০৩:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
গাজায় নারীদের ‘বেঁচে থাকার ন্যূনতম শর্ত’ থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে: অ্যামনেস্টি মুন্সীগঞ্জ–১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদ আর নেই হরমুজ থেকে মস্কো—বিশ্বের জ্বালানি সংকটের মাঝেও কীভাবে তেল সরবরাহ সামলাচ্ছে ভারত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীরের জামিন মঞ্জুর, মুক্তিতে আর বাধা নেই রাশিয়ায় খাদ্য শিল্পে নতুন বিলিয়নিয়ারদের উত্থান আবার বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরিতে বৃদ্ধি ২,২১৬ টাকা বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা কেন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব তেল সরবরাহে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কতটা তৈরি ভারত? আলোচনায় কোহিনূর মিয়া,পুলিশ ও প্রশাসনে অবসর-বরখাস্ত থেকে ফেরানোর প্রভাব কেমন হবে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ প্রাপ্তবয়স্কের ভ্যাপ ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব নিয়ে নতুন বিতর্ক

দি নিউ ইয়র্ক টাইমস মতামত বিভাগের ছয় জন বিশেষজ্ঞর মন্তব্য : ইরানের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে

ইরানে চলমান যুদ্ধ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই দেশের ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ইরান এবং প্রবাসী ইরানিদের অনেকের কাছে দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু স্বস্তির অনুভূতি এনে দিয়েছে—কেউ কেউ এটিকে সতর্ক আশার আলো হিসেবেও দেখছেন। আবার অনেকের কাছে এটি ছিল এক গভীর ট্র্যাজেডি: একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের মৃত্যু এবং বিদেশি শক্তির কারণে তাদের দেশের ওপর আরেকটি আঘাত।

এদিকে যুদ্ধ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশের পাশাপাশি শত শত সাধারণ নাগরিকও নিহত হয়েছেন। এর জবাবে ইরানও অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে অন্তত ছয়টি দেশের ওপর। যুদ্ধ যত তীব্র হচ্ছে, দেশ ও দেশের বাইরে বসবাসকারী প্রায় ১০ কোটি ইরানির ভবিষ্যৎ ততই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। শান্তি কবে আসবে এবং যুদ্ধ শেষ হলে কী ধরনের সরকার গঠিত হবে—এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। এই অনিশ্চিত মুহূর্তে কী কী সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বা কোন বিষয়গুলো অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে—তা নিয়ে ছয়জন লেখক তাদের মতামত তুলে ধরেছেন।

ধর্মতান্ত্রিক শাসন টিকে থাকতে পারে

লেখক: ত্রিতা পারসি

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান নীতি একটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—তেহরানের সরকার ভেঙে পড়ার পথে। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি আলোচনায় আত্মসমর্পণ করতে ইরানকে চাপ দেন, না হলে যুদ্ধের হুমকি দেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেই যুদ্ধ শুরু করার এক সপ্তাহের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে এই ধারণা ভুল হতে পারে। অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা, এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র এখনো ক্ষমতায় রয়েছে। এই ভুল হিসাব যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সরকারটি এতটা স্থিতিশীল থাকবে—এটা হয়তো খুব অপ্রত্যাশিত নয়। জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ ইরানির কাছে সরকার অজনপ্রিয় হলেও লাখো মানুষের সমর্থন এখনো রয়েছে। এছাড়া বিপ্লবী রাষ্ট্রব্যবস্থাটি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে নেতৃত্বের কেউ নিহত হলেও শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে।

১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর গঠিত ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে এমনভাবে সংগঠিত করা হয়েছিল যাতে নতুন রাষ্ট্রকে রক্ষা করা যায়। কারণ বিপ্লবীরা আশঙ্কা করেছিলেন যে পুরোনো সেনাবাহিনী হয়তো রাজতন্ত্রের প্রতি অনুগত থেকে যেতে পারে। ফলে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোতে একাধিক স্তরের বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

জুন মাসে হামলার পর থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক পদে বিকল্প নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে—কখনও পাঁচ স্তর পর্যন্ত। প্রাদেশিক গভর্নরদের এমন ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে যা প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সমতুল্য হতে পারে, যাতে কেন্দ্রীয় কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রশাসন চলতে পারে। স্থানীয় সামরিক কমান্ডারদেরও তেহরানের নির্দেশের অপেক্ষা না করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের এই যুদ্ধ উল্টো ধর্মতান্ত্রিক সরকারের পক্ষেও কাজ করতে পারে। বিদেশি হামলার মুখে জাতীয়তাবাদী অনুভূতি জোরদার হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ভেতরে জাতীয়তাবাদী আবেগ আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।

বিশেষ করে যদি মনে হয় যে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিয়ে ইরানকে ভাগ করতে চায়, তাহলে এই প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হতে পারে। ইতিহাসে বিচ্ছিন্নতাবাদের হুমকি থাকায় ইরানি সমাজ ভূখণ্ড বিভক্তির আশঙ্কার প্রতি খুব সংবেদনশীল।

খামেনি নিহত হওয়ার পরের ২৪ ঘণ্টা সরকার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় ছিল। কিছু বিচ্ছিন্ন উদ্‌যাপন দেখা গেলেও বড় ধরনের গণবিক্ষোভ হয়নি। এখন সরকার আবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প হয়তো আশা করছেন যে ইরানের অভ্যন্তরে ভাঙন ধরবে, যেমন ভেনেজুয়েলায় হয়েছিল।

কিন্তু এই আশা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। কারণ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনেক ইরানির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এমন কোনো নেতা কল্পনা করা কঠিন, যিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে ইরানের কৌশলগত অবস্থান এত বড়ভাবে বদলে ফেলতে রাজি হবেন।

The myth of Iran's invincibility has been shattered, and the fallout could be far-reaching | CNN

সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নিতে পারে
লেখক: আলি ভায়েজ

বর্তমানে ইরানের ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারে।

আয়াতুল্লাহ খামেনি শুধু এই বাহিনীকে নিজের নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করেননি; তিনি এটিকে রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভে পরিণত করেছিলেন। এই বাহিনী শুধু সামরিক নয়—এটি বিশাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, রাষ্ট্রের প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব রাখে, নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা চালায়, বিদেশে সহযোগী গোষ্ঠী গড়ে তোলে এবং একটি বড় গণমাধ্যম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জনমতও প্রভাবিত করে।

যুদ্ধ শেষে কী ঘটবে তা নির্ভর করবে কে বা কী টিকে থাকে তার ওপর।

যদি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকে, তাহলে নতুন কোনো ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হবে। তবে তিনি খামেনির মতো শক্তিশালী হবেন না। তখন বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আড়াল থেকে ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারে। ক্ষমতা সম্ভবত এমন ব্যক্তিদের হাতে যাবে যাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে—যেমন আলি লারিজানি বা সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ।

অন্যদিকে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই নেতৃত্বকেও সরিয়ে দেয়, তাহলে অন্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তখন কোনো শক্তিশালী সামরিক নেতা সামনে এসে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারেন—যাকে কেউ কেউ “বোনাপার্ট ধাঁচের নেতা” বলে উল্লেখ করেন। এমন একজন নেতা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ালেও অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করতে পারেন এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করতে পারেন।

আরেকটি সম্ভাবনা আরও বিপজ্জনক। যদি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভেতরে এমন কোনো নেতা না থাকে যিনি পুরো বাহিনীকে একত্রে রাখতে পারেন, তাহলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে। তখন দেশ লিবিয়া বা সুদানের মতো অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে যেতে পারে।

হারিয়ে যেতে পারে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ
লেখক: সানাম ভাকিল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ অনেক ইরানির কাছে সেই মুহূর্ত তৈরি করেছে যার জন্য তারা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছিলেন। খামেনির মৃত্যু এবং তেহরানের ওপর অভূতপূর্ব সামরিক চাপ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কিন্তু বাস্তবে এই সুযোগ কাজে লাগানো কঠিন। কারণ ইরানের বিরোধী শক্তিগুলো গভীরভাবে বিভক্ত। রাজতন্ত্রপন্থী, নির্বাসিত বিরোধী সংগঠন, কুর্দি ও অন্যান্য জাতিগত দল—সবাই আলাদা আলাদা অবস্থানে রয়েছে।

এখনো পর্যন্ত এমন কোনো ঐক্যবদ্ধ বিরোধী কাঠামো তৈরি হয়নি যা ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। নেই কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা সংগঠিত নেতৃত্ব।

তাছাড়া ইরানের ইতিহাসে বিদেশি হস্তক্ষেপ বহুবার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দুর্বল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যও পরিষ্কার নয়—প্রথমে শাসন পরিবর্তনের ইঙ্গিত থাকলেও এখন তারা মূলত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের কথা বলছে।

অতীতে ইরানে বহুবার গণআন্দোলন হয়েছে—বিতর্কিত নির্বাচন, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে। কিন্তু এগুলো এখনো শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।

রাজতন্ত্র ফেরার স্বপ্ন
লেখক: স্টিফেন কিনজার

ইরানের আধুনিক ইতিহাসে বিদেশি হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে। তাই বাইরের শক্তির সমর্থনে ক্ষমতায় আসা কোনো নেতা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

কেউ কেউ মনে করেন, ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শাহের ছেলে রেজা পাহলভি ফিরে এসে নতুন সরকার গঠন করতে পারেন। কিন্তু অনেক ইরানি তাকে বাস্তবসম্মত নেতা হিসেবে দেখেন না।

ইতিহাসে দেখা গেছে বিদেশি সমর্থনে ক্ষমতায় আসা শাসকদের বৈধতা খুব দুর্বল হয়। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সহায়তায় শাহকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে তিনি ক্ষমতা হারান।

তাই এখন বিদেশি সামরিক শক্তির সাহায্যে কেউ ক্ষমতায় এলে একই ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।

Iran-US war latest: Trump vows ‘very hard’ strikes as Tehran rejects surrender

আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি
লেখক: ইয়াসমিন ফারুক

যদি ইরান রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব শুধু দেশটির ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পারমাণবিক প্রযুক্তি, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাইবার সক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইরানের পতন হলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকায় সহিংসতা, অস্ত্র ও মানবপাচারের নতুন করিডোর তৈরি হতে পারে।

এছাড়া প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশে রাষ্ট্র ভেঙে পড়লে বিশাল শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে, যা ইউরোপসহ বহু দেশকে প্রভাবিত করবে।

ইরানিরাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে
লেখক: আফশিন মাতিন-আসগারি

ইসলামী প্রজাতন্ত্র বহু বছর ধরে কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রেখেছে। ছাত্র, শ্রমিক, নারী ও সংখ্যালঘুদের আন্দোলন বারবার দমন করা হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এবং জনঅসন্তোষ বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভি সংবিধান পরিবর্তনের জন্য গণভোটের আহ্বান জানিয়েছেন। অনেক নাগরিক সংগঠনও মুক্ত নির্বাচন ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবি তুলছে।

যদি যুদ্ধ বন্ধ হয় এবং ইরানিরা নিজেরাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পান, তাহলে দেশটি শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের পথে যেতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজায় নারীদের ‘বেঁচে থাকার ন্যূনতম শর্ত’ থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে: অ্যামনেস্টি

দি নিউ ইয়র্ক টাইমস মতামত বিভাগের ছয় জন বিশেষজ্ঞর মন্তব্য : ইরানের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে

০৮:০০:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

ইরানে চলমান যুদ্ধ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই দেশের ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ইরান এবং প্রবাসী ইরানিদের অনেকের কাছে দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু স্বস্তির অনুভূতি এনে দিয়েছে—কেউ কেউ এটিকে সতর্ক আশার আলো হিসেবেও দেখছেন। আবার অনেকের কাছে এটি ছিল এক গভীর ট্র্যাজেডি: একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের মৃত্যু এবং বিদেশি শক্তির কারণে তাদের দেশের ওপর আরেকটি আঘাত।

এদিকে যুদ্ধ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশের পাশাপাশি শত শত সাধারণ নাগরিকও নিহত হয়েছেন। এর জবাবে ইরানও অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে অন্তত ছয়টি দেশের ওপর। যুদ্ধ যত তীব্র হচ্ছে, দেশ ও দেশের বাইরে বসবাসকারী প্রায় ১০ কোটি ইরানির ভবিষ্যৎ ততই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। শান্তি কবে আসবে এবং যুদ্ধ শেষ হলে কী ধরনের সরকার গঠিত হবে—এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। এই অনিশ্চিত মুহূর্তে কী কী সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বা কোন বিষয়গুলো অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে—তা নিয়ে ছয়জন লেখক তাদের মতামত তুলে ধরেছেন।

ধর্মতান্ত্রিক শাসন টিকে থাকতে পারে

লেখক: ত্রিতা পারসি

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান নীতি একটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—তেহরানের সরকার ভেঙে পড়ার পথে। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি আলোচনায় আত্মসমর্পণ করতে ইরানকে চাপ দেন, না হলে যুদ্ধের হুমকি দেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেই যুদ্ধ শুরু করার এক সপ্তাহের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে এই ধারণা ভুল হতে পারে। অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা, এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র এখনো ক্ষমতায় রয়েছে। এই ভুল হিসাব যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সরকারটি এতটা স্থিতিশীল থাকবে—এটা হয়তো খুব অপ্রত্যাশিত নয়। জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ ইরানির কাছে সরকার অজনপ্রিয় হলেও লাখো মানুষের সমর্থন এখনো রয়েছে। এছাড়া বিপ্লবী রাষ্ট্রব্যবস্থাটি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে নেতৃত্বের কেউ নিহত হলেও শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে।

১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর গঠিত ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে এমনভাবে সংগঠিত করা হয়েছিল যাতে নতুন রাষ্ট্রকে রক্ষা করা যায়। কারণ বিপ্লবীরা আশঙ্কা করেছিলেন যে পুরোনো সেনাবাহিনী হয়তো রাজতন্ত্রের প্রতি অনুগত থেকে যেতে পারে। ফলে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোতে একাধিক স্তরের বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

জুন মাসে হামলার পর থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক পদে বিকল্প নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে—কখনও পাঁচ স্তর পর্যন্ত। প্রাদেশিক গভর্নরদের এমন ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে যা প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সমতুল্য হতে পারে, যাতে কেন্দ্রীয় কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রশাসন চলতে পারে। স্থানীয় সামরিক কমান্ডারদেরও তেহরানের নির্দেশের অপেক্ষা না করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের এই যুদ্ধ উল্টো ধর্মতান্ত্রিক সরকারের পক্ষেও কাজ করতে পারে। বিদেশি হামলার মুখে জাতীয়তাবাদী অনুভূতি জোরদার হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ভেতরে জাতীয়তাবাদী আবেগ আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।

বিশেষ করে যদি মনে হয় যে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিয়ে ইরানকে ভাগ করতে চায়, তাহলে এই প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হতে পারে। ইতিহাসে বিচ্ছিন্নতাবাদের হুমকি থাকায় ইরানি সমাজ ভূখণ্ড বিভক্তির আশঙ্কার প্রতি খুব সংবেদনশীল।

খামেনি নিহত হওয়ার পরের ২৪ ঘণ্টা সরকার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় ছিল। কিছু বিচ্ছিন্ন উদ্‌যাপন দেখা গেলেও বড় ধরনের গণবিক্ষোভ হয়নি। এখন সরকার আবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প হয়তো আশা করছেন যে ইরানের অভ্যন্তরে ভাঙন ধরবে, যেমন ভেনেজুয়েলায় হয়েছিল।

কিন্তু এই আশা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। কারণ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনেক ইরানির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এমন কোনো নেতা কল্পনা করা কঠিন, যিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে ইরানের কৌশলগত অবস্থান এত বড়ভাবে বদলে ফেলতে রাজি হবেন।

The myth of Iran's invincibility has been shattered, and the fallout could be far-reaching | CNN

সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নিতে পারে
লেখক: আলি ভায়েজ

বর্তমানে ইরানের ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারে।

আয়াতুল্লাহ খামেনি শুধু এই বাহিনীকে নিজের নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করেননি; তিনি এটিকে রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভে পরিণত করেছিলেন। এই বাহিনী শুধু সামরিক নয়—এটি বিশাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, রাষ্ট্রের প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব রাখে, নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা চালায়, বিদেশে সহযোগী গোষ্ঠী গড়ে তোলে এবং একটি বড় গণমাধ্যম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জনমতও প্রভাবিত করে।

যুদ্ধ শেষে কী ঘটবে তা নির্ভর করবে কে বা কী টিকে থাকে তার ওপর।

যদি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকে, তাহলে নতুন কোনো ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হবে। তবে তিনি খামেনির মতো শক্তিশালী হবেন না। তখন বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আড়াল থেকে ক্ষমতা পরিচালনা করতে পারে। ক্ষমতা সম্ভবত এমন ব্যক্তিদের হাতে যাবে যাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে—যেমন আলি লারিজানি বা সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ।

অন্যদিকে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই নেতৃত্বকেও সরিয়ে দেয়, তাহলে অন্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তখন কোনো শক্তিশালী সামরিক নেতা সামনে এসে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারেন—যাকে কেউ কেউ “বোনাপার্ট ধাঁচের নেতা” বলে উল্লেখ করেন। এমন একজন নেতা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ালেও অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করতে পারেন এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করতে পারেন।

আরেকটি সম্ভাবনা আরও বিপজ্জনক। যদি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভেতরে এমন কোনো নেতা না থাকে যিনি পুরো বাহিনীকে একত্রে রাখতে পারেন, তাহলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে। তখন দেশ লিবিয়া বা সুদানের মতো অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে যেতে পারে।

হারিয়ে যেতে পারে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ
লেখক: সানাম ভাকিল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ অনেক ইরানির কাছে সেই মুহূর্ত তৈরি করেছে যার জন্য তারা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছিলেন। খামেনির মৃত্যু এবং তেহরানের ওপর অভূতপূর্ব সামরিক চাপ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কিন্তু বাস্তবে এই সুযোগ কাজে লাগানো কঠিন। কারণ ইরানের বিরোধী শক্তিগুলো গভীরভাবে বিভক্ত। রাজতন্ত্রপন্থী, নির্বাসিত বিরোধী সংগঠন, কুর্দি ও অন্যান্য জাতিগত দল—সবাই আলাদা আলাদা অবস্থানে রয়েছে।

এখনো পর্যন্ত এমন কোনো ঐক্যবদ্ধ বিরোধী কাঠামো তৈরি হয়নি যা ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। নেই কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা সংগঠিত নেতৃত্ব।

তাছাড়া ইরানের ইতিহাসে বিদেশি হস্তক্ষেপ বহুবার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দুর্বল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যও পরিষ্কার নয়—প্রথমে শাসন পরিবর্তনের ইঙ্গিত থাকলেও এখন তারা মূলত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের কথা বলছে।

অতীতে ইরানে বহুবার গণআন্দোলন হয়েছে—বিতর্কিত নির্বাচন, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে। কিন্তু এগুলো এখনো শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।

রাজতন্ত্র ফেরার স্বপ্ন
লেখক: স্টিফেন কিনজার

ইরানের আধুনিক ইতিহাসে বিদেশি হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে। তাই বাইরের শক্তির সমর্থনে ক্ষমতায় আসা কোনো নেতা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

কেউ কেউ মনে করেন, ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শাহের ছেলে রেজা পাহলভি ফিরে এসে নতুন সরকার গঠন করতে পারেন। কিন্তু অনেক ইরানি তাকে বাস্তবসম্মত নেতা হিসেবে দেখেন না।

ইতিহাসে দেখা গেছে বিদেশি সমর্থনে ক্ষমতায় আসা শাসকদের বৈধতা খুব দুর্বল হয়। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সহায়তায় শাহকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে তিনি ক্ষমতা হারান।

তাই এখন বিদেশি সামরিক শক্তির সাহায্যে কেউ ক্ষমতায় এলে একই ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।

Iran-US war latest: Trump vows ‘very hard’ strikes as Tehran rejects surrender

আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি
লেখক: ইয়াসমিন ফারুক

যদি ইরান রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব শুধু দেশটির ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পারমাণবিক প্রযুক্তি, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাইবার সক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইরানের পতন হলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকায় সহিংসতা, অস্ত্র ও মানবপাচারের নতুন করিডোর তৈরি হতে পারে।

এছাড়া প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশে রাষ্ট্র ভেঙে পড়লে বিশাল শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে, যা ইউরোপসহ বহু দেশকে প্রভাবিত করবে।

ইরানিরাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে
লেখক: আফশিন মাতিন-আসগারি

ইসলামী প্রজাতন্ত্র বহু বছর ধরে কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রেখেছে। ছাত্র, শ্রমিক, নারী ও সংখ্যালঘুদের আন্দোলন বারবার দমন করা হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এবং জনঅসন্তোষ বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভি সংবিধান পরিবর্তনের জন্য গণভোটের আহ্বান জানিয়েছেন। অনেক নাগরিক সংগঠনও মুক্ত নির্বাচন ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবি তুলছে।

যদি যুদ্ধ বন্ধ হয় এবং ইরানিরা নিজেরাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পান, তাহলে দেশটি শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের পথে যেতে পারে।