০১:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ারে ওরাকলের বড় উত্থান, ২০২৭ সালের আগেই আয়ে নতুন রেকর্ডের ইঙ্গিত পিরিয়ড ট্যাক্সের বিরুদ্ধে তরুণ আইনজীবী মাহনূর ওমরের লড়াই, পাকিস্তানে শুরু নতুন জাতীয় বিতর্ক ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ার বাজারে নামতে প্রস্তুত ইলন মাস্কের স্পেসএক্স ক্রিপ্টো দুনিয়ায় দ্রুত উত্থান ‘স্টেবলকয়েন’-এর, ডলার নির্ভর এই মুদ্রা ঘিরে বাড়ছে ঝুঁকি ও সম্ভাবনার বিতর্ক ইরানপন্থী সমাবেশের আশঙ্কা, লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল নিষিদ্ধ করলেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমানিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর অনুমোদন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ; তেল ছাড়তে প্রস্তুত জাপান ও জার্মানি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই থাইল্যান্ডের জাহাজে হরমুজ প্রণালীতে অজ্ঞাত হামলা, নিখোঁজ তিন নাবিক

চীন কেন ইরানকে সাহায্য করবে না: বেইজিংয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তেল, শাসনব্যবস্থা নয়

  • ইউন সান
  • ০৪:১৩:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
  • 28

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যে ইরানের পরিস্থিতি চীন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ তেহরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস, কৌশলগত লক্ষ্য এবং পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছে। উভয় দেশই নিজেদের প্রাচীন অ-পশ্চিমা সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখে এবং বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতা করে।

চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত। ২০২৫ সালে চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ৫৫ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার প্রায় ১৩ শতাংশ এসেছে ইরান থেকে। এই তেলের বেশিরভাগই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা ইরানের পাশ দিয়ে প্রবাহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ফলে ইরানে সাম্প্রতিক বোমা হামলা তেলের সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থাকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এতে চীনের জ্বালানি পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন যে বেইজিং হয়তো ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেবে অথবা রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধে যেভাবে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ দিয়েছে, সেভাবে সহায়তা করবে। কিন্তু বাস্তবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

চীন উদ্বিগ্ন হলেও সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নেই

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের পর চীন কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভাষায় ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। সাম্প্রতিক সংকটেও একই ধরনের অবস্থান দেখা গেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কঠোর ভাষায় যে বিষয়টি নিন্দা করেছে, তা হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড—পুরো সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে নয়।

Iran in the Aftermath of the Twelve-Day War

মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সবাই অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর কথাও বলেছে। এতে বোঝা যায়, চীন একদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।

ইরানের ওপর চীনের আস্থাহীনতা বাড়ছে

চীনের ইরান নীতি দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার জন্য ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের ৪০০ বিলিয়ন ডলারের একটি কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনার বেশিরভাগই বাস্তবায়িত হয়নি।

ইরান আশঙ্কা করেছিল, চীনের অতিরিক্ত প্রভাব তার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করতে পারে। অন্যদিকে বেইজিং মনে করে তেহরান প্রায়ই অসঙ্গত আচরণ করে এবং নির্ভরযোগ্য নয়।

চীনের দৃষ্টিতে ইরানের শক্তির ধারণাও অতিরঞ্জিত। জনসংখ্যা ইসরায়েলের তুলনায় দশ গুণ এবং সৌদি আরবের তুলনায় তিন গুণ হলেও ইরানের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ইসরায়েলের জিডিপির চেয়েও কম এবং সৌদি আরবের মাত্র এক-চতুর্থাংশ।

চীনা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান প্রক্সি যুদ্ধ ও অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে নিজের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় ছবি তৈরি করেছে, যা বাস্তব শক্তির তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে হয়।

Strategic patience: How China navigates the Iran war

কৌশলগত দ্বন্দ্বে আটকে আছে ইরান

চীনা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী আদর্শ এবং বাস্তব রাজনৈতিক প্রয়োজনের মধ্যে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে ইসলামি আদর্শ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ সীমিত করে। অন্যদিকে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করাও ইরানের জন্য জরুরি।

ফলে ইরান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান বজায় রাখা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা—এই দুই বিপরীত বাস্তবতার মধ্যে আটকে আছে।

চীনের দৃষ্টিতে ইরানের প্রতিক্রিয়া দুর্বল

অনেক চীনা বিশ্লেষকের মতে, ইরান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যথেষ্ট দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর কিংবা ২০২৪ সালে সিরিয়ায় ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েলের হামলার পর তেহরানের প্রতিক্রিয়া খুব সীমিত ছিল।

২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধেও ইরানের পাল্টা হামলাকে অনেক চীনা পর্যবেক্ষক দুর্বল ও অকার্যকর বলে মনে করেন। অনেকেই এটিকে ‘প্রদর্শনমূলক প্রতিশোধ’ বলে ব্যঙ্গ করেছেন।

প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেও ইরানের অবস্থান চীনের আস্থা কমিয়েছে। হামাস ও হিজবুল্লাহ বড় ধরনের আঘাত পেলেও তেহরান কার্যকর সমর্থন দিতে পারেনি। এমনকি ২০২৪ সালে ইরানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে এই গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক অস্বীকার করেন।

Trump vows to hold Iran responsible for Houthi attacks | Reuters

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে বোমা হামলা চালালে ইরান সেখান থেকে নিজ সেনা সরিয়ে নেয়, ফলে হুথি মিত্রদের কার্যত একা ফেলে দেয়।

শাসন পরিবর্তন নিয়ে চীনের আপত্তি নেই

ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থাও চীনের নীতিনির্ধারকদের হতাশ করেছে। দুর্নীতি, দুর্বল প্রশাসন এবং ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো চীনা নীতি বিশ্লেষকদের কাছে স্পষ্ট।

ইসরায়েল যেভাবে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে সামরিক নেতা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের লক্ষ্যবস্তু করতে পেরেছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে দেশের ভেতরেই আস্থার সংকট রয়েছে।

এই কারণেই ইরানে শাসন পরিবর্তন হলে চীন সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারাপ পরিস্থিতি হিসেবে দেখছে না। বেইজিংয়ের কাছে মূল বিষয় হলো—নতুন সরকার যেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং তেলের প্রবাহ নিশ্চিত করে।

তেলের নিরাপত্তাই চীনের মূল উদ্বেগ

ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। যদিও চীন কয়লা, সৌর, বায়ু ও পারমাণবিক শক্তিতে বড় বিনিয়োগ করেছে, তবুও তেল এখনও অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।

বিমান চলাচল, জাহাজ পরিচালনা এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের জন্য চীন এখনও আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির মজুত তেল স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট হলেও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ বিঘ্ন সহ্য করার মতো নয়।

Analysis: What happens if Iran closes the Strait of Hormuz? | Arab News

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বড় সংকট

চীনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হরমুজ প্রণালীর সম্ভাব্য বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে চীনের অর্ধেকের বেশি তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

চীনা জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এতদিন ধরে মনে করতেন, এমন পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটবে না। কারণ এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হবে এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক সমাধান বেরিয়ে আসবে।

তবুও বর্তমান সংঘাত সেই ধারণাকে নতুন করে পরীক্ষা করছে। বেইজিং ইতিমধ্যেই তেহরানের ওপর চাপ দিচ্ছে যেন প্রণালী খোলা রাখা হয় এবং তেল পরিবহনে কোনো বাধা না সৃষ্টি করা হয়।

দীর্ঘ যুদ্ধ হলে চীনের অবস্থান বদলাতে পারে

What Lessons Does Putin's War in Ukraine Teach China?

যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ইরান শক্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাহলে চীনের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে তেহরানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা বেইজিংয়ের জন্য কঠিন হবে।

তখন চীন হয়তো রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধে যেভাবে সহায়তা করেছে, তেমনভাবে প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ বা অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে পারে।

তবে যদি ইরানের বর্তমান শাসন দ্রুত পতন হয় অথবা পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে যায়, তাহলে চীন তাতে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হবে না। বেইজিং ইতিমধ্যেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছে।

চীনের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের প্রবাহ অব্যাহত রাখা এবং ভবিষ্যতে যে নেতৃত্বই ক্ষমতায় আসুক, তাদের সঙ্গে কাজ করার পথ তৈরি করা।
জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ

চীন কেন ইরানকে সাহায্য করবে না: বেইজিংয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তেল, শাসনব্যবস্থা নয়

০৪:১৩:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যে ইরানের পরিস্থিতি চীন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ তেহরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস, কৌশলগত লক্ষ্য এবং পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছে। উভয় দেশই নিজেদের প্রাচীন অ-পশ্চিমা সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখে এবং বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা প্রভাবের বিরোধিতা করে।

চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত। ২০২৫ সালে চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ৫৫ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার প্রায় ১৩ শতাংশ এসেছে ইরান থেকে। এই তেলের বেশিরভাগই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা ইরানের পাশ দিয়ে প্রবাহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ফলে ইরানে সাম্প্রতিক বোমা হামলা তেলের সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থাকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এতে চীনের জ্বালানি পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন যে বেইজিং হয়তো ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেবে অথবা রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধে যেভাবে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ দিয়েছে, সেভাবে সহায়তা করবে। কিন্তু বাস্তবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

চীন উদ্বিগ্ন হলেও সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নেই

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের পর চীন কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভাষায় ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। সাম্প্রতিক সংকটেও একই ধরনের অবস্থান দেখা গেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কঠোর ভাষায় যে বিষয়টি নিন্দা করেছে, তা হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড—পুরো সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে নয়।

Iran in the Aftermath of the Twelve-Day War

মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সবাই অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর কথাও বলেছে। এতে বোঝা যায়, চীন একদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।

ইরানের ওপর চীনের আস্থাহীনতা বাড়ছে

চীনের ইরান নীতি দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার জন্য ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের ৪০০ বিলিয়ন ডলারের একটি কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনার বেশিরভাগই বাস্তবায়িত হয়নি।

ইরান আশঙ্কা করেছিল, চীনের অতিরিক্ত প্রভাব তার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করতে পারে। অন্যদিকে বেইজিং মনে করে তেহরান প্রায়ই অসঙ্গত আচরণ করে এবং নির্ভরযোগ্য নয়।

চীনের দৃষ্টিতে ইরানের শক্তির ধারণাও অতিরঞ্জিত। জনসংখ্যা ইসরায়েলের তুলনায় দশ গুণ এবং সৌদি আরবের তুলনায় তিন গুণ হলেও ইরানের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ইসরায়েলের জিডিপির চেয়েও কম এবং সৌদি আরবের মাত্র এক-চতুর্থাংশ।

চীনা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান প্রক্সি যুদ্ধ ও অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে নিজের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় ছবি তৈরি করেছে, যা বাস্তব শক্তির তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে হয়।

Strategic patience: How China navigates the Iran war

কৌশলগত দ্বন্দ্বে আটকে আছে ইরান

চীনা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী আদর্শ এবং বাস্তব রাজনৈতিক প্রয়োজনের মধ্যে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে ইসলামি আদর্শ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ সীমিত করে। অন্যদিকে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করাও ইরানের জন্য জরুরি।

ফলে ইরান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান বজায় রাখা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা—এই দুই বিপরীত বাস্তবতার মধ্যে আটকে আছে।

চীনের দৃষ্টিতে ইরানের প্রতিক্রিয়া দুর্বল

অনেক চীনা বিশ্লেষকের মতে, ইরান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যথেষ্ট দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর কিংবা ২০২৪ সালে সিরিয়ায় ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েলের হামলার পর তেহরানের প্রতিক্রিয়া খুব সীমিত ছিল।

২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধেও ইরানের পাল্টা হামলাকে অনেক চীনা পর্যবেক্ষক দুর্বল ও অকার্যকর বলে মনে করেন। অনেকেই এটিকে ‘প্রদর্শনমূলক প্রতিশোধ’ বলে ব্যঙ্গ করেছেন।

প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেও ইরানের অবস্থান চীনের আস্থা কমিয়েছে। হামাস ও হিজবুল্লাহ বড় ধরনের আঘাত পেলেও তেহরান কার্যকর সমর্থন দিতে পারেনি। এমনকি ২০২৪ সালে ইরানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে এই গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক অস্বীকার করেন।

Trump vows to hold Iran responsible for Houthi attacks | Reuters

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে বোমা হামলা চালালে ইরান সেখান থেকে নিজ সেনা সরিয়ে নেয়, ফলে হুথি মিত্রদের কার্যত একা ফেলে দেয়।

শাসন পরিবর্তন নিয়ে চীনের আপত্তি নেই

ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থাও চীনের নীতিনির্ধারকদের হতাশ করেছে। দুর্নীতি, দুর্বল প্রশাসন এবং ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো চীনা নীতি বিশ্লেষকদের কাছে স্পষ্ট।

ইসরায়েল যেভাবে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে সামরিক নেতা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের লক্ষ্যবস্তু করতে পেরেছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে দেশের ভেতরেই আস্থার সংকট রয়েছে।

এই কারণেই ইরানে শাসন পরিবর্তন হলে চীন সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারাপ পরিস্থিতি হিসেবে দেখছে না। বেইজিংয়ের কাছে মূল বিষয় হলো—নতুন সরকার যেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং তেলের প্রবাহ নিশ্চিত করে।

তেলের নিরাপত্তাই চীনের মূল উদ্বেগ

ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। যদিও চীন কয়লা, সৌর, বায়ু ও পারমাণবিক শক্তিতে বড় বিনিয়োগ করেছে, তবুও তেল এখনও অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।

বিমান চলাচল, জাহাজ পরিচালনা এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের জন্য চীন এখনও আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির মজুত তেল স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট হলেও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ বিঘ্ন সহ্য করার মতো নয়।

Analysis: What happens if Iran closes the Strait of Hormuz? | Arab News

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বড় সংকট

চীনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হরমুজ প্রণালীর সম্ভাব্য বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে চীনের অর্ধেকের বেশি তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

চীনা জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এতদিন ধরে মনে করতেন, এমন পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটবে না। কারণ এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হবে এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক সমাধান বেরিয়ে আসবে।

তবুও বর্তমান সংঘাত সেই ধারণাকে নতুন করে পরীক্ষা করছে। বেইজিং ইতিমধ্যেই তেহরানের ওপর চাপ দিচ্ছে যেন প্রণালী খোলা রাখা হয় এবং তেল পরিবহনে কোনো বাধা না সৃষ্টি করা হয়।

দীর্ঘ যুদ্ধ হলে চীনের অবস্থান বদলাতে পারে

What Lessons Does Putin's War in Ukraine Teach China?

যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ইরান শক্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাহলে চীনের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে তেহরানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা বেইজিংয়ের জন্য কঠিন হবে।

তখন চীন হয়তো রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধে যেভাবে সহায়তা করেছে, তেমনভাবে প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ বা অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে পারে।

তবে যদি ইরানের বর্তমান শাসন দ্রুত পতন হয় অথবা পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে যায়, তাহলে চীন তাতে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হবে না। বেইজিং ইতিমধ্যেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছে।

চীনের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের প্রবাহ অব্যাহত রাখা এবং ভবিষ্যতে যে নেতৃত্বই ক্ষমতায় আসুক, তাদের সঙ্গে কাজ করার পথ তৈরি করা।