিক্রিয়ায় নতুন প্রজন্মের সাম্রাজ্যবিরোধীরা—যেমন ১৯৬৪ সালে টঙ্কিন উপসাগর প্রস্তাবের বিরোধিতা করা সিনেটর ওয়েন মর্স এবং ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার তিন দিন পর সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদনের বিপক্ষে ভোট দেওয়া কংগ্রেস সদস্য বারবারা লি—সতর্ক করেছিলেন যে এমন বিজয় যুক্তরাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে কলুষিত করবে।

বারবারা লি - উইকিপিডিয়া

আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের সমালোচকেরা অনেক সময় বিজয়ী হতে পারেননি। কিন্তু তাদের যুক্তি আজ নতুন করে শক্তি পেতে পারে। কারণ আধুনিক ইতিহাসে আর কোনো প্রেসিডেন্ট এত স্পষ্টভাবে বিদেশে আইন ভাঙা এবং দেশে আইন অমান্যের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেননি, যেমনটি করেছেন ট্রাম্প।

গত সেপ্টেম্বর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমরা ভেতর থেকেই আক্রমণের শিকার। এটি কোনো বিদেশি শত্রুর আক্রমণের থেকে আলাদা নয়।” মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজ দাবি করেছেন, জানুয়ারিতে তিনি যখন নিজের অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন ট্রাম্প তাকে বলেন, “ভেনেজুয়েলায় এটি সফল হয়েছিল।” যদিও পরে হোয়াইট হাউস এই মন্তব্য অস্বীকার করে।

এই সময়ে সাম্রাজ্যবিরোধী ধারণা আরও জনপ্রিয় হতে পারে, কারণ আমেরিকানরা এখন আগের তুলনায় বাইরের হুমকি নিয়ে কম উদ্বিগ্ন। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করেন, তখন নিউইয়র্কে হামলার ধোঁয়া এখনও উড়ছিল। বিপরীতে ট্রাম্পকে ইরান ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে যুক্তি দাঁড় করাতে ১৯৭৯, ১৯৮৩ এবং ২০০০ সালের পুরোনো ঘটনাগুলো পর্যন্ত টেনে আনতে হয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, আজকের আমেরিকানরা জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

জর্জ ডব্লিউ. বুশ - উইকিপিডিয়া

ইতিহাস বলছে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ তখনই বেশি জনপ্রিয় হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী থাকে। ১৮৯৩ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর যে সমৃদ্ধি আসে, তার সময়ই স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। আবার প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন ভিয়েতনাম যুদ্ধে বিপুল অর্থ ও সৈন্য পাঠাতে পেরেছিলেন কারণ যুদ্ধোত্তর দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ছিল—যাকে অর্থনীতিবিদ জন কেনেথ গ্যালব্রেইথ “সমৃদ্ধ সমাজ” বলেছিলেন। আর ২০০১ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ক্ষমতায় আসার সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটে উদ্বৃত্ত ছিল।

আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। ফেডারেল বাজেট ঘাটতি প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার এবং অধিকাংশ আমেরিকান মনে করেন বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা কমছে।

এমনকি তাঁর উপদেষ্টারা যখন তাকে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যায় মনোযোগ দিতে বলছেন, তখনও ট্রাম্প মার্কিন সামরিক শক্তির প্রদর্শনীতে ক্রমশ মুগ্ধ হয়ে উঠছেন। ফলে তিনি এমন যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছেন, যেগুলো অধিকাংশ আমেরিকান সমর্থন করেন না। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পরদিন করা রয়টার্স–ইপসোস জরিপে দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ আমেরিকান—এর মধ্যে ২৩ শতাংশ রিপাবলিকানও—মনে করেন ট্রাম্প অতিরিক্তভাবে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছেন।

নতুন করে শক্তিশালী হওয়া সাম্রাজ্যবিরোধী আন্দোলন ভিন্ন মতের অনেক আমেরিকানকে একত্র করতে পারে। প্রগতিশীলরা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কারণে ইরান আক্রমণের বিরোধিতা করেন, আর “আমেরিকা ফার্স্ট” মতাদর্শীরা যুদ্ধের বিরোধিতা করেন কারণ তারা মনে করেন আমেরিকার নৈতিক দায়িত্ব দেশের সীমান্তেই শেষ।

ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা: বাড়তি শুল্কের অর্থ ফেরত দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

ট্রাম্প যেখানে এমন এক সর্বশক্তিমান আমেরিকার কল্পনা ছড়াচ্ছেন—যেখানে বিদেশি নেতাদের হত্যা করা হয় এবং সাধারণ জেলেদের ওপর বোমা ফেলা হয়—সেখানে সাম্রাজ্যবিরোধীরা আমেরিকানদের এমন এক যুগের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে, যখন তাদের ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। তারা বহুমেরু বিশ্বকে গ্রহণ করতে পারে, কারণ তারা চায় না যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যিক রোমে পরিণত হোক।

একজন কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট যখন আরেকটি যুদ্ধ শুরু করছেন, তখন নতুন প্রজন্মের জন্য সময় এসেছে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ানের সেই ঐতিহাসিক স্লোগান আবার উচ্চারণ করার—কোনো সাম্রাজ্য নয়, কোনো রাজাও নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি: সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি

১২:২৯:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কখনও তিনি বলেছেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এর কারণ, কখনও বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের ওপর ইরানের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর অতীত হামলার ইতিহাসের কথা। আবার কখনও তিনি ইরানে জনগণের ওপর দমন–পীড়নের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ভেনেজুয়েলার ওপর হামলার ক্ষেত্রেও তিনি আলাদা যুক্তি দিয়েছেন—মাদক পাচারে তাদের সম্ভাব্য জড়িত থাকা এবং তাঁর ভাষায় “আমাদের” তেল চুরি করা। একই সঙ্গে তিনি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ, পানামা খালের ওপর আবার প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং এমনকি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলেছেন।

আকাশবাণী_সংবাদ_কলকাতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, এক সাক্ষাৎকারে,  দাবি করেছিলেন, ভারত, আমেরিকার পণ্যের উপর থেকে সমস্ত শুল্ক ...

এই সব যুক্তির মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে। সেটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র চাইলে অন্য দেশের নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারে এবং অন্য দেশের ভূখণ্ডে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত নিয়মের তোয়াক্কা না করেই। ট্রাম্প একবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, “আমার নিজের নৈতিকতা, আমার নিজের মন—এটাই আমাকে থামাতে পারে।”

অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সাম্রাজ্যবাদী। এই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনশৈলীর সঙ্গেও মিল রাখে—উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে চমকপ্রদ সহিংসতা এবং আইনের সীমাবদ্ধতার প্রতি অবজ্ঞা।

একসময় মার্কিন ডেমোক্র্যাট নেতারা বিদেশে সাম্রাজ্যবাদ এবং দেশে স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে সম্পর্কটি বুঝতেন। উনিশ শতকের শেষ দিকে ট্রাম্পের এক রাজনৈতিক আদর্শ প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ১৯০০ সালের নির্বাচনে ম্যাককিনলির প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট নেতা উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান যুক্তি দিয়েছিলেন, এসব বিজয় শুধু আমেরিকার বাইরের মানুষের অধিকারকেই পদদলিত করে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের স্বাধীনতাকেও বিপন্ন করে। তিনি বলেছিলেন, “সাম্রাজ্যবাদ হয়তো দেশের ভূখণ্ড বাড়াতে পারে, কিন্তু জাতির উদ্দেশ্যকে সংকুচিত করে। এটি বৃহত্তর ভবিষ্যতের দিকে এগোনো নয়; বরং রাজা ও সম্রাটদের সংকীর্ণ চিন্তার দিকে ফিরে যাওয়া।”

উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান - উইকিপিডিয়া

ব্রায়ানের এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রাচীন একটি ধারার অংশ। উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র যখন পুরো মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছিল—স্থানীয় আদিবাসীদের জমি দখল করছিল, বহু মানুষকে হত্যা করছিল এবং দাসপ্রথা বিস্তার করছিল—তখনও অনেক প্রভাবশালী আমেরিকান তাদের দেশকে স্বাধীনতাপ্রেমী প্রজাতন্ত্র হিসেবে এবং ইউরোপকে সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারী হিসেবে দেখতেন।

১৮২১ সালে জন কুইন্সি অ্যাডামস সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি জনগণের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়, তবে দেশের নীতির মৌলিক ভিত্তি ধীরে ধীরে স্বাধীনতা থেকে শক্তি প্রয়োগের দিকে সরে যাবে। কয়েক দশক পরে মেক্সিকো–মার্কিন যুদ্ধে দার্শনিক রালফ ওয়াল্ডো এমারসন যুক্তি দেন যে, অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা এবং বিদেশি বিজয় একসঙ্গে চলতে পারে না। তিনি লিখেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোকে জয় করবে, কিন্তু এটি হবে যেন একজন মানুষ বিষ খেয়ে ফেলেছে—যা শেষ পর্যন্ত তাকেই ধ্বংস করবে।”

জন কুইন্সি অ্যাডামস | জীবনী, ঘটনা, এবং প্রেসিডেন্সি | ব্রিটানিকা

সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা আমেরিকায় বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে একত্র করেছিল। দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের নেতা ফ্রেডেরিক ডগলাস এবং চিন্তাবিদ হেনরি ডেভিড থোরো প্রেসিডেন্ট জেমস পোলকের মেক্সিকো আক্রমণের বিরোধিতা করেছিলেন। একইভাবে সিনেটের অন্যতম দাসপ্রথা–সমর্থক নেতা জন সি. ক্যালহুনও এর বিরোধিতা করেছিলেন। আবার ম্যাককিনলির ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন একদিকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত ডব্লিউ. ই. বি. ডু বোয়িস এবং অন্যদিকে বর্ণবাদী দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সিনেটর জন লাউনডস ম্যাকলরিন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন প্রেসিডেন্টরা সরাসরি অন্য দেশের ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা কমিয়ে দেন। তবে কমিউনিজম এবং পরে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে তারা বিদেশি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে থাকেন। এর প্রতিক্রিয়ায় নতুন প্রজন্মের সাম্রাজ্যবিরোধীরা—যেমন ১৯৬৪ সালে টঙ্কিন উপসাগর প্রস্তাবের বিরোধিতা করা সিনেটর ওয়েন মর্স এবং ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার তিন দিন পর সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদনের বিপক্ষে ভোট দেওয়া কংগ্রেস সদস্য বারবারা লি—সতর্ক করেছিলেন যে এমন বিজয় যুক্তরাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে কলুষিত করবে।

বারবারা লি - উইকিপিডিয়া

আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের সমালোচকেরা অনেক সময় বিজয়ী হতে পারেননি। কিন্তু তাদের যুক্তি আজ নতুন করে শক্তি পেতে পারে। কারণ আধুনিক ইতিহাসে আর কোনো প্রেসিডেন্ট এত স্পষ্টভাবে বিদেশে আইন ভাঙা এবং দেশে আইন অমান্যের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেননি, যেমনটি করেছেন ট্রাম্প।

গত সেপ্টেম্বর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমরা ভেতর থেকেই আক্রমণের শিকার। এটি কোনো বিদেশি শত্রুর আক্রমণের থেকে আলাদা নয়।” মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজ দাবি করেছেন, জানুয়ারিতে তিনি যখন নিজের অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন ট্রাম্প তাকে বলেন, “ভেনেজুয়েলায় এটি সফল হয়েছিল।” যদিও পরে হোয়াইট হাউস এই মন্তব্য অস্বীকার করে।

এই সময়ে সাম্রাজ্যবিরোধী ধারণা আরও জনপ্রিয় হতে পারে, কারণ আমেরিকানরা এখন আগের তুলনায় বাইরের হুমকি নিয়ে কম উদ্বিগ্ন। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করেন, তখন নিউইয়র্কে হামলার ধোঁয়া এখনও উড়ছিল। বিপরীতে ট্রাম্পকে ইরান ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে যুক্তি দাঁড় করাতে ১৯৭৯, ১৯৮৩ এবং ২০০০ সালের পুরোনো ঘটনাগুলো পর্যন্ত টেনে আনতে হয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, আজকের আমেরিকানরা জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

জর্জ ডব্লিউ. বুশ - উইকিপিডিয়া

ইতিহাস বলছে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ তখনই বেশি জনপ্রিয় হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী থাকে। ১৮৯৩ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর যে সমৃদ্ধি আসে, তার সময়ই স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। আবার প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন ভিয়েতনাম যুদ্ধে বিপুল অর্থ ও সৈন্য পাঠাতে পেরেছিলেন কারণ যুদ্ধোত্তর দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ছিল—যাকে অর্থনীতিবিদ জন কেনেথ গ্যালব্রেইথ “সমৃদ্ধ সমাজ” বলেছিলেন। আর ২০০১ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ক্ষমতায় আসার সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটে উদ্বৃত্ত ছিল।

আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। ফেডারেল বাজেট ঘাটতি প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার এবং অধিকাংশ আমেরিকান মনে করেন বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা কমছে।

এমনকি তাঁর উপদেষ্টারা যখন তাকে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যায় মনোযোগ দিতে বলছেন, তখনও ট্রাম্প মার্কিন সামরিক শক্তির প্রদর্শনীতে ক্রমশ মুগ্ধ হয়ে উঠছেন। ফলে তিনি এমন যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছেন, যেগুলো অধিকাংশ আমেরিকান সমর্থন করেন না। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পরদিন করা রয়টার্স–ইপসোস জরিপে দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ আমেরিকান—এর মধ্যে ২৩ শতাংশ রিপাবলিকানও—মনে করেন ট্রাম্প অতিরিক্তভাবে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছেন।

নতুন করে শক্তিশালী হওয়া সাম্রাজ্যবিরোধী আন্দোলন ভিন্ন মতের অনেক আমেরিকানকে একত্র করতে পারে। প্রগতিশীলরা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কারণে ইরান আক্রমণের বিরোধিতা করেন, আর “আমেরিকা ফার্স্ট” মতাদর্শীরা যুদ্ধের বিরোধিতা করেন কারণ তারা মনে করেন আমেরিকার নৈতিক দায়িত্ব দেশের সীমান্তেই শেষ।

ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা: বাড়তি শুল্কের অর্থ ফেরত দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

ট্রাম্প যেখানে এমন এক সর্বশক্তিমান আমেরিকার কল্পনা ছড়াচ্ছেন—যেখানে বিদেশি নেতাদের হত্যা করা হয় এবং সাধারণ জেলেদের ওপর বোমা ফেলা হয়—সেখানে সাম্রাজ্যবিরোধীরা আমেরিকানদের এমন এক যুগের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে, যখন তাদের ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। তারা বহুমেরু বিশ্বকে গ্রহণ করতে পারে, কারণ তারা চায় না যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যিক রোমে পরিণত হোক।

একজন কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট যখন আরেকটি যুদ্ধ শুরু করছেন, তখন নতুন প্রজন্মের জন্য সময় এসেছে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ানের সেই ঐতিহাসিক স্লোগান আবার উচ্চারণ করার—কোনো সাম্রাজ্য নয়, কোনো রাজাও নয়।