২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি উপসাগরের শান্ত আকাশ ভেদ করে এক কাপুরুষোচিত ও অযৌক্তিক “প্রতিশোধমূলক” হামলা শুরু হয়। এর উৎস ছিল ইরান। শুরুতে অনেকেই সতর্ক আশাবাদ নিয়ে মনে করেছিলেন, হামলাটি হয়তো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকেই লক্ষ্য করে করা হয়েছে। বিশ্লেষকেরা ইঙ্গিত করেছিলেন গত বছর কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ইরানের “প্রতিশোধমূলক” হামলার দিকে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে চালানো হয়েছিল। অনেকে তখন পরিস্থিতিকে সামরিক বার্তা দেওয়ার পরিচিত কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ব্যাখ্যা ভেঙে পড়ে। কারণ উপসাগর জুড়ে ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু হয়। তখন পরিষ্কার হয়ে যায়, ইরান কেবল ওয়াশিংটনকে বার্তা দিচ্ছে না; বরং নজিরবিহীন মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হেনে প্রতিবেশী দেশগুলিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাই ১,৭০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শনাক্ত করেছে।
এই হামলা যতই বিস্ময়কর হোক না কেন, বাস্তবতা হলো—অঞ্চলটির রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক দিন ধরেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। বিস্ফোরণের মুহূর্তটি কখন ঘটবে, সেটাই ছিল কেবল প্রশ্ন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সম্প্রতি বলেন, কয়েক মাস ধরেই আমিরাত বুঝতে পারছিল যে অঞ্চলটি সংকটের দিকে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, “যখন আমরা দেখলাম আলোচনাগুলো ভেঙে পড়েছে, তখনই বুঝেছিলাম যুদ্ধের ঢাক বেজে উঠেছে।” তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারমাণবিক আলোচনার ভেঙে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

পরিস্থিতির গতিপথ তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে অঞ্চলটিকে সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছিল ইসরায়েল এবং চালিকা শক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছে দেয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে কূটনীতি যেন স্কুলের মাঠের মারামারিতে পরিণত হয়েছে—যেখানে কোনো নিয়ম নেই, আর জয়ী সেই যে আগে আঘাত করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়ই “ফ্ল্যাশপয়েন্ট” বা বিস্ফোরণ বিন্দুর কথা বলা হয়। কিন্তু সেই অবস্থায় পৌঁছানোর আগে দীর্ঘ ও জটিল এক প্রক্রিয়া থাকে—আলোচনা, সমঝোতা এবং নাজুক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রক্রিয়াগুলো বারবার উপেক্ষিত হয়েছে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে, এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যে ঘোষিত প্রধান অগ্রাধিকার—ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও।
ইতিহাস প্রায়ই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার পথনির্দেশ করে। ইসরায়েলের গাজায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিশোধমূলক হামলা—যা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে চালানো হয়েছিল এবং যার ফলে দুই বছর ধরে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে—এক বিপজ্জনক নজির তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ ছাড়া এই হামলা চলতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন মানদণ্ড তৈরি হয়েছে: জবাবদিহি ছাড়া ক্ষমতার প্রয়োগ।
এর পর থেকে সিদ্ধান্তগুলো আন্তর্জাতিক আইন কিংবা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকে।
এই প্রশাসনের কৌশলে কূটনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনোই মূল ভিত্তি ছিল না। শুরু থেকেই এর অবস্থান ছিল দখলমুখী, যেখানে শক্তিকে প্রভাব বিস্তারের প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন সরকার এই কঠোর শাসনশৈলীকে এড়িয়ে চলতে কূটনৈতিক কৌশল বদলানোর চেষ্টা করেছে, যাতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কিন্তু ওয়াশিংটনে এই সংযমকে বিচক্ষণতা হিসেবে নয়, বরং দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রাধান্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে এবং পূর্ববর্তী নজিরগুলো প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়ে পুরো অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করে তোলে। অথচ এই হামলার ফলে উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে তেমন কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
এ যেন ভূরাজনীতির ভাষায় মৌচাকে লাথি মারা।
এখন উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদেরকে দুই ধরনের শক্তিশালী মতাদর্শ ও অস্তিত্বসংকটময় এজেন্ডার মাঝখানে আটকে থাকতে দেখছে। এমন এক যুদ্ধে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যেটি এড়াতে তারা বহু বছর ধরে চেষ্টা করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলা ভিত্তিহীন ও বেপরোয়া, যা সশস্ত্র সংঘাতের মৌলিক আন্তর্জাতিক আইনগুলোর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করেছে সতর্কতার সঙ্গে। তারা জানে যে তারা এমন এক প্রতিবেশীর সঙ্গে বাস করে, যার শাসনব্যবস্থা প্রায়ই আদর্শগত কঠোরতা ও অনিশ্চিত কূটনীতির জন্য পরিচিত। তবুও সেই অস্থিরতাকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে না দিয়ে এসব দেশ—বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত—বাস্তববাদী নীতির মাধ্যমে স্থিতিশীলতার পথ বেছে নিয়েছে।

আমিরাতের নেতৃত্বের দূরদর্শিতা স্পষ্ট হয়েছে আঞ্চলিক সম্পর্ক পরিচালনায় তাদের সতর্ক পদক্ষেপে। ভূরাজনীতির সূক্ষ্ম বাস্তবতাকে সম্মান করে দেশটি শুধু অস্থির এক প্রতিবেশীর সঙ্গে সহাবস্থানই বজায় রাখেনি, বরং বিশ্বের অন্যতম গতিশীল ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তুলেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতি সবসময় শান্তি, সহনশীলতা ও সহযোগিতার নীতিতে ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে—এবং আজও সেই নীতিই বহাল রয়েছে।
অবিরাম বোমাবর্ষণের প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও দেশটি সতর্ক ও দৃঢ় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যরা যে বেপরোয়া যুদ্ধ বিস্তারের দিকে ঝুঁকছে, তাতে জড়িয়ে পড়া থেকে তারা বিরত থেকেছে। এই সংযম দুর্বলতা নয়; বরং দৃঢ়তার প্রকাশ।
প্রতিশোধ নেওয়া হয়তো সহজ পথ, এবং আবেগের দিক থেকে তা সন্তোষজনকও মনে হতে পারে। কিন্তু আমিরাতের বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি—যা স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি এবং অঞ্চলের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যতের ওপর ভিত্তি করে—তার জন্য প্রয়োজন আরও কঠিন একটি গুণ: শৃঙ্খলা।
আর সেই শৃঙ্খলার মধ্যেই নিহিত রয়েছে তার প্রকৃত শক্তি।
আয়শা তারিয়াম, প্রধান সম্পাদক, গালফ টুডে 



















