নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, দুর্বল রাজস্ব আদায় এবং বাড়তি ভর্তুকির চাপ—এই তিনের সমন্বয়ে সরকার আবার ব্যাংকব্যবস্থার দিকে বেশি ঝুঁকছে। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ট্রেজারি বন্ড ও বিলের সুদে। দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ফলন মঙ্গলবারের নিলামে ১০ দশমিক ২৩ শতাংশে উঠেছে, যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের ফলনও ফেব্রুয়ারির ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে মার্চে ১০ দশমিক ৬১ শতাংশে উঠেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি অর্থ টানতে চাইছে, আর বেসরকারি খাতে ঋণচাহিদা দুর্বল থাকায় ব্যাংকও তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ রাখতে আগ্রহী।
গত বছরের সেপ্টেম্বর সময়ে সব মেয়াদের সরকারি সিকিউরিটিজের ফলন ১০ শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছিল। তখন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন ধীর ছিল, ফলে সরকারের তহবিলের চাপও তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণসহ কয়েকটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। এর ফলে ব্যয়ের চাপ বেড়েছে এবং ঋণনির্ভরতা দ্রুত ফিরে এসেছে।

স্বল্পমেয়াদি ঋণেই বাড়তি ভরসা
সরকার গত সপ্তাহে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৫০০০ কোটি টাকা তুলেছে। এর পর ৮ এপ্রিল আরও ৫০০০ কোটি টাকা তোলার জন্য বিশেষ নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে এমন অতিরিক্ত নিলাম ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার নিয়মিত ধারপথের বাইরেও ব্যাংক খাত থেকে অর্থ তুলছে। এতে চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারি ঋণ বাজেট লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
রাজস্ব ঘাটতি এখন সবচেয়ে বড় চাপ
এই ঋণচাপের কেন্দ্রে রয়েছে দুর্বল রাজস্ব আদায়। প্রাথমিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৮ শতাংশ পিছিয়ে আছে। ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৭১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার একদিকে ব্যয় কমাতে পারছে না, অন্যদিকে আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ট্রেজারি বিল ও বন্ডই হয়ে উঠছে বাজেট অর্থায়নের প্রধান ভরসা।
জ্বালানি আমদানি ও ভর্তুকি নতুন ঝুঁকি
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ধাক্কা। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় অপরিশোধিত তেলের দাম ১১০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। এর অর্থ, বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানিতে বেশি ব্যয় করতে হবে এবং ভর্তুকির চাপও বাড়বে। ফলে সরকারের নগদ চাহিদা আরও তীব্র হতে পারে।

ব্যাংকে তারল্য আছে, ঋণচাহিদা নেই
সরকারের জন্য একটি সুবিধাজনক দিক হলো, ব্যাংকখাতে এখনো তুলনামূলক তারল্য রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার ফলে ব্যাংকগুলোতে স্থানীয় মুদ্রা সরবরাহ বেড়েছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দুর্বল। ফলে অনেক ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি ঋণের বদলে সরকারি বন্ড-বিলে অর্থ রাখতে বেশি স্বস্তি বোধ করছে।
আমানত সুদ, নীতি সুদ আর সরকারি কাগজের সম্পর্ক
বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, শক্তিশালী ব্যাংকগুলো স্থায়ী আমানতে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দিচ্ছে। এর বিপরীতে সরকারি সিকিউরিটিজে দুই অঙ্কের ফলন ব্যাংকগুলোর কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার ১০ শতাংশের আশেপাশে থাকায় সামগ্রিক সুদের হারও উঁচু অবস্থানে রয়েছে।

শেয়ারবাজারে বন্ড লেনদেন কেন কমছে
ফলন বাড়লে পুরোনো বন্ডের দাম সাধারণত কমে। এই উল্টো সম্পর্কের কারণে অনেকে এখন হাতে থাকা ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করতে চাইছেন না। এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে প্রধান পুঁজিবাজারে ট্রেজারি বন্ড লেনদেন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৩ শতাংশ কমে ২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ সুদ বাড়লেও বন্ডবাজারে লেনদেন কমে গেছে।
সামনের দিনগুলোর বার্তা কী
পুরো পরিস্থিতি মিলিয়ে বার্তাটি পরিষ্কার। সরকারের ব্যয়চাপ কমছে না, রাজস্ব ঘাটতি দ্রুত পূরণ হচ্ছে না, জ্বালানি আমদানির চাপ আছে, আর বেসরকারি খাতে ঋণচাহিদাও দুর্বল। ফলে সরকারি ধার আরও বাড়তে পারে এবং ট্রেজারি বন্ড-বিলের সুদ নিকট ভবিষ্যতে উচ্চ অবস্থানেই থাকতে পারে। এতে সরকারের ঋণ ব্যয় বাড়বে, আবার ব্যাংকগুলোর তহবিলও আরও বেশি সরকারি কাগজে আটকে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য খুব স্বস্তিদায়ক সংকেত নয়। এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সরকার রাজস্ব আদায় কত দ্রুত বাড়াতে পারে এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার কতটা কঠোরভাবে পুনর্বিন্যাস করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















