ভিয়েতনাম ধীরে ধীরে এমন এক পথে এগোচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণে চীনের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা—সব মিলিয়ে দেশটি বেইজিংয়ের মডেলের দিকে ঝুঁকছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে নতুন ধারা
দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ একত্রে নিজের হাতে নিয়েছেন পার্টি প্রধান তো লাম। এতে করে নেতৃত্বের কাঠামো আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যা অনেকটা চীনের রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে মিল রাখে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিবর্তন ভিয়েতনামের দীর্ঘদিনের সমষ্টিগত নেতৃত্বের ঐতিহ্য থেকে একটি বড় বিচ্যুতি। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হলেও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তি খাতে বাড়ছে চীনা প্রভাব

ভিয়েতনামের প্রযুক্তি খাত এখন চীনা প্রভাবের অন্যতম বড় ক্ষেত্র। দেশটি ইতোমধ্যে তাদের ৫জি নেটওয়ার্কে চীনা সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়ে আগের আপত্তি কমিয়েছে। পাশাপাশি চীনা কোম্পানির সঙ্গে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল স্থাপন এবং ডেটা সেন্টার বিনিয়োগের আলোচনা চলছে।
এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোতেও ভিয়েতনাম ক্রমেই চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
নজরদারি ও ডেটা নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি
রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ডেটা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি। ভিয়েতনাম সরকার এখন এমন একটি কেন্দ্রীভূত ডেটা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে রাষ্ট্র নিজেই ডেটা নিয়ন্ত্রণ করবে।
এছাড়া দেশজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ক্যামেরা নেটওয়ার্ক চালুর মাধ্যমে নাগরিকদের পরিচয় শনাক্ত করার পরিকল্পনাও চলছে। এটি অনেকটা চীনের নজরদারি ব্যবস্থার অনুকরণে তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতি ও বিনিয়োগে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
অর্থনীতিতেও ভিয়েতনাম এখন চীনা ধাঁচের নীতির দিকে ঝুঁকছে। ভর্তুকি, বড় অবকাঠামো প্রকল্প এবং সরকারি বিনিয়োগের ওপর জোর বাড়ানো হচ্ছে। চীনের সঙ্গে যৌথভাবে দ্রুতগতির রেল প্রকল্পের মতো সংবেদনশীল উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে।

একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়ানোর পরিকল্পনাও দেখা যাচ্ছে। প্রস্তাবিত তহবিলের মাধ্যমে বাজারে পতনের সময় সরকার সরাসরি শেয়ার কিনে স্থিতিশীলতা আনার উদ্যোগ নিতে পারে।
দ্বিমুখী কৌশল বজায় রাখছে হ্যানয়
তবে ভিয়েতনাম পুরোপুরি চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েনি। দেশটি এখনও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনাম এক ধরনের দ্বিমুখী কৌশল অনুসরণ করছে—একদিকে চীনের মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়া, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখা।
সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লে ভিয়েতনামের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবুও বর্তমান প্রবণতা বলছে, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিনির্ভর শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ধীরে ধীরে চীনের পথেই এগোচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















