যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড টিকা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ এক মোড় এসেছে। ফেডারেল সরকারের একটি প্রভাবশালী টিকা পরামর্শক প্যানেল কোভিড-১৯ এর এমআরএনএ টিকা পুনর্বিবেচনা করে সুপারিশ বাতিল করার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নীতিনির্ধারক এই টিকা সুপারিশ বন্ধ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেও সেই উদ্যোগ আর এগোচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত এমন সময় এসেছে যখন মার্কিন রাজনীতিতে টিকা নীতির যেকোনো বড় পরিবর্তন নির্বাচনী রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।
টিকা নিয়ে বিতর্কের পটভূমি
মার্কিন স্বাস্থ্য দপ্তরের নতুন নেতৃত্বের অধীনে কিছু উপদেষ্টা কোভিড-১৯ এমআরএনএ টিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তারা টিকার নিরাপত্তা ও উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। এমনকি কেউ কেউ দাবি করেছিলেন টিকায় থাকা ডিএনএ দূষণ মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এসব দাবি আগেই ভ্রান্ত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এক পর্যায়ে পুরোপুরি ফেডারেল সুপারিশ তুলে নেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছিল। যদি এমন সিদ্ধান্ত হতো, তাহলে স্বাস্থ্যবিমা প্রতিষ্ঠানগুলো টিকার খরচ বহন করবে কি না এবং ফার্মেসিগুলো টিকা সরবরাহ চালিয়ে যাবে কি না—তা নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারত।
পরামর্শক কমিটির আসন্ন বৈঠক
মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের টিকা বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির একটি বৈঠক আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নির্ধারিত বৈঠকটি স্থগিত হওয়ার পর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই কমিটি যুক্তরাষ্ট্রে কোন টিকা কখন নেওয়া উচিত—সেসব বিষয়ে নির্দেশনা দেয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তারা আগের নির্দেশনা সংশোধন করে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে কোভিড টিকা নেওয়ার পরামর্শের পরিবর্তে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে টিকা নেওয়ার কথা বলেছিল।

রাজনীতি ও নির্বাচনী হিসাব
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে টিকা নীতি নিয়ে মতভেদ থাকলেও রাজনৈতিক দিকটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কিছু রিপাবলিকান কৌশলবিদ মনে করছেন, টিকা নীতি নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার প্রভাব পড়তে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টিকা বাধ্যতামূলক করার বিরোধিতা যেমন রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যনীতি পুরোপুরি বাতিল করার প্রচেষ্টাও নির্বাচনী রাজনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে।
এমআরএনএ টিকার ভূমিকা
কোভিড মহামারি শুরু হওয়ার ছয় বছর পরও এমআরএনএ প্রযুক্তির টিকা স্বাস্থ্যনীতি ও জনমতের বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। এই টিকাগুলো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করেছে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
তবে নতুন করে টিকা নেওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে এ বছরের আপডেটেড কোভিড টিকা নিয়েছেন মাত্র প্রায় সাড়ে সতেরো শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রায় নয় শতাংশ শিশু।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, খুব বিরল ক্ষেত্রে এমআরএনএ টিকার পর হৃদপেশীর প্রদাহ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা খুবই সীমিত এবং টিকার সামগ্রিক উপকারের তুলনায় ঝুঁকি অত্যন্ত কম।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, কোভিড সংক্রমণের পর দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা বা দীর্ঘ কোভিড অনেক মানুষের জীবনে গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করছে। ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, স্মৃতিভ্রংশ বা শরীরব্যথার মতো লক্ষণ মাসের পর মাস স্থায়ী হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য টিকা হালনাগাদ রাখা এখনও গুরুতর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়।
Sarakhon Report 



















