ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবন ও কর্মকাণ্ডের আলোকে যদি ইরান যুদ্ধকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—কী কারণে তিনি এত ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একজন রাজনীতিক হয়ে উঠলেন? এত বিতর্ক, সমালোচনা ও ব্যক্তিগত ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী ও শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন?
এর একটি বড় কারণ হলো প্রতিপক্ষের দুর্বলতা শনাক্ত করার তার অদ্ভুত দক্ষতা। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাহ্যিক শক্তির মুখোশ সরিয়ে ভিতরের দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারদর্শী। সুযোগ দেখলেই আঘাত হানার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক জয়ের প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষা তাকে আলাদা করে তুলেছে।

২০১৬ সালের রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ছিল তার জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ। ইরাক যুদ্ধ এবং আর্থিক সংকটের কারণে দলের নেতৃত্ব তখন অনেকটাই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল, কিন্তু তারা নিজেরাই তা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। অনেক অভিজ্ঞ রাজনীতিক ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ভাষা ও অহংকারী আচরণের সামনে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। প্রথমে অনেকে নীতিগত বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশই তাকে সমর্থন জানাতে বাধ্য হন।
একই ধরনের চিত্র দেখা যায় হিলারি ক্লিনটনের আত্মতুষ্ট প্রচারণাকে পরাজিত করার সময়েও। আবার ২০২০ সালের পর রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে তার প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা কাজ করেছে। তার দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যে দৃশ্য দেখা যায়—যেখানে একসময় তার বিরোধিতায় সরব থাকা বড় বড় শিল্পপতিরা তাকে সম্মান জানাতে সারিবদ্ধ হয়েছিলেন—তা এই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। ট্রাম্প শুরু থেকেই তাদের প্রকৃত অবস্থান বুঝে নিয়েছিলেন।
![]()
এরপর যেন তার সামনে জয় করার জন্য বাকি ছিল পুরো বিশ্ব।
প্রথম মেয়াদেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে ট্রাম্প প্রকৃত অর্থে শান্তিবাদী বা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাবাদী নন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তার পররাষ্ট্রনীতিতে সংযমের যে যুক্তিগুলো তিনি বারবার তুলে ধরতেন, সেগুলো মূলত তার নব-রক্ষণশীল ও উদারপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সুযোগ এলে তিনি সহজেই সেই অবস্থান পরিবর্তন করেন।
তার কাছে কূটনৈতিক সমঝোতাও ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি উপায় মাত্র। তবে অনেক সময় ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের অপমানিত, পরাজিত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে দেখা তার কাছে আরও বেশি সন্তোষজনক।
তাহলে ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্প কী ধরনের দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছেন?
প্রথমত, গত কয়েক বছরে ইসরায়েলের বিভিন্ন অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাববলয় উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও দেশটির সরকার কাঠামো অনেকটাই ১৯৮০-এর দশকের মতোই রয়ে গেছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। ধর্মীয় উন্মাদনা কমেছে, এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের বৈধতাও আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসন যে “তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকি”র যুক্তি কংগ্রেস ও গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে, তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিশ্লেষণ হলো এই দুর্বলতার ধারণা।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যেও দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছেন। জো বাইডেন প্রশাসনের সময় মনে হচ্ছিল রাশিয়া, ইরান ও চীন এক ধরনের ঢিলেঢালা সমন্বয়ে কাজ করছে—যেন তারা আমেরিকার শক্তিকে পরীক্ষা করছে। কিন্তু বাস্তবে এই দেশগুলো একে অপরের প্রকৃত মিত্র নয়। তাদের মধ্যে কেউ বিপদে পড়লে অন্যরা সবসময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে না। এমনকি তারা নিজেদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর প্রতিও সবসময় বিশ্বস্ত থাকে না।
এর ফলে ইউক্রেনে রাশিয়ার জটিল যুদ্ধ পরিস্থিতি সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের সুযোগ তৈরি করেছে। চীন ও রাশিয়া ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষায় তেমন সক্রিয় হয়নি। একইভাবে দুর্বল অবস্থায় থাকা ইরানের পাশে শক্তিশালী কোনো স্বৈরশাসক জোট দাঁড়িয়ে নেই। এটি একটি টালমাটাল শাসনব্যবস্থা—যা ভেঙে পড়লে আমেরিকা-বিরোধী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

তৃতীয়ত, সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়ন ট্রাম্পের কাছে একটি নতুন সুযোগের জানালা খুলে দিয়েছে। ইরানে পূর্ববর্তী হামলা কিংবা ভেনেজুয়েলায় অভিযান দেখিয়েছে যে এখন শত্রু রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে নিখুঁত আঘাত হানা সম্ভব। এটি আর পুরোনো ধরনের “শক অ্যান্ড অ” কৌশল নয়। বরং ড্রোন হামলা ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের নেতৃত্বকে ধ্বংস করার কৌশল। আশা করা হয়, এর মাধ্যমে ইরাকের মতো পূর্ণাঙ্গ দখলদারিত্ব ছাড়াই একটি অনুকূল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
অবশ্য এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের পেছনে শুধু ট্রাম্পের প্রবৃত্তিই কাজ করছে—এমনটা বলা যায় না। ইসরায়েলের প্রভাব বা সৌদি আরবের চাপও বাস্তব। আবার ইরান জিম্মি সংকটের সময় গড়ে ওঠা আমেরিকার রক্ষণশীল রাজনীতির ঐতিহ্যও একটি ভূমিকা রাখে। কেউ কেউ মনে করেন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমস্যায় পড়লে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা বিদেশে ছোটখাটো যুদ্ধের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
তবে এসব কারণ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো—এসবই ট্রাম্পের নিজস্ব প্রবৃত্তির সঙ্গে মিলে যায়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সঙ্গে নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত মনে করেন। তিনি সেই প্রজন্মের একজন, যারা শীতল যুদ্ধের অসমাপ্ত অধ্যায়—তেহরান থেকে হাভানা পর্যন্ত—সমাধান করার ধারণাকে ঐতিহাসিকভাবে আকর্ষণীয় মনে করে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পই মূল চালিকাশক্তি। তিনি এই রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যেন কেবল তার সঙ্গেই এগিয়ে যাচ্ছে। জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলোতে রক্ষণশীলদের যে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তেমন সর্বসম্মত সমর্থন দেখা যায় না। বরং তার নিজস্ব রাজনৈতিক জোটের মধ্যেও কিছুটা দ্বিধা ও মতভেদ রয়েছে।

যদি ট্রাম্পের সেই প্রবল প্রবৃত্তি—যে বিশ্বাস তাকে বলছে তিনি বিশ্বকে ঠিকভাবে বুঝে ফেলেছেন—এটি সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে যুদ্ধপন্থী জোটটি দ্রুত ভেঙে পড়বে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, এই অবস্থান ইতিমধ্যেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন পায় না।
তবে ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য চিত্র হলো—ইরান যুদ্ধ এমন একটি মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে, যখন ট্রাম্পের এই প্রবৃত্তি মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হবে। ইতিহাসে বহু বিজেতার ক্ষেত্রে এমনটি দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের সাফল্য একসময় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, এবং শেষ পর্যন্ত একটি বড় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে তাদের ক্যারিয়ার শেষ হয়।
সম্ভবত ট্রাম্প মনে করেন, যতক্ষণ তিনি কোনো দেশ সম্পূর্ণভাবে আক্রমণ বা দখল করবেন না, ততক্ষণ এই পরিণতি এড়ানো সম্ভব। তার ধারণা, উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর বিমান হামলার কৌশল বড় ধরনের ঝুঁকি সীমিত রাখবে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্নও হতে পারে। আংশিকভাবে ভেঙে পড়া একটি ইরান যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নিতে পারে। সেই পরিস্থিতির জন্য ডান ও বাম—উভয় দিক থেকেই দোষ চাপানো হতে পারে ইসরায়েলের ওপর। তখন ট্রাম্প প্রশাসনও বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপে পড়তে পারে।

শুধু “আমরা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করেছি”—এই যুক্তি তার নিজের রাজনৈতিক জোটকেও সন্তুষ্ট করতে যথেষ্ট নাও হতে পারে, দেশের বৃহত্তর জনগণের কথা তো দূরের।
এই পরিস্থিতিতে সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন হতে পারে ভেনেজুয়েলার মতো একটি সমাপ্তি—যেখানে তুলনামূলকভাবে বন্ধুসুলভ একটি সরকার ক্ষমতায় থাকবে, আলোচনার পথ খুলবে এবং বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।
রস ডাউথাট 



















