০১:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ারে ওরাকলের বড় উত্থান, ২০২৭ সালের আগেই আয়ে নতুন রেকর্ডের ইঙ্গিত পিরিয়ড ট্যাক্সের বিরুদ্ধে তরুণ আইনজীবী মাহনূর ওমরের লড়াই, পাকিস্তানে শুরু নতুন জাতীয় বিতর্ক ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ার বাজারে নামতে প্রস্তুত ইলন মাস্কের স্পেসএক্স ক্রিপ্টো দুনিয়ায় দ্রুত উত্থান ‘স্টেবলকয়েন’-এর, ডলার নির্ভর এই মুদ্রা ঘিরে বাড়ছে ঝুঁকি ও সম্ভাবনার বিতর্ক ইরানপন্থী সমাবেশের আশঙ্কা, লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল নিষিদ্ধ করলেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমানিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর অনুমোদন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ; তেল ছাড়তে প্রস্তুত জাপান ও জার্মানি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই থাইল্যান্ডের জাহাজে হরমুজ প্রণালীতে অজ্ঞাত হামলা, নিখোঁজ তিন নাবিক

ট্রাম্পের কল্পনার জগৎ ভেঙে পড়ছে

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কল্পনার আমেরিকা একেবারে অজেয় ও দুর্ভেদ্য।

সেই কল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি এতটাই উন্নত ও দক্ষ যে তারা চাইলে কোনো শত্রু দেশের ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে এনে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে রেখে দিতে পারে—একজন সৈন্যও না হারিয়ে। সেই আমেরিকা চাইলে যে কোনো দেশের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারে, মুহূর্তের মধ্যে পুরোনো জোট ছিন্ন করতে পারে, যে কোনো সময় যে কোনো দেশে বোমা হামলা চালাতে পারে, এমনকি সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানও উড়িয়ে দিতে পারে।

এই ধারণা অনুযায়ী, আমেরিকার অসীম শক্তি তাকে সব নিয়মের ঊর্ধ্বে তুলে দেয়, আর কোনো পরিণতির ভয়ও থাকে না। বিশাল সম্পদশালী ও ভৌগোলিকভাবে নিরাপদ একটি দেশ, যার দুই পাশে বিশাল সমুদ্র—তাহলে কেন সে নিজের ইচ্ছামতো চলবে না?

কিন্তু গত ছয় দিনে, যখন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছেন, তখন সেই সর্বশক্তিমান কল্পনার মুখোমুখি হয়েছে কঠোর বাস্তবতা।

হঠাৎ শুরু হওয়া যুদ্ধ

যুদ্ধটি শুরু হয়েছে এমন এক অঞ্চলে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি কেন্দ্রীয় কেন্দ্র। প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও শক্তিশালী অস্ত্রসজ্জিত একটি দেশ, যার হারানোর মতো প্রায় কিছুই নেই।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং আরও এক ডজন নেতাকে হত্যা করে। কিন্তু এরপর কী হবে—তা নিয়ে ট্রাম্প যে খুব বেশি ভাবেননি, সেটি স্পষ্ট।

অবিবেচকের মতো তিনি এমন একটি সংঘাত শুরু করেছেন যার শেষ কোথায় তা কেউ জানে না। ইতোমধ্যেই নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এর প্রতিক্রিয়া এখনই শুরু হয়েছে। অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। পেন্টাগন সরাসরি স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করেনি এবং আরও হতাহতের আশঙ্কার কথাও বলেছে।

ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর একের পর এক হামলা চালানো হলেও দেশটি পাল্টা আঘাত হানছে অবিরাম শক্তি দিয়ে।

ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতেই হামলা করেনি; তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে—যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরব—যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

বিমানবন্দর, হোটেল, ডাটা সেন্টার এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হয়েছে, ফলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্বের তেল ও গ্যাস রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।

‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ ধারণার ভাঙন

ট্রাম্প যে বিশ্বকে অস্বীকার করতে চান—এই ঘটনাগুলো সেই জটিল, পরস্পর নির্ভরশীল বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চল তার স্পষ্ট উদাহরণ। এটি অর্থ, মানুষ এবং ক্ষমতার এক বৈশ্বিক সংযোগস্থল। এখানে শুধু আমেরিকার অর্থনৈতিক স্বার্থই জড়িত নয়, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদও জড়িত।

আজ সেখানে বাতিল ফ্লাইট, বন্ধ রিফাইনারি এবং আকাশে প্রতিহত হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র যেন দেখিয়ে দিচ্ছে—“দুর্গ আমেরিকা” ধারণাটি কতটা ভ্রান্ত।

অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ

এই যুদ্ধের জন্য ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি। আন্তর্জাতিক সমর্থনও পাননি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—উপসাগরীয় দেশগুলোও যে হামলার লক্ষ্য হতে পারে, সেটিও তিনি যেন ভাবেননি।

সোমবার একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ইরানের হামলা ছিল তার জন্য “সম্ভবত সবচেয়ে বড় বিস্ময়”। অথচ এই অঞ্চলের প্রায় সব দেশই আগেই সতর্ক করেছিল—যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে ইরান অবশ্যই প্রতিশোধ নেবে।

অস্পষ্ট উদ্দেশ্য

এই যুদ্ধের কারণ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক পর্যায়ে বলেন, ইসরায়েলের সম্ভাব্য আসন্ন হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।

কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প নিজেই দাবি করেন, তিনিই নাকি ইসরায়েলকে এই পদক্ষেপ নিতে চাপ দিয়েছিলেন।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট সম্ভবত সবচেয়ে কাছাকাছি সত্যটি বলেছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “প্রেসিডেন্টের মনে হয়েছিল ইরান যুক্তরাষ্ট্রে হামলা করতে পারে।”

যুদ্ধ কোথায় গড়াবে

যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্য অনিশ্চিত।

জার্মানির চ্যান্সেলরের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, “সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হবে যদি আমরা এটা করি আর পরে এমন কেউ ক্ষমতায় আসে, যে আগের জনের মতোই খারাপ।”

তার কথায় মনে হয়েছে যেন তিনি প্রথমবারের মতো এই সম্ভাবনাটি ভাবছেন।

বৈশ্বিক বাস্তবতার ধাক্কা

ট্রাম্প প্রায়ই এমন আচরণ করেন যেন তিনি ঘটনাগুলোর একজন দর্শক মাত্র—যদিও সেগুলো তার নিজের সিদ্ধান্তেই শুরু হয়েছে।

এতে একটি গভীর সত্য ফুটে ওঠে। ট্রাম্প যেন বিশ্বাস করেন, তিনি এবং তার কল্পনার আমেরিকা পৃথিবীর অন্য বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্তরে অবস্থান করেন।

যেন তার সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতি অন্য কারও সমস্যা।

কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই বিভ্রম বেশিক্ষণ টিকতে পারে না।

উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা।

আর সেই প্রেক্ষাপটে আজকের যুদ্ধ ঘটছে এমন এক অঞ্চলে, যা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

উপসাগরীয় অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক প্রমাণিত তেল মজুদ।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, যার বড় অংশ আসে কাতার থেকে।

ইতোমধ্যে কাতার তার তরলীকরণ স্থাপনাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে। এর ফলে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার আমদানিকারকদের জন্য গুরুতর সংকট তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র

গত কয়েক দশকে উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত অর্থনীতির বৈচিত্র্য এনেছে।

আজ এই অঞ্চল অর্থনীতি, বিমান চলাচল, প্রযুক্তি ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

দুবাই, দোহা ও আবুধাবির বিশাল বিমানবন্দর এবং বিমানবহর এই অঞ্চলকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমান যোগাযোগ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

এই বিমানবন্দরগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু লাখো যাত্রী আটকে পড়েনি; বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্বার্থ

উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব ট্রাম্পের চেয়ে ভালোভাবে বোঝার কথা খুব কম মানুষেরই।

তার পরিবারের ব্যবসা এখানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের রিয়েল এস্টেট চুক্তি করেছে।

২০২২ সালে তার জামাতা জ্যারেড কুশনার সৌদি আরবের সার্বভৌম তহবিল থেকে দুই বিলিয়ন ডলার পেয়েছিলেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানির প্রায় অর্ধেক শেয়ার কিনেছিল ৫০০ মিলিয়ন ডলারে।

এর কিছুদিন পর কাতার তাকে বিলাসবহুল একটি সোনালি বোয়িং ৭৪৭ উপহার দেয়।

যুদ্ধের বিস্তার

এখন এই সবকিছুই ঝুঁকির মধ্যে।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়।

বুধবার ন্যাটো বাহিনী তুরস্কের আকাশসীমায় ঢুকতে যাওয়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে।

বৃহস্পতিবার আজারবাইজান জানায়, একাধিক ড্রোন তাদের সীমান্ত অতিক্রম করেছে এবং অন্তত দুজন আহত হয়েছে।

এরপর কী হবে—কেউ জানে না।

অনন্ত যুদ্ধের ইঙ্গিত

তবুও ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, যুদ্ধ “চিরকালও চলতে পারে।”

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, তেহরানের ওপর সারাদিন আকাশ থেকে “মৃত্যু ও ধ্বংস” বর্ষিত হবে।

তার ভাষায়, “এটি কখনোই সমান লড়াই হওয়ার কথা ছিল না। আমরা তাদের দুর্বল অবস্থায় আঘাত করছি—এটাই হওয়া উচিত।”

ইতিহাসের সতর্কতা

এই ধরনের সীমাহীন সহিংসতার কথা শুনে লেখকের মনে পড়ে যায় উপনিবেশবিরোধী কবি ও নেতা আইমে সেজায়ারের কথা।

১৯৫০ সালে তিনি লিখেছিলেন, “বর্বরতার সময় এসে গেছে—আধুনিক বর্বরতার সময়। সহিংসতা, অতিরিক্ততা, অপচয়, ভণ্ডামি, বোকামি ও বিশৃঙ্খলা।”

বাস্তবতার পাঠ

প্রায়ই বলা হয়, যুদ্ধ নাকি আমেরিকানদের ভূগোল শেখানোর ঈশ্বরের উপায়।

হয়তো এই যুদ্ধ ট্রাম্পকেও একটি সহজ শিক্ষা দেবে—

পৃথিবীর অন্য দেশ ও মানুষ বাস্তব, তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্য ও ক্ষমতা রয়েছে।

আর আমেরিকার প্রতিটি পদক্ষেপের এমন পরিণতি রয়েছে, যা সে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

এর বাইরে যা কিছু—সবই কেবল কল্পনা।
জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ

ট্রাম্পের কল্পনার জগৎ ভেঙে পড়ছে

০৮:০০:৪৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কল্পনার আমেরিকা একেবারে অজেয় ও দুর্ভেদ্য।

সেই কল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি এতটাই উন্নত ও দক্ষ যে তারা চাইলে কোনো শত্রু দেশের ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে এনে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে রেখে দিতে পারে—একজন সৈন্যও না হারিয়ে। সেই আমেরিকা চাইলে যে কোনো দেশের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারে, মুহূর্তের মধ্যে পুরোনো জোট ছিন্ন করতে পারে, যে কোনো সময় যে কোনো দেশে বোমা হামলা চালাতে পারে, এমনকি সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানও উড়িয়ে দিতে পারে।

এই ধারণা অনুযায়ী, আমেরিকার অসীম শক্তি তাকে সব নিয়মের ঊর্ধ্বে তুলে দেয়, আর কোনো পরিণতির ভয়ও থাকে না। বিশাল সম্পদশালী ও ভৌগোলিকভাবে নিরাপদ একটি দেশ, যার দুই পাশে বিশাল সমুদ্র—তাহলে কেন সে নিজের ইচ্ছামতো চলবে না?

কিন্তু গত ছয় দিনে, যখন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছেন, তখন সেই সর্বশক্তিমান কল্পনার মুখোমুখি হয়েছে কঠোর বাস্তবতা।

হঠাৎ শুরু হওয়া যুদ্ধ

যুদ্ধটি শুরু হয়েছে এমন এক অঞ্চলে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি কেন্দ্রীয় কেন্দ্র। প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও শক্তিশালী অস্ত্রসজ্জিত একটি দেশ, যার হারানোর মতো প্রায় কিছুই নেই।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং আরও এক ডজন নেতাকে হত্যা করে। কিন্তু এরপর কী হবে—তা নিয়ে ট্রাম্প যে খুব বেশি ভাবেননি, সেটি স্পষ্ট।

অবিবেচকের মতো তিনি এমন একটি সংঘাত শুরু করেছেন যার শেষ কোথায় তা কেউ জানে না। ইতোমধ্যেই নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এর প্রতিক্রিয়া এখনই শুরু হয়েছে। অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। পেন্টাগন সরাসরি স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করেনি এবং আরও হতাহতের আশঙ্কার কথাও বলেছে।

ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর একের পর এক হামলা চালানো হলেও দেশটি পাল্টা আঘাত হানছে অবিরাম শক্তি দিয়ে।

ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতেই হামলা করেনি; তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে—যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরব—যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

বিমানবন্দর, হোটেল, ডাটা সেন্টার এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হয়েছে, ফলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্বের তেল ও গ্যাস রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।

‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ ধারণার ভাঙন

ট্রাম্প যে বিশ্বকে অস্বীকার করতে চান—এই ঘটনাগুলো সেই জটিল, পরস্পর নির্ভরশীল বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চল তার স্পষ্ট উদাহরণ। এটি অর্থ, মানুষ এবং ক্ষমতার এক বৈশ্বিক সংযোগস্থল। এখানে শুধু আমেরিকার অর্থনৈতিক স্বার্থই জড়িত নয়, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদও জড়িত।

আজ সেখানে বাতিল ফ্লাইট, বন্ধ রিফাইনারি এবং আকাশে প্রতিহত হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র যেন দেখিয়ে দিচ্ছে—“দুর্গ আমেরিকা” ধারণাটি কতটা ভ্রান্ত।

অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ

এই যুদ্ধের জন্য ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি। আন্তর্জাতিক সমর্থনও পাননি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—উপসাগরীয় দেশগুলোও যে হামলার লক্ষ্য হতে পারে, সেটিও তিনি যেন ভাবেননি।

সোমবার একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ইরানের হামলা ছিল তার জন্য “সম্ভবত সবচেয়ে বড় বিস্ময়”। অথচ এই অঞ্চলের প্রায় সব দেশই আগেই সতর্ক করেছিল—যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে ইরান অবশ্যই প্রতিশোধ নেবে।

অস্পষ্ট উদ্দেশ্য

এই যুদ্ধের কারণ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক পর্যায়ে বলেন, ইসরায়েলের সম্ভাব্য আসন্ন হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।

কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প নিজেই দাবি করেন, তিনিই নাকি ইসরায়েলকে এই পদক্ষেপ নিতে চাপ দিয়েছিলেন।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট সম্ভবত সবচেয়ে কাছাকাছি সত্যটি বলেছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “প্রেসিডেন্টের মনে হয়েছিল ইরান যুক্তরাষ্ট্রে হামলা করতে পারে।”

যুদ্ধ কোথায় গড়াবে

যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্য অনিশ্চিত।

জার্মানির চ্যান্সেলরের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, “সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হবে যদি আমরা এটা করি আর পরে এমন কেউ ক্ষমতায় আসে, যে আগের জনের মতোই খারাপ।”

তার কথায় মনে হয়েছে যেন তিনি প্রথমবারের মতো এই সম্ভাবনাটি ভাবছেন।

বৈশ্বিক বাস্তবতার ধাক্কা

ট্রাম্প প্রায়ই এমন আচরণ করেন যেন তিনি ঘটনাগুলোর একজন দর্শক মাত্র—যদিও সেগুলো তার নিজের সিদ্ধান্তেই শুরু হয়েছে।

এতে একটি গভীর সত্য ফুটে ওঠে। ট্রাম্প যেন বিশ্বাস করেন, তিনি এবং তার কল্পনার আমেরিকা পৃথিবীর অন্য বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্তরে অবস্থান করেন।

যেন তার সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতি অন্য কারও সমস্যা।

কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই বিভ্রম বেশিক্ষণ টিকতে পারে না।

উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা।

আর সেই প্রেক্ষাপটে আজকের যুদ্ধ ঘটছে এমন এক অঞ্চলে, যা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

উপসাগরীয় অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক প্রমাণিত তেল মজুদ।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, যার বড় অংশ আসে কাতার থেকে।

ইতোমধ্যে কাতার তার তরলীকরণ স্থাপনাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে। এর ফলে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার আমদানিকারকদের জন্য গুরুতর সংকট তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র

গত কয়েক দশকে উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত অর্থনীতির বৈচিত্র্য এনেছে।

আজ এই অঞ্চল অর্থনীতি, বিমান চলাচল, প্রযুক্তি ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

দুবাই, দোহা ও আবুধাবির বিশাল বিমানবন্দর এবং বিমানবহর এই অঞ্চলকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমান যোগাযোগ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

এই বিমানবন্দরগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু লাখো যাত্রী আটকে পড়েনি; বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্বার্থ

উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব ট্রাম্পের চেয়ে ভালোভাবে বোঝার কথা খুব কম মানুষেরই।

তার পরিবারের ব্যবসা এখানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের রিয়েল এস্টেট চুক্তি করেছে।

২০২২ সালে তার জামাতা জ্যারেড কুশনার সৌদি আরবের সার্বভৌম তহবিল থেকে দুই বিলিয়ন ডলার পেয়েছিলেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানির প্রায় অর্ধেক শেয়ার কিনেছিল ৫০০ মিলিয়ন ডলারে।

এর কিছুদিন পর কাতার তাকে বিলাসবহুল একটি সোনালি বোয়িং ৭৪৭ উপহার দেয়।

যুদ্ধের বিস্তার

এখন এই সবকিছুই ঝুঁকির মধ্যে।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়।

বুধবার ন্যাটো বাহিনী তুরস্কের আকাশসীমায় ঢুকতে যাওয়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে।

বৃহস্পতিবার আজারবাইজান জানায়, একাধিক ড্রোন তাদের সীমান্ত অতিক্রম করেছে এবং অন্তত দুজন আহত হয়েছে।

এরপর কী হবে—কেউ জানে না।

অনন্ত যুদ্ধের ইঙ্গিত

তবুও ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, যুদ্ধ “চিরকালও চলতে পারে।”

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, তেহরানের ওপর সারাদিন আকাশ থেকে “মৃত্যু ও ধ্বংস” বর্ষিত হবে।

তার ভাষায়, “এটি কখনোই সমান লড়াই হওয়ার কথা ছিল না। আমরা তাদের দুর্বল অবস্থায় আঘাত করছি—এটাই হওয়া উচিত।”

ইতিহাসের সতর্কতা

এই ধরনের সীমাহীন সহিংসতার কথা শুনে লেখকের মনে পড়ে যায় উপনিবেশবিরোধী কবি ও নেতা আইমে সেজায়ারের কথা।

১৯৫০ সালে তিনি লিখেছিলেন, “বর্বরতার সময় এসে গেছে—আধুনিক বর্বরতার সময়। সহিংসতা, অতিরিক্ততা, অপচয়, ভণ্ডামি, বোকামি ও বিশৃঙ্খলা।”

বাস্তবতার পাঠ

প্রায়ই বলা হয়, যুদ্ধ নাকি আমেরিকানদের ভূগোল শেখানোর ঈশ্বরের উপায়।

হয়তো এই যুদ্ধ ট্রাম্পকেও একটি সহজ শিক্ষা দেবে—

পৃথিবীর অন্য দেশ ও মানুষ বাস্তব, তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্য ও ক্ষমতা রয়েছে।

আর আমেরিকার প্রতিটি পদক্ষেপের এমন পরিণতি রয়েছে, যা সে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

এর বাইরে যা কিছু—সবই কেবল কল্পনা।