০৪:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
১৩ পাউন্ডের ব্রোকলি নিয়ে ক্ষোভ, ‘শো’ হয়ে যাচ্ছে খাবার—রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি নিয়ে পপি ও’টুলের তীব্র সমালোচনা সয়াবিন তেলের সংকটে বাজারে চাপ, আমদানি-ব্যাংকিং ও বৈশ্বিক দামের বড় পরীক্ষা কুড়িগ্রামে ট্রাক-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে শিশু সহ নিহত ৩, আহত অন্তত ১১ হবিগঞ্জ হাওরে জ্বালানি সংকট ও বৃষ্টির ধাক্কা: ধানের দাম অর্ধেকে নেমে কৃষকের দুশ্চিন্তা ইরান যুদ্ধ থামাবে না যুদ্ধবিরতি, বরং নতুন এক অন্তহীন সংঘাতের পথ খুলে দিল যুক্তরাষ্ট্র দুই দফা দরপত্রেও সাড়া কম, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় সার বাজারে গভীর সংকট গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন দায়িত্বে ঢাবির সাবেক ভিসি নিয়াজ আহমদ খান পশ্চিমবঙ্গের ভোটে চূড়ান্ত লড়াই, কারচুপির অভিযোগে উত্তপ্ত শেষ ধাপ নাহিদ ইসলাম দুর্নীতি না করলেও নৈতিক অপরাধ করেছেন: রাশেদ খাঁনের মন্তব্যে রাজনৈতিক উত্তাপ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালে আজ লড়াই, সিমিওনের দুর্গ ভাঙতে পারবে কি আর্সেনাল?

নিস্তেজ বৈশাখের অর্থনীতি

বাংলা নববর্ষ চালুর নেপথ্যের মুল কারণ ছিল অর্থনৈতিক। আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সনের প্রবর্তন করছিলেন রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে। নতুন ফসল ওঠার পর কৃষক যাতে তাদের চাপমুক্তভাবে জমিদার কিংবা রাজ দরবারে এসে তাদের জমির খাজনা পরিশোধ করতে পারে সেজন্য বৈশাখ থেকে গণনা করা হয় নতুন বাংলা সনের। সেই থেকে বিগত চারশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এর সঙ্গে নানা উপকরণ যুক্ত হয়ে বৈশাখ এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

খাজনা আদায়ের সেই প্রথা বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেলেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি। বাংলা সন প্রবর্তনের পরপরই ব্যবসা বাণিজ্যেও ক্ষেত্রে চালু হয়েছিল ‘হালখাতা’ ব্যবস্থা। বাংলা সন প্রবর্তনের পর বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ খাজনা আদায় সম্পর্কিত ‘পুণ্যাহ’ নামে একটি রীতি চালু করেন। এই রীতিতে খাজনা আদায়ের পাশাপাশি থাকতো উৎসবমুখর মেলার আয়োজন। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই ব্যবসায়িক হালখাতার প্রচলন শুরু হয়। কালের বিবর্তনে ‘পুণ্যাহ’ বিলুপ্ত হয়ে বাঙালির ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হালখাতা ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।

‘হালখাতা’ শব্দটির উৎপত্তি ফারসি ভাষা থেকে; ‘হাল’ অর্থ নতুন এবং ‘খাতা’ অর্থ হিসাবের বই। অর্থাৎ, বছরের প্রথম দিনে পুরোনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে নতুন খাতা খোলার মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন অর্থবছরের যাত্রা। এদিন ব্যবসায়ীরা তাদের পাইকারদের আমন্ত্রণ জানান। তারা এসে পুরোনো দেনা পরিশোধ কওে নতুন হিসাবের খাতা খোলেন। এ সময় মিষ্টিমুখের মাধ্যমে উভয়ে তাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেন।

কালের বিবর্তনে ব্যবসায়িক এই ঐতিহ্য ‘হালখাতা’ও বিলুপ্তির মুখে। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর প্রেক্ষিত্রে এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে লাল রঙের সেই হালখাতা। আবার সর্বত্র ইংরেজি বর্ষের প্রভাবে বাংলা সনের প্রথম দিনের সেই আর্থিক হিসাবের ব্যবস্থাও বিলুপ্তির পথে। তাই বলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কিন্তু বিলুপ্ত হচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে এর রূপে এসেছে নানা পরিবর্তন। কালের পরিক্রমায় বৈশাখ ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড আরও বিস্তৃত ও প্রসারিত হচ্ছে। এখন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডই বৈশাখের মুল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

দিন গণনা কিংবা সন তারিখের হিসাব নিকাশে সারা বছর বাংলা বর্ষের কোন গুরুত্ব না থাকলেও, বাংলা বছরকে বরণে বাঙালির আবেগ, উচ্ছ্বাস, উৎসব দিন দিন বড় হচ্ছে। আর নতুন বছরের প্রথম মাস বৈশাখককে কেন্দ্র অর্থনীতির কলেবরও দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে পহেলা বৈশাখ এখন আর বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, এটি এখন একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। প্রতি বছর এই দিনকে ঘিরে দেশের বাজারে তৈরি হয় বিপুল লেনদেন, বাড়ে ভোক্তা চাহিদা, চাঙা হয় উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা। পোশাক, খাদ্য, হস্তশিল্প, ফুল, মেলা, বিনোদন -সব মিলিয়ে বৈশাখ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক মৌসুমে পরিণত হয়েছে। তবে এই অর্থনৈতিক উচ্ছ্বাসের মধ্যেও রয়েছে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা, বৈষম্য এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জ।

ব্যবসায়ীদের হিসাবে, সামগ্রিকভাবে বৈশাখ ঘিরে দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ এখন ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকায় এসে দাড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদরাও একইরকম অনুমান করছেন। তারা বলছেন, এই একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। শুধু পোশাক খাতেই বিক্রি হয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য।

ফ্যাশন হাউসগুলোতে সারা বছরের মোট বিক্রির ২৫ থেকে ২৮ শতাংশই হয় এই একটি উৎসবকে ঘিরে। প্রতিবছর এই সংখ্যা আরও বাড়ছে। করোনার সময় যখন বৈশাখ উদ্‌যাপন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন শুধু পোশাক খাতেই ক্ষতি হয়েছিল ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। সেই সংখ্যাটাই বলে দেয় উৎসবটি অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যাশন হাউজের উদ্যোক্তাদের মতে, তাদের সারা বছরের মোট বিক্রির একটি বড় অংশ আসে উৎসবভিত্তিক বাজার থেকে। রোজার ঈদে যেখানে অর্ধেকের বেশি বিক্রি হয়, সেখানে পহেলা বৈশাখে হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। ফলে বৈশাখ এখন দেশের পোশাক শিল্পের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৌসুম। কেরানীগঞ্জ, ইসলামপুর ও নবাবপুরের পাইকারি বাজারগুলো বৈশাখী অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র। সারা দেশের অর্ধেক বৈশাখী পোশাক তৈরি হয় কেরানীগঞ্জে। বৈশাখের এক মাস আগে থেকেই এখানে পাইকারি বেচাকেনা শুরু হয়। প্রতিদিন একেকটি দোকানে দুই লাখ থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়া এখন সাধারণ ঘটনা।

ফ্যাশন এন্টারপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি আজহারুল হক আজাদও বলছেন,  ‘এবার ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি আগের কয়েক বছরের তুলনায় ভালো ছিল। কারণ গত কয়েক বছর বৈশাখ ঈদের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আলাদা করে প্রস্তুতির সুযোগ ছিল না। কিন্তু এবার ঈদের পর ১০ থেকে ১৫ দিনের একটি সময় পাওয়া গেছে, তাই সবাই বেশি করে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে এসব পোশাকের মধ্যে কারও হয়তো প্রায় সব থেকে গেছে, আবার কারও হয়তো ৫০ শতাংশ থেকে গেছে, গড়ে এবার বৈশাখ খুবই খারাপ ছিল।’ তার ধারণা, এর আগে কখনো বৈশাখ বোধহয় এত খারাপ যায়নি।

পোশাক ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা বলেন,‘ বৈশাখের বাজার বেশ বড়। অনেক সময় তা ঈদের চেয়েও বড়। কারণ সব ধর্মের মানুষ বৈশাখে কেনাকাটা করেন। আর আমরা এবার ঈদের পর ১৫ দিনের বেশি সময় পেয়েছিলাম। আর গতবার তো বৈশাখ হয়নি। ফলে এবার আমাদের প্রস্তুতি বেশ ভালো ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে আমরা বিরাট সংকটে পড়েছি।’

তার মতে, বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এই সময়ের জন্য বিশেষভাবে তৈরি পণ্য-যেমন টেপা পুতুল, শখের হাড়ি, কুলা, বিভিন্ন কারুশিল্প, এসব সারা বছর বিক্রি হয় না, শুধু বৈশাখেই চাহিদা থাকে। এসব পণ্যের সঙ্গে গ্রামের অসংখ্য মানুষ জড়িত। দেশের অর্থনীতির যে সংকট অবস্থা, তাতে তারা যদি এই সময়ে পণ্য বিক্রি করতে না পারেন, তাহলে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে এবং দেনা-পাওনা শোধ করাও কঠিন হয়ে যাবে।’

বৈশাখ ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য তৈরি হয় বড় সুযোগ। এবারের রাজধানীতে আয়োজন করা হয় এসএমই বৈশাখী মেলায়। এতে ১৫০টির বেশি উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছেন। এখানে হস্তশিল্প, পাটজাত পণ্য, ফ্যাশন সামগ্রী, খাদ্যপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি হয়েছে।

বৈশাখে ফুলের বাজারেও বড় উত্থান ঘটে। প্রতিদিন ৩০-৩৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হলেও এই মৌসুমে তা বেড়ে ৬০-৭০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একইভাবে মিষ্টি, পিঠা, কুটিরশিল্প, মাটির পণ্য প্রভৃতি খাতেও বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। তবে মৃৎশিল্পীরা বলছেন, প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে তাদের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। বৈশাখই তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে বড় বিক্রির সময়, যা দিয়ে তারা বছরের অন্য সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চান।

বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ, এই ধারণা এখন সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। বৈশাখ ঘনিয়ে এলেই ইলিশের দাম বেড়ে যায়। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এক কেজি ইলিশ ২৬০০ থেকে ৩০০০ টাকায় বিক্রি হয়, যা গত বছরের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ বেশি ছিল। অবশ্য এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে মজুতদারি ও অবৈধ বাণিজ্য বাড়ে, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। ফলে সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

হালখাতার একাল

পহেলা বৈশাখের অন্যতম প্রাচীন অনুষঙ্গ হালখাতা। ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খুলে পুরোনো দেনা-পাওনা পরিশোধ করেন এবং ক্রেতাদের আপ্যায়ন করেন। প্রথমদিকে এই প্রথা বাঙালি মুসলমান ব্যবসায়ীদের মধ্যেই বেশি প্রচলিত ছিল। তারা নতুন খাতার প্রথম পাতায় ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ ও ‘এলাহি ভরসা’ লিখে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে বছরের শুভ সূচনা করতেন। অন্যদিকে, সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখের সকালে সিদ্ধিদাতা গণেশ ও লক্ষ্মী দেবীর পূজা করে নতুন হিসাব শুরু করেন। ধর্মীয় ভিন্নতা থাকলেও উদ্দেশ্য এক নতুন বছরে ব্যবসার সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা।

বর্তমানে দেশে ৭০ লাখের বেশি দোকান ও খুচরা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি দোকানে গড়ে ১০ হাজার টাকা ব্যয় ধরলে হালখাতা ঘিরেই ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে সময়ের পরিবর্তনে এই ঐতিহ্যে এসেছে পরিবর্তন। অনেক ক্ষেত্রে দোকানভিত্তিক আয়োজনের পরিবর্তে কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান হচ্ছে। আবার বাকির খাতার পরিবর্তে নগদ লেনদেন বাড়ায় ব্যবসায়ী-ক্রেতার সম্পর্কের ঐতিহ্যগত উষ্ণতাও কিছুটা কমেছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হালখাতার চিরচেনা রূপেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় যেখানে মোটা খাতায় হাতে লেখা হিসাবই ছিল প্রধান মাধ্যম, সেখানে এখন অনেক ব্যবসায়ী কম্পিউটার ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটালভাবে হিসাব সংরক্ষণ করছেন। নিমন্ত্রণপত্রের জায়গায় এসেছে এসএমএস, ফোনকল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একইসঙ্গে বিকাশ, নগদ কিংবা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন হালখাতাকে আরও সহজ ও সময়োপযোগী করে তুলেছে। কিন্তু হালখাতা তৈরির সঙ্গে জড়িত উৎপাদকরা এখন পথে বসেছে। উপযোগীতা হারিয়েছে তাদের সেই বংশ পরাস্পরায় ঐহিত্যবাহী লাল রঙের হালখাতা তৈরির কুটির শিল্পের।

যুদ্ধ ও জ্বালানি প্রভাব

এবারের বৈশাখী বাজারে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জ্বালানি সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির আশঙ্কা করেছেন।

বাংলা নববর্ষকে ঘিরে প্রতিবছর জমে ওঠা কেনাকাটার উৎসব এবার অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, বৈশাখে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত কেনাকাটার যে প্রবণতা দেখা যায়, চলতি বছরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, সাধারণত বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাজারে অন্তত ১০ শতাংশ লেনদেন বৃদ্ধি পায়। তবে এবার সেই প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি, বরং আগের তুলনায় লেনদেন কমেছে। সব মিলিয়ে, এবারের বৈশাখ ঘিরে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক গতি তৈরি হয়নি। এবারে বৈশাখের অর্থনীতি বড় হওয়ার পরিবর্তে বরং ছোট হয়েছে। নিস্তেজ ছিল বৈশাখের অর্থনীতি।

গ্রমীণ অর্থনীতির বাস্তবতা

বাংলা সনের প্রচলনের উদ্দেশ্যও ছিল কৃষকের ফসলের মৌসুম বুঝে খাজনা আদায় করা। সেই উৎসবের শিকড় ছিল মাটিতে, গ্রামে, কৃষিতে। কালের পরিক্রমায় সেই গ্রামীণ উৎসব এখন অনেকটাই শহরের উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। রমনার বটমূলে শোভাযাত্রা, অভিজাত রেস্তোরাঁয় পান্তা-ইলিশের পাত, শপিং মলে বৈশাখী পোশাকের বাহার, এগুলো হচ্ছে শহরের বৈশাখ।

কিন্তু গ্রামের বৈশাখ আলাদা। সেখানে বটতলার মেলায় একটু চিড়া-মুড়ি, ছেলেমেয়েদের হাতে বাঁশের বাঁশি আর মাটির পুতুল, নাগরদোলার আনন্দ, যাত্রাপালার উত্তেজনা। পার্বত্য চট্টগ্রামে তরুণ-তরুণীদের নাচ আর জলকেলি। রাজশাহীর শিবতলী কিংবা দিনাজপুরের ফুলতলীর মেলায় হাজারো মানুষের ভিড়। গ্রামের বধূ তাঁর জামাতাকে নিমন্ত্রণ জানান, পিঠা-পুলির আয়োজন করেন। দুটো বৈশাখ পাশাপাশি চলে, কিন্তু দুটোর মধ্যে আর্থিক ফারাকটা বিশাল।

নতুন জামা-কাড়র পড়ে বৈশাখি উৎসবে যোগদান এখন বর্ষবরণে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। আর এই নতুন জামা-কাপড় কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি সঞ্চারিত হচ্ছে। তবে এই উৎসব এখন আর শহরে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রামাঞ্চলেও এই শহুরে উৎসকের ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামবাংলার আনাচকানাচেও বৈশাখের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। মেলা, পিঠা-পুলি, বাঁশ-বেতের পণ্য, মাটির তৈরি সামগ্রী, সব মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হচ্ছে নতুন গতি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই গ্রামীণ অংশটিই বৈশাখী অর্থনীতির প্রাণ।

বৈশাখী অর্থনীতির বড় অংশ গ্রামীণ হলেও সেখানে রয়েছে চ্যালেঞ্জ। অনেক গ্রামে এখন আগের মতো মেলা বসে না, লোকজ সংস্কৃতি কমে গেছে, কৃষকের আয় কমে যাওয়ায় উৎসবের আনন্দও সীমিত হয়ে পড়েছে। মৃৎশিল্পী, তাঁতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বলছেন, তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য তারা পান না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে পণ্যের দাম শহরে কয়েকগুণ বাড়লেও উৎপাদকরা বঞ্চিত থাকেন।

অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, গ্রামীণ মেলা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য যত বেশি বিক্রি হবে, ততই গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে। ফলে বৈশাখ শুধু নগর অর্থনীতির নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি বড় চালিকাশক্তি।

বৈশাখি উৎসবের চিত্র এখন শহর ও গ্রামের মধ্যে ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একসময় সবুজে ঘেরা গ্রামগুলোই ছিল বর্ষবরণের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু এখন সেই চিরচেনা গ্রামীণ বৈশাখ যেন অনেকটাই ম্লান।

গ্রামে আর দেখা যায় না কাঠের বাক্সে তুলে রাখা কাপড় রোদে দিয়ে নতুন বছরের প্রস্তুতির দৃশ্য। খড় বিছানো জোছনা রাতে কৃষক-কিষানিদের মিলনমেলা, গল্প-আড্ডা কিংবা জারি, সারি, বাউল বা ভাটিয়ালির সুর—সবই এখন স্মৃতির অংশ। কৃষিনির্ভর জীবনের পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়ের অনিশ্চয়তা গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের আনন্দ তাদের কাছে এখন অনেকটাই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের গ্রামগুলোতেও একই চিত্র। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাড়াগুলোতে বর্ষবরণের ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান, কুটুমবাড়িতে উপহার পাঠানো কিংবা চরক পূজার মতো আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব রীতিনীতি হারিয়ে যাচ্ছে।

একসময় বৈশাখকে ঘিরে গ্রামে জমজমাট মেলা বসতো। হাটখোলা, বটতলা কিংবা পালপাড়াগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। এখন সেই মেলার সংখ্যা কমে গেছে। ফলে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও খেলনার চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কুমারশিল্পীরা। তারা বলছেন, পরিশ্রম অনুযায়ী মূল্য না পাওয়ায় এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পহেলা বৈশাখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ‘হালখাতা’ও হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামাঞ্চল থেকে। আগে দোকানপাটে রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হালখাতার আয়োজন থাকলেও এখন তা অনেকটাই কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, বাকির খাতায় আস্থা কমে যাওয়ায় এখন বেশিরভাগ লেনদেন সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়। এমনকি কোথাও কোথাও হালখাতার আয়োজন দোকানের পরিবর্তে কমিউনিটি সেন্টারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যেখানে মিষ্টির বদলে পোলাও-মাংস বা বিরিয়ানির আয়োজন করা হয়।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পড়েছে এর প্রভাব। আগে বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিল্পীরা অংশ নিতেন, যা তাদের আয়ের একটি উৎস ছিল। কিন্তু এখন সেই আয়োজন কমে যাওয়ায় শিল্পীদের জীবন-জীবিকাও সংকটে পড়েছে। অনেক শিল্পীই বলছেন, জীবিকার তাগিদে অন্য কাজে সময় দিতে গিয়ে তারা সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

সময়ের পরিক্রমায় গ্রামীণ ঐতিহ্যভিত্তিক বৈশাখ ধীরে ধীরে আধুনিক নগরকেন্দ্রিক উৎসবে রূপ নিচ্ছে। ফলে বাঙালির শেকড়ের এই আয়োজন তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।

সামনে করণীয়

বাংলা নববর্ষের সূচনা হয়েছিল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রয়োজনে। সেই গ্রামীণ শিকড়ের উৎসব এখন অনেকটাই শহরমুখী। রমনার বটমূলে শোভাযাত্রা, শপিং মলে কেনাকাটা, রেস্তোরাঁয় পান্তা-ইলিশ—এসব এখন আধুনিক বৈশাখের চিত্র। অপরদিকে, গ্রামের বৈশাখ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। মেলা কমছে, লোকজ বিনোদন হারিয়ে যাচ্ছে, আর আধুনিকতার প্রভাবে ঐতিহ্যগত অনেক আয়োজন বিলুপ্তির পথে।

তাই বৈশাখী অর্থনীতিকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। সেগুলো হলো, গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি। ই-কমার্সের মাধ্যমে পণ্য বিপণনের সুযোগ বৃদ্ধি। হস্তশিল্প ও কারুশিল্পে প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ। বাজারে মজুতদারি ও কারসাজি নিয়ন্ত্রণ। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা।

বৈশাখের বিশাল অর্থনীতিকে আরও কার্যকর করতে বৈশাখী মেলাকে শুধু উৎসবের আয়োজন হিসেবে না দেখে একটি নিয়মিত বিপণন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। দেশের প্রতিটি জেলায় যদি কারুশিল্পী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ করে দেওয়া যায়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর হাত কেটে সরাসরি লাভ পাবেন উৎপাদক। বিসিকের বৈশাখী মেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারুশিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে, কিন্তু সেটা সীমিত এবং ঢাকাকেন্দ্রিক। এই সুযোগ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ই-কমার্সকে কাজে লাগানো দরকার। চীনের আলিবাবা কীভাবে গ্রামীণ উৎপাদকদের সরাসরি শহরের ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করেছে, সেই মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। বাংলাদেশে ই-কমার্সের বাজার দ্রুত বাড়ছে। সরকার যদি কারুশিল্পী ও তাঁতিদের জন্য ডিজিটাল বিপণনের প্রশিক্ষণ এবং প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে সহায়তা করে, তাহলে বৈশাখের মৌসুমে গ্রামীণ পণ্যের বিক্রি কয়েক গুণ বাড়তে পারে। উৎসব-পার্বণে ডিজিটাল লেনদেন যে হারে বাড়ছে, সেটা আশার কথা। তাই এই ডিজিটাল যুক্ততাকে কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ বিক্রেতাকে বাজারে আনা সম্ভব।

তৃতীয়ত, হস্তশিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশ থেকে এখন বছরে প্রায় ৮০ লাখ ডলারের হস্তশিল্প বিদেশে রপ্তানি হয়। এই সংখ্যাটা আসলে অনেক বেশি হওয়ার কথা ছিল। সঠিক নীতিসহায়তা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারণার ব্যবস্থা করা গেলে এই খাত থেকে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

চতুর্থত, বৈশাখকে শুধু শহরের উৎসব না রেখে কৃষকের দরজায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে উৎসবের দিনটিকে অর্থবহ করে তোলা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ যদি প্রতিবছর নতুন রূপে আসে, তাহলে গ্রামীণ মানুষের কাছে বৈশাখ শুধু আনন্দের দিন নয়, সুযোগেরও দিন হয়ে উঠবে।

বৈশাখী অর্থনীতির আকার বাড়লেই যে দেশের সব মানুষের জীবন ভালো হয়ে যায়, এমন নয়। বাজারে বাড়তি টাকার সরবরাহ হলে চাহিদা বাড়ে, সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। উৎসব মৌসুমে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, যার সবচেয়ে বড় শিকার হন সেই মানুষগুলো, যাঁদের কোনো বোনাস নেই, উৎসব ভাতা নেই। তাঁদের কথাও ভাবতে হবে।

একসময় পয়লা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা পুরোনো বছরের বাকি আদায় করতেন, নতুন খাতা খুলতেন, খদ্দেরদের মিষ্টি খাওয়াতেন। এই আচারের ভেতরে একটি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ছিল, একটি সম্পর্কের উষ্ণতা ছিল। ব্যবসায়ী আর ক্রেতার মধ্যে শুধু লেনদেন নয়, একটা আস্থার সেতু ছিল। নগদ কেনাবেচার প্রসারে সেই আস্থার সেতু ক্রমে দুর্বল হয়ে গেছে। হালখাতার জৌলুশ ফিকে হয়ে গেছে। এই ক্ষতিটা শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলারও ক্ষতি।

উৎসব তখনই সত্যিকারের উৎসব হয়, যখন তার আনন্দ সবার হয়। বৈশাখের অর্থনীতিকে সেই লক্ষ্যে নিয়ে যেতে হলে শুধু সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, বদলাতে হবে বণ্টনের কাঠামোও। সেই কাজটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

 

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

 

১৩ পাউন্ডের ব্রোকলি নিয়ে ক্ষোভ, ‘শো’ হয়ে যাচ্ছে খাবার—রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি নিয়ে পপি ও’টুলের তীব্র সমালোচনা

নিস্তেজ বৈশাখের অর্থনীতি

১১:০০:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

বাংলা নববর্ষ চালুর নেপথ্যের মুল কারণ ছিল অর্থনৈতিক। আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সনের প্রবর্তন করছিলেন রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে। নতুন ফসল ওঠার পর কৃষক যাতে তাদের চাপমুক্তভাবে জমিদার কিংবা রাজ দরবারে এসে তাদের জমির খাজনা পরিশোধ করতে পারে সেজন্য বৈশাখ থেকে গণনা করা হয় নতুন বাংলা সনের। সেই থেকে বিগত চারশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এর সঙ্গে নানা উপকরণ যুক্ত হয়ে বৈশাখ এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

খাজনা আদায়ের সেই প্রথা বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেলেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি। বাংলা সন প্রবর্তনের পরপরই ব্যবসা বাণিজ্যেও ক্ষেত্রে চালু হয়েছিল ‘হালখাতা’ ব্যবস্থা। বাংলা সন প্রবর্তনের পর বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ খাজনা আদায় সম্পর্কিত ‘পুণ্যাহ’ নামে একটি রীতি চালু করেন। এই রীতিতে খাজনা আদায়ের পাশাপাশি থাকতো উৎসবমুখর মেলার আয়োজন। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই ব্যবসায়িক হালখাতার প্রচলন শুরু হয়। কালের বিবর্তনে ‘পুণ্যাহ’ বিলুপ্ত হয়ে বাঙালির ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হালখাতা ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।

‘হালখাতা’ শব্দটির উৎপত্তি ফারসি ভাষা থেকে; ‘হাল’ অর্থ নতুন এবং ‘খাতা’ অর্থ হিসাবের বই। অর্থাৎ, বছরের প্রথম দিনে পুরোনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে নতুন খাতা খোলার মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন অর্থবছরের যাত্রা। এদিন ব্যবসায়ীরা তাদের পাইকারদের আমন্ত্রণ জানান। তারা এসে পুরোনো দেনা পরিশোধ কওে নতুন হিসাবের খাতা খোলেন। এ সময় মিষ্টিমুখের মাধ্যমে উভয়ে তাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেন।

কালের বিবর্তনে ব্যবসায়িক এই ঐতিহ্য ‘হালখাতা’ও বিলুপ্তির মুখে। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর প্রেক্ষিত্রে এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে লাল রঙের সেই হালখাতা। আবার সর্বত্র ইংরেজি বর্ষের প্রভাবে বাংলা সনের প্রথম দিনের সেই আর্থিক হিসাবের ব্যবস্থাও বিলুপ্তির পথে। তাই বলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কিন্তু বিলুপ্ত হচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে এর রূপে এসেছে নানা পরিবর্তন। কালের পরিক্রমায় বৈশাখ ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড আরও বিস্তৃত ও প্রসারিত হচ্ছে। এখন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডই বৈশাখের মুল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

দিন গণনা কিংবা সন তারিখের হিসাব নিকাশে সারা বছর বাংলা বর্ষের কোন গুরুত্ব না থাকলেও, বাংলা বছরকে বরণে বাঙালির আবেগ, উচ্ছ্বাস, উৎসব দিন দিন বড় হচ্ছে। আর নতুন বছরের প্রথম মাস বৈশাখককে কেন্দ্র অর্থনীতির কলেবরও দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে পহেলা বৈশাখ এখন আর বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, এটি এখন একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। প্রতি বছর এই দিনকে ঘিরে দেশের বাজারে তৈরি হয় বিপুল লেনদেন, বাড়ে ভোক্তা চাহিদা, চাঙা হয় উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা। পোশাক, খাদ্য, হস্তশিল্প, ফুল, মেলা, বিনোদন -সব মিলিয়ে বৈশাখ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক মৌসুমে পরিণত হয়েছে। তবে এই অর্থনৈতিক উচ্ছ্বাসের মধ্যেও রয়েছে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা, বৈষম্য এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জ।

ব্যবসায়ীদের হিসাবে, সামগ্রিকভাবে বৈশাখ ঘিরে দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ এখন ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকায় এসে দাড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদরাও একইরকম অনুমান করছেন। তারা বলছেন, এই একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। শুধু পোশাক খাতেই বিক্রি হয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য।

ফ্যাশন হাউসগুলোতে সারা বছরের মোট বিক্রির ২৫ থেকে ২৮ শতাংশই হয় এই একটি উৎসবকে ঘিরে। প্রতিবছর এই সংখ্যা আরও বাড়ছে। করোনার সময় যখন বৈশাখ উদ্‌যাপন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন শুধু পোশাক খাতেই ক্ষতি হয়েছিল ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। সেই সংখ্যাটাই বলে দেয় উৎসবটি অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যাশন হাউজের উদ্যোক্তাদের মতে, তাদের সারা বছরের মোট বিক্রির একটি বড় অংশ আসে উৎসবভিত্তিক বাজার থেকে। রোজার ঈদে যেখানে অর্ধেকের বেশি বিক্রি হয়, সেখানে পহেলা বৈশাখে হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। ফলে বৈশাখ এখন দেশের পোশাক শিল্পের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৌসুম। কেরানীগঞ্জ, ইসলামপুর ও নবাবপুরের পাইকারি বাজারগুলো বৈশাখী অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র। সারা দেশের অর্ধেক বৈশাখী পোশাক তৈরি হয় কেরানীগঞ্জে। বৈশাখের এক মাস আগে থেকেই এখানে পাইকারি বেচাকেনা শুরু হয়। প্রতিদিন একেকটি দোকানে দুই লাখ থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়া এখন সাধারণ ঘটনা।

ফ্যাশন এন্টারপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি আজহারুল হক আজাদও বলছেন,  ‘এবার ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি আগের কয়েক বছরের তুলনায় ভালো ছিল। কারণ গত কয়েক বছর বৈশাখ ঈদের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আলাদা করে প্রস্তুতির সুযোগ ছিল না। কিন্তু এবার ঈদের পর ১০ থেকে ১৫ দিনের একটি সময় পাওয়া গেছে, তাই সবাই বেশি করে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে এসব পোশাকের মধ্যে কারও হয়তো প্রায় সব থেকে গেছে, আবার কারও হয়তো ৫০ শতাংশ থেকে গেছে, গড়ে এবার বৈশাখ খুবই খারাপ ছিল।’ তার ধারণা, এর আগে কখনো বৈশাখ বোধহয় এত খারাপ যায়নি।

পোশাক ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা বলেন,‘ বৈশাখের বাজার বেশ বড়। অনেক সময় তা ঈদের চেয়েও বড়। কারণ সব ধর্মের মানুষ বৈশাখে কেনাকাটা করেন। আর আমরা এবার ঈদের পর ১৫ দিনের বেশি সময় পেয়েছিলাম। আর গতবার তো বৈশাখ হয়নি। ফলে এবার আমাদের প্রস্তুতি বেশ ভালো ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে আমরা বিরাট সংকটে পড়েছি।’

তার মতে, বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এই সময়ের জন্য বিশেষভাবে তৈরি পণ্য-যেমন টেপা পুতুল, শখের হাড়ি, কুলা, বিভিন্ন কারুশিল্প, এসব সারা বছর বিক্রি হয় না, শুধু বৈশাখেই চাহিদা থাকে। এসব পণ্যের সঙ্গে গ্রামের অসংখ্য মানুষ জড়িত। দেশের অর্থনীতির যে সংকট অবস্থা, তাতে তারা যদি এই সময়ে পণ্য বিক্রি করতে না পারেন, তাহলে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে এবং দেনা-পাওনা শোধ করাও কঠিন হয়ে যাবে।’

বৈশাখ ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য তৈরি হয় বড় সুযোগ। এবারের রাজধানীতে আয়োজন করা হয় এসএমই বৈশাখী মেলায়। এতে ১৫০টির বেশি উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছেন। এখানে হস্তশিল্প, পাটজাত পণ্য, ফ্যাশন সামগ্রী, খাদ্যপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি হয়েছে।

বৈশাখে ফুলের বাজারেও বড় উত্থান ঘটে। প্রতিদিন ৩০-৩৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হলেও এই মৌসুমে তা বেড়ে ৬০-৭০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একইভাবে মিষ্টি, পিঠা, কুটিরশিল্প, মাটির পণ্য প্রভৃতি খাতেও বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। তবে মৃৎশিল্পীরা বলছেন, প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে তাদের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। বৈশাখই তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে বড় বিক্রির সময়, যা দিয়ে তারা বছরের অন্য সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চান।

বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ, এই ধারণা এখন সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। বৈশাখ ঘনিয়ে এলেই ইলিশের দাম বেড়ে যায়। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এক কেজি ইলিশ ২৬০০ থেকে ৩০০০ টাকায় বিক্রি হয়, যা গত বছরের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ বেশি ছিল। অবশ্য এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে মজুতদারি ও অবৈধ বাণিজ্য বাড়ে, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। ফলে সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

হালখাতার একাল

পহেলা বৈশাখের অন্যতম প্রাচীন অনুষঙ্গ হালখাতা। ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খুলে পুরোনো দেনা-পাওনা পরিশোধ করেন এবং ক্রেতাদের আপ্যায়ন করেন। প্রথমদিকে এই প্রথা বাঙালি মুসলমান ব্যবসায়ীদের মধ্যেই বেশি প্রচলিত ছিল। তারা নতুন খাতার প্রথম পাতায় ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ ও ‘এলাহি ভরসা’ লিখে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে বছরের শুভ সূচনা করতেন। অন্যদিকে, সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখের সকালে সিদ্ধিদাতা গণেশ ও লক্ষ্মী দেবীর পূজা করে নতুন হিসাব শুরু করেন। ধর্মীয় ভিন্নতা থাকলেও উদ্দেশ্য এক নতুন বছরে ব্যবসার সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা।

বর্তমানে দেশে ৭০ লাখের বেশি দোকান ও খুচরা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি দোকানে গড়ে ১০ হাজার টাকা ব্যয় ধরলে হালখাতা ঘিরেই ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে সময়ের পরিবর্তনে এই ঐতিহ্যে এসেছে পরিবর্তন। অনেক ক্ষেত্রে দোকানভিত্তিক আয়োজনের পরিবর্তে কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান হচ্ছে। আবার বাকির খাতার পরিবর্তে নগদ লেনদেন বাড়ায় ব্যবসায়ী-ক্রেতার সম্পর্কের ঐতিহ্যগত উষ্ণতাও কিছুটা কমেছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হালখাতার চিরচেনা রূপেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় যেখানে মোটা খাতায় হাতে লেখা হিসাবই ছিল প্রধান মাধ্যম, সেখানে এখন অনেক ব্যবসায়ী কম্পিউটার ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটালভাবে হিসাব সংরক্ষণ করছেন। নিমন্ত্রণপত্রের জায়গায় এসেছে এসএমএস, ফোনকল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একইসঙ্গে বিকাশ, নগদ কিংবা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন হালখাতাকে আরও সহজ ও সময়োপযোগী করে তুলেছে। কিন্তু হালখাতা তৈরির সঙ্গে জড়িত উৎপাদকরা এখন পথে বসেছে। উপযোগীতা হারিয়েছে তাদের সেই বংশ পরাস্পরায় ঐহিত্যবাহী লাল রঙের হালখাতা তৈরির কুটির শিল্পের।

যুদ্ধ ও জ্বালানি প্রভাব

এবারের বৈশাখী বাজারে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জ্বালানি সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির আশঙ্কা করেছেন।

বাংলা নববর্ষকে ঘিরে প্রতিবছর জমে ওঠা কেনাকাটার উৎসব এবার অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, বৈশাখে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত কেনাকাটার যে প্রবণতা দেখা যায়, চলতি বছরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, সাধারণত বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাজারে অন্তত ১০ শতাংশ লেনদেন বৃদ্ধি পায়। তবে এবার সেই প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি, বরং আগের তুলনায় লেনদেন কমেছে। সব মিলিয়ে, এবারের বৈশাখ ঘিরে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক গতি তৈরি হয়নি। এবারে বৈশাখের অর্থনীতি বড় হওয়ার পরিবর্তে বরং ছোট হয়েছে। নিস্তেজ ছিল বৈশাখের অর্থনীতি।

গ্রমীণ অর্থনীতির বাস্তবতা

বাংলা সনের প্রচলনের উদ্দেশ্যও ছিল কৃষকের ফসলের মৌসুম বুঝে খাজনা আদায় করা। সেই উৎসবের শিকড় ছিল মাটিতে, গ্রামে, কৃষিতে। কালের পরিক্রমায় সেই গ্রামীণ উৎসব এখন অনেকটাই শহরের উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। রমনার বটমূলে শোভাযাত্রা, অভিজাত রেস্তোরাঁয় পান্তা-ইলিশের পাত, শপিং মলে বৈশাখী পোশাকের বাহার, এগুলো হচ্ছে শহরের বৈশাখ।

কিন্তু গ্রামের বৈশাখ আলাদা। সেখানে বটতলার মেলায় একটু চিড়া-মুড়ি, ছেলেমেয়েদের হাতে বাঁশের বাঁশি আর মাটির পুতুল, নাগরদোলার আনন্দ, যাত্রাপালার উত্তেজনা। পার্বত্য চট্টগ্রামে তরুণ-তরুণীদের নাচ আর জলকেলি। রাজশাহীর শিবতলী কিংবা দিনাজপুরের ফুলতলীর মেলায় হাজারো মানুষের ভিড়। গ্রামের বধূ তাঁর জামাতাকে নিমন্ত্রণ জানান, পিঠা-পুলির আয়োজন করেন। দুটো বৈশাখ পাশাপাশি চলে, কিন্তু দুটোর মধ্যে আর্থিক ফারাকটা বিশাল।

নতুন জামা-কাড়র পড়ে বৈশাখি উৎসবে যোগদান এখন বর্ষবরণে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। আর এই নতুন জামা-কাপড় কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি সঞ্চারিত হচ্ছে। তবে এই উৎসব এখন আর শহরে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রামাঞ্চলেও এই শহুরে উৎসকের ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামবাংলার আনাচকানাচেও বৈশাখের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। মেলা, পিঠা-পুলি, বাঁশ-বেতের পণ্য, মাটির তৈরি সামগ্রী, সব মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হচ্ছে নতুন গতি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই গ্রামীণ অংশটিই বৈশাখী অর্থনীতির প্রাণ।

বৈশাখী অর্থনীতির বড় অংশ গ্রামীণ হলেও সেখানে রয়েছে চ্যালেঞ্জ। অনেক গ্রামে এখন আগের মতো মেলা বসে না, লোকজ সংস্কৃতি কমে গেছে, কৃষকের আয় কমে যাওয়ায় উৎসবের আনন্দও সীমিত হয়ে পড়েছে। মৃৎশিল্পী, তাঁতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বলছেন, তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য তারা পান না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে পণ্যের দাম শহরে কয়েকগুণ বাড়লেও উৎপাদকরা বঞ্চিত থাকেন।

অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, গ্রামীণ মেলা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য যত বেশি বিক্রি হবে, ততই গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে। ফলে বৈশাখ শুধু নগর অর্থনীতির নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি বড় চালিকাশক্তি।

বৈশাখি উৎসবের চিত্র এখন শহর ও গ্রামের মধ্যে ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একসময় সবুজে ঘেরা গ্রামগুলোই ছিল বর্ষবরণের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু এখন সেই চিরচেনা গ্রামীণ বৈশাখ যেন অনেকটাই ম্লান।

গ্রামে আর দেখা যায় না কাঠের বাক্সে তুলে রাখা কাপড় রোদে দিয়ে নতুন বছরের প্রস্তুতির দৃশ্য। খড় বিছানো জোছনা রাতে কৃষক-কিষানিদের মিলনমেলা, গল্প-আড্ডা কিংবা জারি, সারি, বাউল বা ভাটিয়ালির সুর—সবই এখন স্মৃতির অংশ। কৃষিনির্ভর জীবনের পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়ের অনিশ্চয়তা গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের আনন্দ তাদের কাছে এখন অনেকটাই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের গ্রামগুলোতেও একই চিত্র। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাড়াগুলোতে বর্ষবরণের ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান, কুটুমবাড়িতে উপহার পাঠানো কিংবা চরক পূজার মতো আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব রীতিনীতি হারিয়ে যাচ্ছে।

একসময় বৈশাখকে ঘিরে গ্রামে জমজমাট মেলা বসতো। হাটখোলা, বটতলা কিংবা পালপাড়াগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। এখন সেই মেলার সংখ্যা কমে গেছে। ফলে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও খেলনার চাহিদা কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কুমারশিল্পীরা। তারা বলছেন, পরিশ্রম অনুযায়ী মূল্য না পাওয়ায় এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পহেলা বৈশাখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ‘হালখাতা’ও হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামাঞ্চল থেকে। আগে দোকানপাটে রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হালখাতার আয়োজন থাকলেও এখন তা অনেকটাই কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, বাকির খাতায় আস্থা কমে যাওয়ায় এখন বেশিরভাগ লেনদেন সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়। এমনকি কোথাও কোথাও হালখাতার আয়োজন দোকানের পরিবর্তে কমিউনিটি সেন্টারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যেখানে মিষ্টির বদলে পোলাও-মাংস বা বিরিয়ানির আয়োজন করা হয়।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পড়েছে এর প্রভাব। আগে বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিল্পীরা অংশ নিতেন, যা তাদের আয়ের একটি উৎস ছিল। কিন্তু এখন সেই আয়োজন কমে যাওয়ায় শিল্পীদের জীবন-জীবিকাও সংকটে পড়েছে। অনেক শিল্পীই বলছেন, জীবিকার তাগিদে অন্য কাজে সময় দিতে গিয়ে তারা সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

সময়ের পরিক্রমায় গ্রামীণ ঐতিহ্যভিত্তিক বৈশাখ ধীরে ধীরে আধুনিক নগরকেন্দ্রিক উৎসবে রূপ নিচ্ছে। ফলে বাঙালির শেকড়ের এই আয়োজন তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।

সামনে করণীয়

বাংলা নববর্ষের সূচনা হয়েছিল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রয়োজনে। সেই গ্রামীণ শিকড়ের উৎসব এখন অনেকটাই শহরমুখী। রমনার বটমূলে শোভাযাত্রা, শপিং মলে কেনাকাটা, রেস্তোরাঁয় পান্তা-ইলিশ—এসব এখন আধুনিক বৈশাখের চিত্র। অপরদিকে, গ্রামের বৈশাখ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। মেলা কমছে, লোকজ বিনোদন হারিয়ে যাচ্ছে, আর আধুনিকতার প্রভাবে ঐতিহ্যগত অনেক আয়োজন বিলুপ্তির পথে।

তাই বৈশাখী অর্থনীতিকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। সেগুলো হলো, গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি। ই-কমার্সের মাধ্যমে পণ্য বিপণনের সুযোগ বৃদ্ধি। হস্তশিল্প ও কারুশিল্পে প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ। বাজারে মজুতদারি ও কারসাজি নিয়ন্ত্রণ। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা।

বৈশাখের বিশাল অর্থনীতিকে আরও কার্যকর করতে বৈশাখী মেলাকে শুধু উৎসবের আয়োজন হিসেবে না দেখে একটি নিয়মিত বিপণন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। দেশের প্রতিটি জেলায় যদি কারুশিল্পী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ করে দেওয়া যায়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর হাত কেটে সরাসরি লাভ পাবেন উৎপাদক। বিসিকের বৈশাখী মেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারুশিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে, কিন্তু সেটা সীমিত এবং ঢাকাকেন্দ্রিক। এই সুযোগ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ই-কমার্সকে কাজে লাগানো দরকার। চীনের আলিবাবা কীভাবে গ্রামীণ উৎপাদকদের সরাসরি শহরের ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করেছে, সেই মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। বাংলাদেশে ই-কমার্সের বাজার দ্রুত বাড়ছে। সরকার যদি কারুশিল্পী ও তাঁতিদের জন্য ডিজিটাল বিপণনের প্রশিক্ষণ এবং প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে সহায়তা করে, তাহলে বৈশাখের মৌসুমে গ্রামীণ পণ্যের বিক্রি কয়েক গুণ বাড়তে পারে। উৎসব-পার্বণে ডিজিটাল লেনদেন যে হারে বাড়ছে, সেটা আশার কথা। তাই এই ডিজিটাল যুক্ততাকে কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ বিক্রেতাকে বাজারে আনা সম্ভব।

তৃতীয়ত, হস্তশিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশ থেকে এখন বছরে প্রায় ৮০ লাখ ডলারের হস্তশিল্প বিদেশে রপ্তানি হয়। এই সংখ্যাটা আসলে অনেক বেশি হওয়ার কথা ছিল। সঠিক নীতিসহায়তা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারণার ব্যবস্থা করা গেলে এই খাত থেকে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

চতুর্থত, বৈশাখকে শুধু শহরের উৎসব না রেখে কৃষকের দরজায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে উৎসবের দিনটিকে অর্থবহ করে তোলা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ যদি প্রতিবছর নতুন রূপে আসে, তাহলে গ্রামীণ মানুষের কাছে বৈশাখ শুধু আনন্দের দিন নয়, সুযোগেরও দিন হয়ে উঠবে।

বৈশাখী অর্থনীতির আকার বাড়লেই যে দেশের সব মানুষের জীবন ভালো হয়ে যায়, এমন নয়। বাজারে বাড়তি টাকার সরবরাহ হলে চাহিদা বাড়ে, সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। উৎসব মৌসুমে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, যার সবচেয়ে বড় শিকার হন সেই মানুষগুলো, যাঁদের কোনো বোনাস নেই, উৎসব ভাতা নেই। তাঁদের কথাও ভাবতে হবে।

একসময় পয়লা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা পুরোনো বছরের বাকি আদায় করতেন, নতুন খাতা খুলতেন, খদ্দেরদের মিষ্টি খাওয়াতেন। এই আচারের ভেতরে একটি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ছিল, একটি সম্পর্কের উষ্ণতা ছিল। ব্যবসায়ী আর ক্রেতার মধ্যে শুধু লেনদেন নয়, একটা আস্থার সেতু ছিল। নগদ কেনাবেচার প্রসারে সেই আস্থার সেতু ক্রমে দুর্বল হয়ে গেছে। হালখাতার জৌলুশ ফিকে হয়ে গেছে। এই ক্ষতিটা শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলারও ক্ষতি।

উৎসব তখনই সত্যিকারের উৎসব হয়, যখন তার আনন্দ সবার হয়। বৈশাখের অর্থনীতিকে সেই লক্ষ্যে নিয়ে যেতে হলে শুধু সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, বদলাতে হবে বণ্টনের কাঠামোও। সেই কাজটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

 

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক