স্তন্যপায়ী প্রাণীকে বারবার ক্লোন করে সীমাহীন সংখ্যায় তৈরি করা সম্ভব—এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরে ছিল। তবে জাপানের বিজ্ঞানীদের নতুন এক গবেষণা সেই ধারণায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। দুই দশক ধরে একটি ইঁদুর থেকে শুরু করে ১,২০০টিরও বেশি ক্লোন তৈরি করার পর তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমার পর আর ক্লোন টিকে থাকে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৮তম প্রজন্মের ইঁদুরগুলো বাঁচেনি। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রমাণ মিলেছে যে স্তন্যপায়ী প্রাণীকে সীমাহীন সংখ্যায় ক্লোন করা সম্ভব নয়।
ক্লোনিং নিয়ে দীর্ঘদিনের আশা
এই পদ্ধতিতে এক ক্লোন থেকে আবার নতুন ক্লোন তৈরি করা হয়। ভবিষ্যতে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী রক্ষা বা ব্যাপক হারে মাংস উৎপাদনের মতো কাজে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে—এমন আশাও ছিল।
গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী তেরুহিকো ওয়াকায়ামা বলেন, আগে মনে করা হতো সীমাহীন সংখ্যক ক্লোন তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু এই ফলাফল সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

উল্লেখ্য, ওয়াকায়ামার দলই ১৯৯৭ সালে প্রথম ইঁদুর ক্লোন করেছিল। এর এক বছর আগে ‘ডলি’ নামের ভেড়া ছিল বিশ্বের প্রথম ক্লোন করা স্তন্যপায়ী প্রাণী।
দুই দশকের দীর্ঘ পরীক্ষা
নতুন গবেষণার জন্য ২০০৫ সালে একটি স্ত্রী ইঁদুরকে প্রথম ক্লোন করা হয়। প্রতিটি ইঁদুর তিন মাস বয়সে পৌঁছালে আবার সেটিকে ক্লোন করা হতো। এভাবে প্রতি বছর তিন থেকে চারটি নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়।
২০ বছরে ৩০ হাজারের বেশি ক্লোনিং প্রচেষ্টা চালিয়ে ১,২০০টিরও বেশি ইঁদুর তৈরি করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় একটি প্রাণীর কোষ থেকে ডিএনএযুক্ত নিউক্লিয়াস বের করে সেটি একটি নিউক্লিয়াসবিহীন ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ মোড়: ২৫তম প্রজন্ম
গবেষণার শুরুর দিকে ক্লোনিংয়ের সাফল্যের হার বাড়তে থাকে এবং একসময় তা ১৫ শতাংশের বেশি হয়। ইঁদুরগুলোও দেখতে একেবারে অভিন্ন ছিল, যা বিজ্ঞানীদের আশাবাদী করে তোলে।
তবে ২৫তম প্রজন্মের কাছাকাছি এসে পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর থেকে ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তন জমতে শুরু করে এবং প্রতিটি নতুন প্রজন্মের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমতে থাকে।
৫৭তম প্রজন্মে এসে বেঁচে থাকার হার নেমে দাঁড়ায় মাত্র ০.৬ শতাংশে। যদিও এই ইঁদুরগুলো বাইরে থেকে সুস্থ দেখাত।
কিন্তু ৫৮তম প্রজন্মের সব ইঁদুর জন্মের পরপরই মারা যায়। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণও জানা যায়নি।
জিনগত পরিবর্তনের প্রভাব
গবেষণায় ক্লোন ইঁদুরগুলোর জিন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্বাভাবিক প্রজননে জন্ম নেওয়া ইঁদুরের তুলনায় তাদের মধ্যে তিনগুণ বেশি পরিবর্তন ছিল।

এছাড়া তাদের প্লাসেন্টা বড় ছিল এবং কিছু ইঁদুরের এক্স ক্রোমোজোমের একটি কপি অনুপস্থিত ছিল।
ওয়াকায়ামা বলেন, আগে মনে করা হতো ক্লোনগুলো মূল প্রাণীর সঙ্গে পুরোপুরি অভিন্ন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়।
যৌন প্রজননের গুরুত্ব
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৫৭তম প্রজন্মের ক্লোন ইঁদুরগুলোও যখন স্বাভাবিকভাবে পুরুষ ইঁদুরের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তারা সুস্থ বাচ্চা জন্ম দেয়, যাদের মধ্যে জিনগত পরিবর্তন কম ছিল।
এটি দেখায়, দীর্ঘমেয়াদে প্রজাতির টিকে থাকার জন্য যৌন প্রজনন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাটি ‘মুলারের র্যাচেট’ নামে একটি তত্ত্বকেও সমর্থন করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অযৌন প্রজননে ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তন ধীরে ধীরে জমতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত প্রজাতি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
এই গবেষণা প্রথমবারের মতো প্রমাণ দিয়েছে যে স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রেও এমন জিনগত ভাঙন ঘটে।
এতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতে দেখা সীমাহীন সংখ্যক ক্লোন তৈরির ধারণাও বাস্তবসম্মত নয় বলে বোঝা যাচ্ছে।
ভবিষ্যতে কোনো বিপর্যয়ের পর নতুন করে প্রাণী তৈরি করার পরিকল্পনায়ও এই সীমাবদ্ধতা প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে গবেষকরা এখনো নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন, যাতে প্রাণীদের ক্ষতি না করে তাদের কোষ সংগ্রহ করা যায়। ইতিমধ্যে প্রস্রাব থেকে সংগৃহীত কোষ ব্যবহার করে ক্লোন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, আর এখন মল থেকেও একই কাজ করার চেষ্টা চলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















