০৭:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
ইসরায়েলের হামলা বন্ধের আহ্বান তুরস্কের তেলবাহী জাহাজকে এখনই নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত নয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রথম বার্তা শিগগির প্রকাশ পাটুরিয়ায় নদীতে পড়া তেলবাহী ট্রাক উদ্ধার অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য তদন্তে অন্তর্ভুক্তি ‘অস্বস্তিকর’, তবে বড় চ্যালেঞ্জ নয়: বিজিএমইএ সভাপতি রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট নরসিংদীতে ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, প্রাপকেরা পাচ্ছেন কম ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড সভায় ব্যবসার অগ্রগতি পর্যালোচনা, নেওয়া হলো গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ঢাকার সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ছয় ঘণ্টা পর স্বাভাবিক

লাতিন আমেরিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েনের ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল, দ্বন্দ্বপূর্ণ এবং নানা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক করার ঘটনা আবারও এই সম্পর্ককে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন কিউবা বা কলম্বিয়াকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে—এমন ইঙ্গিত পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। ইতিহাসবিদ গ্রেগ গ্র্যান্ডিন এই সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং এর প্রভাব নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি

যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সময় লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ অঞ্চল ছিল স্পেনের উপনিবেশ। ফলে শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলকে স্বাধীন দেশগুলোর সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি দুর্বল হয়ে পড়া সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে দেখত।

তৎকালীন মার্কিন নেতা টমাস জেফারসনের মতো ব্যক্তিরা মনে করতেন স্পেনের সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে এবং সেই ভাঙনের সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র তার কিছু অঞ্চল নিজেদের দখলে নিতে পারবে। বাস্তবেও অনেক ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছিল।

১৮২৩ সালে মনরো নীতি ঘোষণার সময় স্পষ্ট হয়ে যায় যে স্প্যানিশ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল স্বাধীনতার যুদ্ধে সফল হচ্ছে। মেক্সিকো তখন স্বাধীন, কলম্বিয়া স্বাধীনতার কাছাকাছি, আর পুরো স্প্যানিশ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছিল। সেই সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নতুন স্বাধীন দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করে।

এই সময়টিকে অনেক ইতিহাসবিদ যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রবেশের সূচনা হিসেবেও দেখেন।

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতি শুধু সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক কৌশল—সবই ব্যবহৃত হয়েছে।

১৮২০-এর দশকে মেক্সিকোতে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত একটি অভ্যুত্থান ঘটে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মার্কিন কূটনীতিক জোয়েল পয়নসেট। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে ব্রিটেন স্কটিশ রাইট ফ্রিম্যাসন সংগঠনের মাধ্যমে মেক্সিকোতে প্রভাব বাড়াচ্ছে। এর জবাবে তিনি মার্কিন স্বার্থের পক্ষে ইয়র্ক রাইট সংগঠনের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এই নেটওয়ার্ক শেষ পর্যন্ত এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেশি অনুকূল ছিল।

এর পাশাপাশি মার্কিন নৌবাহিনীও প্রভাব বিস্তারে ব্যবহৃত হয়। ব্রাজিলের উপকূল থেকে শুরু করে পারানা ও অ্যামাজন নদী পর্যন্ত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ উপস্থিত থাকত। এসব চাপের ফলে প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়।

১৮৫৪ সালে নিকারাগুয়ার গ্রেটাউন বন্দরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ গোলাবর্ষণ করে বন্দরটি ধ্বংস করে দেয়—যা সেই সময়ের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের উদাহরণ।

করপোরেট শক্তির উত্থান

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল করপোরেট স্বার্থ। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রাশের পর মধ্য আমেরিকার পরিবহন পথগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই সময় রেলপথ ও নৌপরিবহন ব্যবসায়ী কর্নেলিয়াস ভ্যান্ডারবিল্ট এই অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রভাব ঠেকাতে সক্রিয় হন। একই সময়ে টেনেসির ভাড়াটে সেনা উইলিয়াম ওয়াকার নিকারাগুয়া দখল করে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন।

ওয়াকার সেখানে আবার দাসপ্রথা চালু করার চেষ্টা করেন, যদিও তিন দশক আগেই তা বিলুপ্ত হয়েছিল। এই ঘটনা দেখায় যে সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর দাসপ্রথা সমর্থনকারী রাজনীতি বিদেশনীতি প্রভাবিত করছিল।

গৃহযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আসে। তখন করপোরেট বিনিয়োগ লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

মেক্সিকো বিশেষভাবে মার্কিন বিনিয়োগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া ও নিউইয়র্কের পুঁজি সেখানে ঢুকে পড়ে। মার্কিন ব্যবসায়ীরা মেক্সিকোর বন্দর, রেলপথ, ট্রামব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং টেলিগ্রাফ নেটওয়ার্কের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে ১৯১০ সালের মেক্সিকান বিপ্লবকে অনেক ইতিহাসবিদ মার্কিন করপোরেট প্রভাবের বিরুদ্ধে এক ধরনের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

‘লাতিন আমেরিকা’ ধারণার জন্ম

উইলিয়াম ওয়াকারের মতো হস্তক্ষেপের সময়ই এই অঞ্চলের চিন্তাবিদরা নিজেদের পরিচয় নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করেন। তারা নিজেদের “লাতিন আমেরিকান” হিসেবে চিহ্নিত করেন, যাতে “অ্যাংলো-স্যাক্সন আমেরিকা” থেকে পার্থক্য বোঝানো যায়।

এই ধারণায় লাতিন আমেরিকাকে মানবতাবাদী ও আদর্শবাদী অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়, আর যুক্তরাষ্ট্রকে দেখানো হয় ব্যবহারিক, পুঁজিবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে।

অর্থাৎ “লাতিন আমেরিকা” পরিচয়টি অনেকটাই গড়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায়।

Monroe Doctrine Still Dominates U.S., Latin America Relations After 200  Years

মার্কিন সমর্থনের মূল নীতি

লাতিন আমেরিকার কোনো সরকারকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে।

প্রথমত, সেই সরকার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে কতটা সহযোগিতা করছে।
দ্বিতীয়ত, সেই সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে মার্কিন সম্পদ ও ব্যবসা সুরক্ষিত রাখতে পারছে কি না।

পরে গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা স্বাধীনতার মতো ধারণাগুলো যুক্ত হলেও অনেক সময় সেগুলো মূলত রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে।

১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। কিউবার স্বাধীনতার আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে এক ধরনের পরোক্ষ মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

এই সময় থেকেই মানবাধিকার রক্ষার ভাষা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় শক্তি প্রদর্শনের যুক্তি তুলে ধরতে শুরু করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নীতির পরিবর্তন

১৯৩৩ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ক্ষমতায় এসে লাতিন আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনেন।

তিনি হস্তক্ষেপের পুরনো নীতি থেকে সরে এসে দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন। সেই সময় লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী নীতি গ্রহণ করা হয়, এবং যুক্তরাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে তা সমর্থনও করে।

মেক্সিকো ও বলিভিয়া বিদেশি সম্পদ জাতীয়করণ করলে যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেয়। এমনকি মেক্সিকো ও ব্রাজিলে ইস্পাত কারখানা গড়ে তুলতেও যুক্তরাষ্ট্র অর্থায়ন করে।

এই সহযোগিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশকে মিত্রশক্তির পক্ষে নিয়ে আসে।

শীতল যুদ্ধের সময় নতুন সংঘাত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ১৯৪৭ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় কমিউনিজম প্রতিরোধ।

যেসব অস্ত্র আগে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোই পরে বামপন্থী আন্দোলন দমনে ব্যবহৃত হয়।

চিলিতে ১৯৪৮ সালে শ্রমিক আন্দোলন দমন করতে এই অস্ত্র ব্যবহৃত হয়, যেখানে তরুণ সেনা কর্মকর্তা অগাস্টো পিনোচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এর ফলে পুরো অঞ্চলে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়তে থাকে এবং ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বহু বিদ্রোহ, সামরিক শাসন ও মার্কিন হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

লাতিন আমেরিকার দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় দ্বিধাবিভক্ত ছিল। একদিকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নতি ও শক্তিকে অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে দেখেছেন।

উদাহরণ হিসেবে সিমন বলিভার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে প্রশংসা করলেও তিনি মনে করতেন লাতিন আমেরিকার সামাজিক কাঠামো আলাদা হওয়ায় একই পথ অনুসরণ করা কঠিন।

পরবর্তীতে চিন্তাবিদ ফ্রান্সিসকো বিলবাও যুক্তরাষ্ট্রকে স্পার্টার সঙ্গে তুলনা করেন—শক্তিশালী কিন্তু সামরিক ও স্বার্থকেন্দ্রিক। আর লাতিন আমেরিকাকে তিনি এথেন্সের মতো মানবতাবাদী ও আদর্শবাদী হিসেবে দেখান।

এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পরে নির্ভরতা তত্ত্বের জন্ম হয়, যেখানে বলা হয় উন্নত বিশ্বের সমৃদ্ধি অনেকাংশে উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনৈতিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ফিদেল কাস্ত্রোর উদাহরণ

এই দ্বৈত সম্পর্কের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ফিদেল কাস্ত্রো। তরুণ বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখতেন। এমনকি তিনি একবার রুজভেল্টকে চিঠি লিখে কিউবার লৌহ আকরিক দিয়ে যুদ্ধজাহাজ তৈরির প্রস্তাব দেন।

কিন্তু ১৯৬১ সালে বে অফ পিগস আক্রমণ এবং কিউবা সরকারকে উৎখাতের মার্কিন প্রচেষ্টার পর তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র তখন তার কাছে অনুপ্রেরণা নয়, বরং প্রতিরোধ করার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।

মাদকবিরোধী যুদ্ধের প্রভাব

১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন “মাদকবিরোধী যুদ্ধ” ঘোষণা করেন। এর অংশ হিসেবে ১৯৭৩ সালে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ডিইএ গঠন করা হয়।

এর প্রথম বড় অভিযান চালানো হয় মেক্সিকোতে, যেখানে আফিম চাষ দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। সেনাবাহিনী ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ডিইএ কঠোর অভিযান চালায় এবং অনেক গ্রাম ধ্বংস করা হয়।

পরবর্তীতে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন সমর্থিত সরকারগুলো নিজেরাই মাদক উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিল।

চিলির সামরিক শাসক অগাস্টো পিনোচে প্রকাশ্যে মাদকবিরোধী অবস্থান নিলেও তার শাসনামলে কোকেন পাচার থেকে বিপুল লাভ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বলিভিয়া ও কলম্বিয়াতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়—যেখানে মাদকবিরোধী অভিযান ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন একসঙ্গে চলেছে।

সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ধারা

ইতিহাসবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাতিন আমেরিকার দুটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

প্রথমত, এই অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রকে তার ক্ষমতার সীমা বুঝতে সাহায্য করেছে। সার্বভৌমত্বের দাবি এবং হস্তক্ষেপের বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক সময় তার নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।

দ্বিতীয়ত, লাতিন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের পরীক্ষাগার হিসেবেও কাজ করেছে। এখানেই মার্কিন ব্যবসা প্রথম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, ব্যাংক বিদেশে বিস্তার ঘটিয়েছে এবং সামরিক বাহিনী বিদেশি অভিযান চালিয়েছে।

রাজনৈতিকভাবেও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রেও লাতিন আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এই দীর্ঘ ইতিহাস দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকার সম্পর্ক শুধু কূটনীতি বা অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি ক্ষমতা, পরিচয়, রাজনীতি এবং আদর্শের জটিল সমন্বয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েলের হামলা বন্ধের আহ্বান তুরস্কের

লাতিন আমেরিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েনের ইতিহাস

০৬:০৪:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল, দ্বন্দ্বপূর্ণ এবং নানা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক করার ঘটনা আবারও এই সম্পর্ককে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন কিউবা বা কলম্বিয়াকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে—এমন ইঙ্গিত পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। ইতিহাসবিদ গ্রেগ গ্র্যান্ডিন এই সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং এর প্রভাব নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি

যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সময় লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ অঞ্চল ছিল স্পেনের উপনিবেশ। ফলে শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলকে স্বাধীন দেশগুলোর সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি দুর্বল হয়ে পড়া সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে দেখত।

তৎকালীন মার্কিন নেতা টমাস জেফারসনের মতো ব্যক্তিরা মনে করতেন স্পেনের সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে এবং সেই ভাঙনের সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র তার কিছু অঞ্চল নিজেদের দখলে নিতে পারবে। বাস্তবেও অনেক ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছিল।

১৮২৩ সালে মনরো নীতি ঘোষণার সময় স্পষ্ট হয়ে যায় যে স্প্যানিশ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল স্বাধীনতার যুদ্ধে সফল হচ্ছে। মেক্সিকো তখন স্বাধীন, কলম্বিয়া স্বাধীনতার কাছাকাছি, আর পুরো স্প্যানিশ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছিল। সেই সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নতুন স্বাধীন দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করে।

এই সময়টিকে অনেক ইতিহাসবিদ যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রবেশের সূচনা হিসেবেও দেখেন।

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতি শুধু সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক কৌশল—সবই ব্যবহৃত হয়েছে।

১৮২০-এর দশকে মেক্সিকোতে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত একটি অভ্যুত্থান ঘটে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মার্কিন কূটনীতিক জোয়েল পয়নসেট। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে ব্রিটেন স্কটিশ রাইট ফ্রিম্যাসন সংগঠনের মাধ্যমে মেক্সিকোতে প্রভাব বাড়াচ্ছে। এর জবাবে তিনি মার্কিন স্বার্থের পক্ষে ইয়র্ক রাইট সংগঠনের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এই নেটওয়ার্ক শেষ পর্যন্ত এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেশি অনুকূল ছিল।

এর পাশাপাশি মার্কিন নৌবাহিনীও প্রভাব বিস্তারে ব্যবহৃত হয়। ব্রাজিলের উপকূল থেকে শুরু করে পারানা ও অ্যামাজন নদী পর্যন্ত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ উপস্থিত থাকত। এসব চাপের ফলে প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়।

১৮৫৪ সালে নিকারাগুয়ার গ্রেটাউন বন্দরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ গোলাবর্ষণ করে বন্দরটি ধ্বংস করে দেয়—যা সেই সময়ের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের উদাহরণ।

করপোরেট শক্তির উত্থান

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল করপোরেট স্বার্থ। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রাশের পর মধ্য আমেরিকার পরিবহন পথগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই সময় রেলপথ ও নৌপরিবহন ব্যবসায়ী কর্নেলিয়াস ভ্যান্ডারবিল্ট এই অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রভাব ঠেকাতে সক্রিয় হন। একই সময়ে টেনেসির ভাড়াটে সেনা উইলিয়াম ওয়াকার নিকারাগুয়া দখল করে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন।

ওয়াকার সেখানে আবার দাসপ্রথা চালু করার চেষ্টা করেন, যদিও তিন দশক আগেই তা বিলুপ্ত হয়েছিল। এই ঘটনা দেখায় যে সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর দাসপ্রথা সমর্থনকারী রাজনীতি বিদেশনীতি প্রভাবিত করছিল।

গৃহযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আসে। তখন করপোরেট বিনিয়োগ লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

মেক্সিকো বিশেষভাবে মার্কিন বিনিয়োগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া ও নিউইয়র্কের পুঁজি সেখানে ঢুকে পড়ে। মার্কিন ব্যবসায়ীরা মেক্সিকোর বন্দর, রেলপথ, ট্রামব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং টেলিগ্রাফ নেটওয়ার্কের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে ১৯১০ সালের মেক্সিকান বিপ্লবকে অনেক ইতিহাসবিদ মার্কিন করপোরেট প্রভাবের বিরুদ্ধে এক ধরনের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

‘লাতিন আমেরিকা’ ধারণার জন্ম

উইলিয়াম ওয়াকারের মতো হস্তক্ষেপের সময়ই এই অঞ্চলের চিন্তাবিদরা নিজেদের পরিচয় নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করেন। তারা নিজেদের “লাতিন আমেরিকান” হিসেবে চিহ্নিত করেন, যাতে “অ্যাংলো-স্যাক্সন আমেরিকা” থেকে পার্থক্য বোঝানো যায়।

এই ধারণায় লাতিন আমেরিকাকে মানবতাবাদী ও আদর্শবাদী অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়, আর যুক্তরাষ্ট্রকে দেখানো হয় ব্যবহারিক, পুঁজিবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে।

অর্থাৎ “লাতিন আমেরিকা” পরিচয়টি অনেকটাই গড়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায়।

Monroe Doctrine Still Dominates U.S., Latin America Relations After 200  Years

মার্কিন সমর্থনের মূল নীতি

লাতিন আমেরিকার কোনো সরকারকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে।

প্রথমত, সেই সরকার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে কতটা সহযোগিতা করছে।
দ্বিতীয়ত, সেই সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে মার্কিন সম্পদ ও ব্যবসা সুরক্ষিত রাখতে পারছে কি না।

পরে গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা স্বাধীনতার মতো ধারণাগুলো যুক্ত হলেও অনেক সময় সেগুলো মূলত রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে।

১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। কিউবার স্বাধীনতার আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে এক ধরনের পরোক্ষ মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

এই সময় থেকেই মানবাধিকার রক্ষার ভাষা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় শক্তি প্রদর্শনের যুক্তি তুলে ধরতে শুরু করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নীতির পরিবর্তন

১৯৩৩ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ক্ষমতায় এসে লাতিন আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনেন।

তিনি হস্তক্ষেপের পুরনো নীতি থেকে সরে এসে দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন। সেই সময় লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী নীতি গ্রহণ করা হয়, এবং যুক্তরাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে তা সমর্থনও করে।

মেক্সিকো ও বলিভিয়া বিদেশি সম্পদ জাতীয়করণ করলে যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেয়। এমনকি মেক্সিকো ও ব্রাজিলে ইস্পাত কারখানা গড়ে তুলতেও যুক্তরাষ্ট্র অর্থায়ন করে।

এই সহযোগিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশকে মিত্রশক্তির পক্ষে নিয়ে আসে।

শীতল যুদ্ধের সময় নতুন সংঘাত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ১৯৪৭ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় কমিউনিজম প্রতিরোধ।

যেসব অস্ত্র আগে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোই পরে বামপন্থী আন্দোলন দমনে ব্যবহৃত হয়।

চিলিতে ১৯৪৮ সালে শ্রমিক আন্দোলন দমন করতে এই অস্ত্র ব্যবহৃত হয়, যেখানে তরুণ সেনা কর্মকর্তা অগাস্টো পিনোচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এর ফলে পুরো অঞ্চলে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়তে থাকে এবং ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বহু বিদ্রোহ, সামরিক শাসন ও মার্কিন হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

লাতিন আমেরিকার দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় দ্বিধাবিভক্ত ছিল। একদিকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নতি ও শক্তিকে অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে দেখেছেন।

উদাহরণ হিসেবে সিমন বলিভার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে প্রশংসা করলেও তিনি মনে করতেন লাতিন আমেরিকার সামাজিক কাঠামো আলাদা হওয়ায় একই পথ অনুসরণ করা কঠিন।

পরবর্তীতে চিন্তাবিদ ফ্রান্সিসকো বিলবাও যুক্তরাষ্ট্রকে স্পার্টার সঙ্গে তুলনা করেন—শক্তিশালী কিন্তু সামরিক ও স্বার্থকেন্দ্রিক। আর লাতিন আমেরিকাকে তিনি এথেন্সের মতো মানবতাবাদী ও আদর্শবাদী হিসেবে দেখান।

এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পরে নির্ভরতা তত্ত্বের জন্ম হয়, যেখানে বলা হয় উন্নত বিশ্বের সমৃদ্ধি অনেকাংশে উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনৈতিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ফিদেল কাস্ত্রোর উদাহরণ

এই দ্বৈত সম্পর্কের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ফিদেল কাস্ত্রো। তরুণ বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখতেন। এমনকি তিনি একবার রুজভেল্টকে চিঠি লিখে কিউবার লৌহ আকরিক দিয়ে যুদ্ধজাহাজ তৈরির প্রস্তাব দেন।

কিন্তু ১৯৬১ সালে বে অফ পিগস আক্রমণ এবং কিউবা সরকারকে উৎখাতের মার্কিন প্রচেষ্টার পর তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র তখন তার কাছে অনুপ্রেরণা নয়, বরং প্রতিরোধ করার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।

মাদকবিরোধী যুদ্ধের প্রভাব

১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন “মাদকবিরোধী যুদ্ধ” ঘোষণা করেন। এর অংশ হিসেবে ১৯৭৩ সালে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ডিইএ গঠন করা হয়।

এর প্রথম বড় অভিযান চালানো হয় মেক্সিকোতে, যেখানে আফিম চাষ দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। সেনাবাহিনী ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ডিইএ কঠোর অভিযান চালায় এবং অনেক গ্রাম ধ্বংস করা হয়।

পরবর্তীতে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন সমর্থিত সরকারগুলো নিজেরাই মাদক উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিল।

চিলির সামরিক শাসক অগাস্টো পিনোচে প্রকাশ্যে মাদকবিরোধী অবস্থান নিলেও তার শাসনামলে কোকেন পাচার থেকে বিপুল লাভ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বলিভিয়া ও কলম্বিয়াতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়—যেখানে মাদকবিরোধী অভিযান ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন একসঙ্গে চলেছে।

সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ধারা

ইতিহাসবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাতিন আমেরিকার দুটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

প্রথমত, এই অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রকে তার ক্ষমতার সীমা বুঝতে সাহায্য করেছে। সার্বভৌমত্বের দাবি এবং হস্তক্ষেপের বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক সময় তার নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।

দ্বিতীয়ত, লাতিন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের পরীক্ষাগার হিসেবেও কাজ করেছে। এখানেই মার্কিন ব্যবসা প্রথম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, ব্যাংক বিদেশে বিস্তার ঘটিয়েছে এবং সামরিক বাহিনী বিদেশি অভিযান চালিয়েছে।

রাজনৈতিকভাবেও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রেও লাতিন আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এই দীর্ঘ ইতিহাস দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকার সম্পর্ক শুধু কূটনীতি বা অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি ক্ষমতা, পরিচয়, রাজনীতি এবং আদর্শের জটিল সমন্বয়।