ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল—এমনটি বলা যায় না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যখন ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা সেই ঝুঁকিকে উপেক্ষা করেছিল—যে ঝুঁকি এতদিন ধরে প্রতিটি মার্কিন প্রশাসনকে থামিয়ে রেখেছিল। সেই ঝুঁকি ছিল, ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘অপ্রত্যাশিত ঘটনা’ আসলে তেল সংকট নয়, বরং হামলার সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ফলেই যে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা প্রমাণ করে দিয়েছে—অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে কথা বলা হয়, বাস্তবে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়নি।
বিশ্ব তেলবাজারে বড় ধাক্কা
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এটিকে বৈশ্বিক তেলবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ ব্যাঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে, ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি রেশনিং, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাসা থেকে কাজের নির্দেশ, কর্মঘণ্টা কমানো এবং স্কুল বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং খাদ্যসংকটের আশঙ্কাও জোরালো হচ্ছে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বহুমাত্রিক সংকট
এই সংকট কেবল জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, টেকসই উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামাজিক কল্যাণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি এশিয়ার বাজেট, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এমনকি এটি দীর্ঘমেয়াদি ও অস্তিত্বগত সংকটের দিকেও ইঙ্গিত করছে।
প্রস্তুতির অভাব কেন
এই ধরনের সংকটের সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল। সামরিক পরিকল্পনায় বহুদিন ধরেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে অর্থনীতিবিদরা যুদ্ধের প্রভাব বিশ্লেষণের জন্য বিশেষ মডেলও তৈরি করেছিলেন। ২০২১ সালে সুয়েজ খালে জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনাও বিশ্বকে সতর্ক করেছিল।
তবুও বিশ্ব প্রস্তুত ছিল না। এর মূল কারণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সম্পর্কে অপর্যাপ্ত ধারণা। এখনো এই ধারণার কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। জি-৭ দেশগুলো ২০২৩ সালে একটি কাঠামো দিলেও সেটি খুব সীমিত পরিসরে—সরবরাহ শৃঙ্খল, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সংবেদনশীল প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ।
পুরনো চিন্তার সীমাবদ্ধতা
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক বা বাজারঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকলেও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত নয়। এই ঝুঁকিগুলো সরাসরি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও কৌশলগত উদ্দেশ্য থেকে তৈরি হয়, যা অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন ধারণা ও কার্যকর কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সমন্বয়হীনতা বড় বাধা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি কোনো সরঞ্জামের অভাবে নয়, বরং সমন্বয়ের অভাবে। অর্থনৈতিক, শিল্প, সাইবার এবং নিরাপত্তা নীতিগুলোকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল তৈরি না করলে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
এই সমন্বয় ছাড়া নীতিগুলো অনেক সময় একে অপরের বিপরীতমুখী হয়ে যায়, দেরিতে কার্যকর হয় বা প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়।
সমাধানের পথ
বর্তমান বাস্তবতায় সরকারগুলোর উচিত আগেভাগে চাপ ও ঝুঁকি অনুমান করা, ধাক্কা মোকাবিলা করার সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্তগুলোকে সমন্বিত করা।
এই লক্ষ্যে মন্ত্রিসভা পর্যায়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিষয়ক দায়িত্ব নির্ধারণ, জাতীয় কৌশল প্রণয়ন এবং নীতিনির্ধারণ, গোয়েন্দা তথ্য, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণ, ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

জাপানের অভিজ্ঞতা
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নীতিতে জাপানকে একটি অগ্রগামী উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। দেশটি মন্ত্রিসভা পর্যায়ে এই বিষয়টির জন্য দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে, জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা যুক্ত করেছে এবং এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করেছে।
সরকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করেছে এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করতে প্রণোদনা দিচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, এখনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় কৌশল প্রণয়ন হয়নি এবং দায়িত্বের পরিধি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
সংকট থেকে শিক্ষা
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই এর সঠিক ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন। বর্তমান নীতিগুলো অনেকাংশেই খণ্ডিত, তাৎক্ষণিক এবং ঘটনাভিত্তিক। ফলে সংকট মোকাবিলার বদলে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান তৈরি হয়।
ইরানকে ঘিরে এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে—এই পদ্ধতি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে হলে সমন্বিত, সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের বিকল্প নেই।
ব্র্যাড গ্লোসারম্যান 



















