ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই ছিল ছোট শিশু। যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংঘটিত এই হামলা এখন আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতেই মর্মান্তিক হামলা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইরানে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান শুরু হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই মিনাবের শাজারাহ তাইয়েবা নামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ১০টা ৪৫ মিনিটে বিস্ফোরণটি ঘটে। সেই সময় অভিভাবকেরা দ্রুত স্কুলে পৌঁছে সন্তানদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
বিস্ফোরণের পরপরই ভবনটি ধসে পড়ে এবং ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একাধিক বড় বিস্ফোরণ শোনা যায়। পরে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে বহু শিশু ও শিক্ষক প্রাণ হারান।
ভুল গোয়েন্দা তথ্যের সন্দেহ
হামলার কারণ নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে, হামলার লক্ষ্য তালিকায় ওই স্থাপনাটি ছিল এবং সেটিকে একটি কারখানা বা অস্ত্রাগার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, একই এলাকায় একটি অস্ত্রভাণ্ডারের সম্ভাব্য অবস্থান ছিল। ফলে গোয়েন্দা তথ্যের ভুলের কারণে বিদ্যালয়টি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে থাকতে পারে।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, পুরোনো বা ভুল তথ্য ব্যবহার করার কারণে এই মারাত্মক ভুল ঘটেছে। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত লক্ষ্য নির্ধারণের সময় এমন ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পুরোনো নৌঘাঁটির সঙ্গে সংযোগ
উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদ্যালয়টি একসময় একটি নৌঘাঁটির অংশ ছিল। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে সেটি আলাদা করে ঘিরে দেওয়া হয় এবং নতুন প্রবেশপথ তৈরি করা হয়। এরপর সেখানে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ ও অন্যান্য শিক্ষাসংক্রান্ত অবকাঠামো গড়ে ওঠে।
পরবর্তীতে ওই এলাকায় একটি চিকিৎসা কেন্দ্রও গড়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক ঘাঁটির কাছে অবস্থান করলেও বিদ্যালয় বা চিকিৎসা কেন্দ্রকে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করা যায় না।
প্রত্যক্ষদর্শীর হৃদয়বিদারক বর্ণনা
একজন অভিভাবক জানান, তিনি সন্তানদের নিতে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই ভয়ংকর শব্দ শুনতে পান। মুহূর্তের মধ্যেই একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভবনে আঘাত করে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় তিনি ছিটকে পড়ে যান।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তিনি কয়েকজন আহত শিশুকে উপরের তলায় আটকে থাকতে দেখেন। উদ্ধারকর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজ চালালেও ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত কাউকে পাওয়া যায়নি। অনেক অভিভাবক নিজেদের সন্তানকে খুঁজে পেয়েছেন কেবল পোশাক বা জুতার মাধ্যমে শনাক্ত করে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রশ্ন
এই যুদ্ধ অভিযানে বিপুল সংখ্যক লক্ষ্যবস্তু দ্রুত শনাক্ত করতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামরিক পরিকল্পনায় বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, চূড়ান্ত হামলার সিদ্ধান্ত সবসময় মানুষের মাধ্যমেই অনুমোদিত হয়। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি তথ্যভাণ্ডার পুরোনো বা ভুল হয়, তাহলে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরও মারাত্মক ভুল ঘটতে পারে।
আন্তর্জাতিক ক্ষোভ ও তদন্ত দাবি
বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দা দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ঘটনাটিকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে যুদ্ধের দ্রুতগতির সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর লক্ষ্য নির্ধারণের মধ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















