মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত হঠাৎ করেই যুদ্ধের বাস্তবতায় কেঁপে উঠেছে। ইরানের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দুবাইয়ের মতো আধুনিক নগরী, যা দীর্ঘদিন ধরে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দুবাইয়ের আকাশে ধোঁয়া, আতঙ্কে উপসাগর
সপ্তাহান্তে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানার পর আকাশে কালো ধোঁয়া দেখা যায়। একই রাতে শহরের মেরিনা এলাকায় আরেকটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ একটি উঁচু ভবনে আঘাত করে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরদিন সকালে সৈকত এলাকার বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্ক সংকেত বেজে ওঠে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতি এমন সব দেশকে বিপাকে ফেলেছে যারা প্রকাশ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, কিন্তু এখন বাস্তবে সেই সংঘাতের মধ্যেই পড়ে গেছে।
স্থিতিশীলতার প্রতীক দুবাই
দুবাই বহু বছর ধরে ব্যবসা, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের এই শহরের ৯০ শতাংশের বেশি বাসিন্দাই বিদেশি। তাই নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ বলেন, দুবাই নিজেকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলেছিল, এমন একটি ব্র্যান্ড যা বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু চলমান হামলাগুলো সেই ভাবমূর্তিতে ইতিমধ্যেই আঘাত করেছে।
কূটনৈতিক ভারসাম্যের সীমা
দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলো এক ধরনের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। তারা একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করেনি।
কিন্তু সাম্প্রতিক হামলাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে সেই ভারসাম্যের সীমা কোথায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী গত কয়েক দিনে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দুবাইয়ের বিমানবন্দরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষয়ক্ষতি
উপসাগরীয় দেশগুলো দাবি করছে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। প্রায় ৯৪ শতাংশ হামলা প্রতিরোধ করা গেছে বলে জানানো হয়েছে।
তারপরও ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে এখন পর্যন্ত চারজন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। অপরদিকে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর প্রকাশ হয়েছে।
অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন
যুদ্ধের শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও দুবাইয়ের জীবন পুরোপুরি থেমে যায়নি। অনেক বাসিন্দা শহর ছেড়ে চলে গেলেও অনেকে এখনও দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
কেউ কেউ সরকারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখছেন, আবার অনেকেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে চলে যাওয়ার প্রস্তুতিও রাখছেন। শহরের পুরোনো এলাকায় ব্যবসা চলছে, যদিও আগের তুলনায় তা অনেক কম।

যুদ্ধের মাঝেও অদ্ভুত বাস্তবতা
দুবাইয়ের সৈকত ক্লাবগুলোতে আগের মতো ভিড় না থাকলেও সপ্তাহান্তে আড্ডা ও পার্টি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেকেই বলছেন, যুদ্ধের মধ্যেও শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এক ধরনের অদ্ভুত বাস্তবতার সৃষ্টি করেছে।
কিছু বাসিন্দার মতে, দুবাইয়ে যুদ্ধের অনুভূতি অন্য অনেক দেশের মতো নয়। কারণ শহরটি বহু বছর ধরে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
উপসাগরের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খেতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য আমদানি ও লবণমুক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল এই অঞ্চল আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তাদের আশঙ্কা, ইরানের একটি বড় আঘাত পুরো অঞ্চলের অবস্থান বদলে দিতে পারে এবং তখন উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও সরাসরি অবস্থান নিতে বাধ্য হতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















