প্রায় ২৩ বছর ধরে চলা এক আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটেছে ব্রিটেনে। দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতম বিবাহবিচ্ছেদ মামলা হিসেবে বিবেচিত এই বিরোধে শেষ পর্যন্ত ৬৬ লাখ পাউন্ডেরও বেশি অর্থ পাওয়ার অধিকার অর্জন করেছেন সাবেক স্ত্রী বর্ষা গোহিল। আদালতের রায়ে উঠে এসেছে, তার সাবেক স্বামী ভদ্রেশ গোহিল কোটি কোটি পাউন্ডের সম্পদ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক করপোরেট কাঠামোর আড়ালে গোপন করেছিলেন।
২০০২ সালের মে মাসে ভদ্রেশ গোহিলের বিরুদ্ধে পরকীয়া ও অযৌক্তিক আচরণের অভিযোগ এনে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন বর্ষা গোহিল। তখন তাদের তিন সন্তানের বয়স ছিল ১০, ৮ ও ৫ বছর। ২০০৪ সালে আর্থিক সমঝোতার অংশ হিসেবে তিনি ২ লাখ ৭০ হাজার পাউন্ড এবং পরিবারের একটি গাড়ি গ্রহণ করেছিলেন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার সন্দেহ হয়, স্বামী প্রকৃত সম্পদের হিসাব আদালতের কাছে প্রকাশ করেননি। ব্রিটিশ আইনে বিবাহবিচ্ছেদের সময় উভয় পক্ষকে নিজেদের সব সম্পদ, আয় ও দেনার তথ্য সৎভাবে প্রকাশ করতে হয়।
গোপন সম্পদের খোঁজে নতুন লড়াই
২০০৭ সালে বর্ষা মনে করেন, তার হাতে এমন প্রমাণ এসেছে যা দেখায় যে ভদ্রেশ সম্পদের তথ্য গোপন করেছিলেন। এরপর তিনি ২০০৪ সালের আর্থিক নিষ্পত্তি বাতিলের আবেদন করেন।
পরবর্তীতে ২০১১ সালে ভদ্রেশ গোহিল অর্থপাচার ও জালিয়াতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ১০ বছরের কারাদণ্ড পান। তদন্তে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড মূল্যের সম্পদ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
এই সম্পদ জব্দ করে ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস (সিপিএস)। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি পাল্টাপাল্টি লড়াই, যা শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
আইনি নজির তৈরি করা মামলা
২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট বর্ষার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত আগের আর্থিক সমঝোতা বাতিল করে নতুন করে শুনানির সুযোগ করে দেয়।
এই মামলাটি ব্রিটিশ পারিবারিক আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করে। আদালত স্পষ্ট করে যে বিবাহবিচ্ছেদের সময় সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন করা হলে পূর্ববর্তী নিষ্পত্তি পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকবে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রতারণার শিকার অনেক পক্ষ নতুন আইনি সুরক্ষা পেয়েছেন।
কার সম্পদ, কার অধিকার?
তবে মামলার জটিলতা এখানেই শেষ হয়নি। জব্দ করা সম্পদ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া এবং মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণে নতুন শুনানি অনুষ্ঠিত হতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
শুনানিতে তিন পক্ষ ভিন্ন অবস্থান নেয়। ভদ্রেশ দাবি করেন, জব্দকৃত সম্পদ তার নয়। বর্ষা বলেন, সম্পদগুলো বিবাহকালীন সময়ে তার স্বামীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, ফলে তিনি তার ন্যায্য অংশ পাওয়ার অধিকারী। অন্যদিকে সিপিএসের দাবি ছিল, পুরো অর্থই অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ায় তা কেবল রাষ্ট্রের জব্দ প্রক্রিয়ার আওতায় থাকবে।
শেষ রায়ে কী বললেন বিচারক?
বিচারপতি উইলিয়ামস রায়ে বলেন, সম্পদগুলো ভদ্রেশ গোহিলের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল এবং সিপিএস প্রমাণ করতে পারেনি যে পুরো ২ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডই অপরাধলব্ধ অর্থ। আদালত দেখতে পায়, বিবাহকালীন সময়ে কিছু সম্পদ বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মাধ্যমেও গড়ে উঠেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে বর্ষা গোহিলকে ৬৬ লাখ পাউন্ড প্রদানের নির্দেশ দেন বিচারক।
রায়ে বিচারপতি ভদ্রেশকে “ব্যাপক ও ধারাবাহিকভাবে অসৎ” ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই মামলার দীর্ঘ ইতিহাস আইনজীবী ও বিচারকদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে রয়ে যাবে।
সম্পদের তথ্য গোপন, অর্থপাচার এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের এই ঘটনা ব্রিটিশ পারিবারিক আইন ব্যবস্থায় একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















