মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যবাহী ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম আবারও বড় এক ক্রিকেট লড়াইয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। বহু ঐতিহ্যের ধারক এই মাঠ সময়ের সঙ্গে নিজেকে নতুনভাবে সাজিয়েছে, তবে তার ঐতিহাসিক চরিত্র কখনও হারায়নি। ৫১ বছরের ইতিহাসে ওয়াংখেড়ে যেমন বদলেছে, তেমনই ধরে রেখেছে তার ক্রিকেটময় আবহ।
স্টেডিয়ামে ঢুকতেই ভিনু মানকড় গেটের কাছে চোখে পড়ে ভারতীয় ব্যাটিং কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কারের একটি মূর্তি। ব্যাট উঁচিয়ে হাঁটার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই মূর্তি স্মরণ করিয়ে দেয় ১৯৮৭ সালের মার্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে আহমেদাবাদে তাঁর ১০ হাজারতম টেস্ট রান পূর্ণ করার মুহূর্তকে।
গেট থেকে প্রেস বক্স পর্যন্ত হাঁটার পথে সারি সারি দোকান সাজানো হচ্ছে। ম্যাচের দিন সন্ধ্যায় এখানে জমবে দর্শকদের ভিড় ও উৎসবমুখর পরিবেশ।
ক্রিকেট ইতিহাসের স্মৃতি ঘিরে ওয়াংখেড়ে
প্রেস বক্সের পাশে আরেকটি বিশাল মূর্তি নজর কাড়ে—সচিন তেন্ডুলকারের। আকাশে তুলে মারা তার বিখ্যাত সোজা ড্রাইভের ভঙ্গিতে নির্মিত এই মূর্তি ভারতীয় ক্রিকেটের আরেক মহান ব্যাটারের প্রতি সম্মান। গাভাস্কারের উত্তরসূরি হিসেবে তেন্ডুলকার ভারতীয় ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
স্টেডিয়ামের বিস্তৃত এলাকায় নতুন সংযোজন হলো এমসিএ শরদ পওয়ার ক্রিকেট জাদুঘর। ক্রিকেট লেখক দেবেন্দ্র প্রভুদেসাইয়ের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা এই জাদুঘরে মুম্বাই ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এখানে রয়েছে ৮০ বছরেরও বেশি পুরনো অসংখ্য স্মারক।
ভারতীয় ক্রিকেটে মুম্বাইয়ের অবদান অসামান্য। এই শহরের দল রঞ্জি ট্রফি জিতেছে রেকর্ড ৪২ বার। জাদুঘরে আন্তর্জাতিক তারকা থেকে শুরু করে ঘরোয়া ক্রিকেটের নায়ক—সবার স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে।
এই মাঠেই ২০১১ সালের ২ এপ্রিল ইতিহাস সৃষ্টি করে ভারত, ঘরের মাঠে একদিনের বিশ্বকাপ জিতে প্রথম দল হিসেবে শিরোপা তোলে। আবার ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এখানেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল ভারতকে।
![]()
সেমিফাইনালের আগে বড় লড়াই
ওয়াংখেড়ে এবার ভারতের সামনে নতুন এক সুযোগ এনে দিয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে তারা যদি শিরোপা ছিনিয়ে নিতে পারে, তবে একদিনের বিশ্বকাপ জয়ের সাফল্যের সঙ্গে টি-টোয়েন্টির গৌরবও যুক্ত হবে।
বৃহস্পতিবারের ম্যাচটি ফাইনাল নয়, তবে অনেকেই এটিকে “ফাইনালের আগে ফাইনাল” বলছেন। কারণ ভারতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইংল্যান্ড—টানা তৃতীয় আসরে সেমিফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ।
এর আগে দুইবারের সেমিফাইনাল লড়াইয়ে দুই দলই একবার করে জিতেছে।
২০২২ সালে অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের জস বাটলার ও অ্যালেক্স হেলসের অবিচ্ছিন্ন ১৭০ রানের জুটিতে ভারতকে ১০ উইকেটে হারতে হয়েছিল।
২০২৪ সালে গায়ানার প্রভিডেন্সে ভারত সেই হার শোধ করে নেয়। রোহিত শর্মার নেতৃত্বে ইংল্যান্ডকে ৬৮ রানে হারায় তারা।
এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নাটকীয় ফাইনাল জিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও জিতে নেয় ভারত।
নতুন নেতৃত্ব, নতুন দল
সেই জয়ের কিছু সময় পরই রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি ও রবীন্দ্র জাদেজা টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান। এরপর ভারতীয় দলের নেতৃত্বে আসেন সূর্যকুমার যাদব।
দলে আগের কয়েকজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার থাকলেও যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু প্রতিভা। ওপেনিংয়ে জায়গা পেয়েছেন অভিষেক শর্মা ও ইশান কিষান। পাশাপাশি দলে রয়েছেন রহস্য স্পিনার বরুণ চক্রবর্তী, যিনি বর্তমানে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ বোলার।
কিষান এই টুর্নামেন্টে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছেন, বিশেষ করে নামিবিয়া ও পাকিস্তানের বিপক্ষে। তবে সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম ওভারেই আউট হওয়ার পর থেকে তাঁর ব্যাট তেমন কথা বলেনি।
কিছুদিন আগেও বিশ্বকাপ দলে তাঁর জায়গা অনিশ্চিত ছিল। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত ফর্ম এবং দলে নতুন ভাবনার কারণে তিনি সুযোগ পান।
ওয়াংখেড়ে মাঠ তাঁর কাছে খুবই পরিচিত। আইপিএলে বহু বছর মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
অভিষেকের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার অপেক্ষা
এই মাঠেই গত বছর জানুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলেছিলেন অভিষেক শর্মা। মাত্র ৫৪ বলে ১৩৫ রান করেন তিনি, যার মধ্যে ছিল সাতটি চার ও ১৩টি ছক্কা।
সেদিন ইংল্যান্ডের বোলারদের উপর ঝড় তুলেছিলেন তিনি। জোফরা আর্চার চার ওভারে দেন ৫৫ রান, আদিল রশিদ তিন ওভারে ৪১ রান।
তবে এবারের বিশ্বকাপে অভিষেকের পারফরম্যান্স হতাশাজনক। চার ইনিংস পর তিনি প্রথম রান পান এবং এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ইনিংস শুধু জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫৫ রান।
ওয়াংখেড়েতে সেই স্মৃতি হয়তো তাকে আবার জ্বলে ওঠার অনুপ্রেরণা দেবে।
সঞ্জু স্যামসনের উত্থান
অভিষেক ও কিষানের ওপেনিং জুটি তিনবার প্রথম ওভারেই উইকেট হারানোর পর ভেঙে দেওয়া হয়। কিষানের জায়গায় ওপেন করতে নামেন সঞ্জু স্যামসন।
ডানহাতি ব্যাটার হিসেবে তিনি দলে ভারসাম্য এনেছেন। শুধু তাই নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কলকাতায় গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অপরাজিত ৯৭ রানের ইনিংস খেলেন, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
অনেক সময় সম্ভাবনা দেখিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন স্যামসন। কিন্তু সেই ইনিংসের পর মনে করা হচ্ছে তিনি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন।
আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে তিনি যেভাবে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও হয়তো সেই রূপই দেখা যাবে।
দলগত পারফরম্যান্সেই ভারতের সাফল্য
ভারত সেমিফাইনালে উঠেছে, কিন্তু এখনো পুরোপুরি সেরা ক্রিকেট খেলতে পারেনি। দলের বড় শক্তি হলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খেলোয়াড়ের অবদান।
কখনো অর্ধশতক, কখনো গুরুত্বপূর্ণ দুই উইকেটের ওভার, আবার কখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাউন্ডারি—এইভাবেই ম্যাচ জিতেছে ভারত।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চেন্নাইয়ে প্রায় নিখুঁত ব্যাটিং দেখা গিয়েছিল, যেখানে ছয় ব্যাটার মিলে ২৫৬ রান তুলেছিল। তবে এখনও দলটি পুরো ছন্দে ওঠেনি। যদি তা হয়, তবে তারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।
ইংল্যান্ডের প্রত্যাবর্তন
ইংল্যান্ড টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হার দিয়ে। তবে এরপর তারা দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায়।
সুপার এইটে পাল্লেকেলে ও কলম্বোর স্পিন সহায়ক উইকেটে আদিল রশিদ, লিয়াম ডসন ও উইল জ্যাকস দারুণ বোলিং করেন। নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের পথ তৈরি হয় তাদের জন্য।
বাটলারের রানখরা
ইংল্যান্ডের বড় চিন্তার জায়গা অধিনায়ক জস বাটলারের ফর্ম। সাত ইনিংসে তিনি করেছেন মাত্র ৬২ রান, সর্বোচ্চ ২৬।
তবু তাকে দলে রাখা হয়েছে তার প্রমাণিত দক্ষতার কারণে। বিশ্বের সেরা বোলিং আক্রমণ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা তার আছে।
ভারত অবশ্য চাইবে এই ম্যাচেই যেন সেই “ঘুমন্ত দানব” জেগে না ওঠে।
ইতিহাস গড়ার সামনে ভারত
ইংল্যান্ড দুইবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে—২০১০ সালে পল কলিংউডের নেতৃত্বে এবং ২০২২ সালে বাটলারের নেতৃত্বে।
বর্তমান অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক দলকে শান্তভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং শুরুতে যেসব বিতর্ক ছিল, সেগুলোও এখন অনেকটাই মুছে গেছে।
অ্যাশেজে ১–৪ ব্যবধানে হারার পর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ ছিল। কিন্তু এখন তারা সেমিফাইনালে উঠে সেই সন্দেহ অনেকটাই দূর করেছে।
অন্যদিকে ভারত মাত্র দুটি জয়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে নতুন ইতিহাস গড়ার। যদি তারা শিরোপা জেতে, তবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তিনবারের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রথম দল হবে।
ওয়াংখেড়েতে পুরো দেশের সমর্থন থাকবে ভারতের পাশে। তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে মাঠে তাদের পারফরম্যান্সের উপরই।
বিশেষ করে ফিল্ডিং ও ক্যাচিংয়ে উন্নতি না করলে কঠিন লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়তে পারে তারা।
সম্ভবত স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে থাকা সচিন তেন্ডুলকারের মূর্তি এবং এই মাঠের গৌরবময় ইতিহাসই তাদের নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
#ক্রিকেট #ভারত #ইংল্যান্ড #টি২০বিশ্বকাপ #ওয়াংখেড়ে #মুম্বাই
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















