০৮:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬
আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামে নিজের পানির বোতল নিষিদ্ধ, পানির জন্য অর্থ গুনতে হবে দর্শকদের এভারেস্টে ছয় দিন নিখোঁজ থাকার পর জীবিত ফিরলেন শেরপা গাইড, বিস্ময়ে পর্বতারোহণ বিশ্ব স্বামীর দীর্ঘ থেরাপি ‘অকার্যকর’ মনে হলেও কেন ভিন্নভাবে ভাবতে বললেন মনোচিকিৎসক? আর্মেনিয়ার নির্বাচন ঘিরে বৈশ্বিক নজর: ট্রাম্প-সমর্থিত বাণিজ্য করিডোরে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির আগমন: যা বদলাচ্ছে, আর যা বদলাচ্ছে না মিয়ানমারের সংকটে ভারতের বাস্তববাদ: মিন অং হ্লাইংয়ের সফরের আড়ালে যে হিসাব রুপিয়ার ঐতিহাসিক পতন, ডলারের বিপরীতে ১৮ হাজারে নেমে নতুন রেকর্ড যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তাপপ্রবাহের বিস্তার, ১৫ কোটি মানুষের ওপর প্রভাবের আশঙ্কা বিচারক পদ হারালেন ‘অশোভন আচরণে’ অভিযুক্ত বিচারক, কর্মীদের পাঠিয়েছিলেন যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি

আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ

বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাসে শক্তিধর দেশগুলো বরাবরই নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছে। কখনও শুল্ক, কখনও কোটা, কখনও পরিবেশগত মানদণ্ড, আবার কখনও শ্রম অধিকার। এসব কৌশল কোনো না কোনো সময়ে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন কৌশল সামনে এনেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বা ফোর্সড লেবার। আপাতদৃষ্টিতে এটি মানবাধিকার রক্ষার উদ্যোগ হলেও এর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর। আর এই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আবারও কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) সম্প্রতি প্রায় ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে অভিযোগ তুলেছে যে, এসব দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য প্রবেশ করছে অথবা সেই ঝুঁকি রয়েছে। ওই ৬০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও। এক্ষেত্রে অভিযোগ আনা হয়েছে দুটি। একটি জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার জন্য কার্যকর আইন নেই এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিদ্যমান বিধিবিধানের প্রয়োগও যথেষ্ট নয়। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এখন ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ ব্যবহার করে নতুন ধরনের বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগের পথে হাঁটছে। অর্থাৎ মানবাধিকার প্রশ্নকে এবার সরাসরি বাণিজ্যনীতির অংশ বানানো হচ্ছে। দেশটি ঠিক একই ধরণের কাজ করেছিল জিএসপি স্থগিতের ক্ষেত্রেও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক বড় বড় শিল্প দুর্ঘটনা ঘটলেও রানা প্লাজা ধসের পর ২০১৩ সালের ২৭ জুন বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ বাজার সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকান্ড এবং পরের বছর রানা প্লাজা ধসে সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংগঠন ‘আমেরিকান অর্গানাইজেশন অব লেবার-কংগ্রেস ফর ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (এএফএল-সিআইও) এর আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই জিএসপি সুবিধা স্থগিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। শুল্কমুক্ত বিশেষ এ সুবিধা বাংলাদেশের পাঁচ হাজার পণ্যের ক্ষেত্রে ছিল। যদিও তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে এ সুবিধা ছিল না। স্থগিতের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করতো। জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়া নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা মধ্যেই তখন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নতি এবং শ্রমিকদের সংগঠন করার সুযোগসহ ১৬টি শর্ত পূরণ হলে জিএসপি সুবিধা ফেরত দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন বার্তায় তৎকালীন সরকার শর্ত পূরণে তৎপর হয়। পূরণ করা হয় একে একে সব শর্ত। কিন্তু স্থগিত হওয়া সেই জিএসপি সুবিধা আরও ফিরে পায়নি বাংলাদেশ। নৈতিকতার আড়ালে অর্থনীতির হিসাব ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, যে দেশগুলো তাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় শ্রমমান নিশ্চিত করে না, তারা উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যায্য সুবিধা পায়। কারণ শ্রম নিরীক্ষা, কমপ্লায়েন্স, মানবাধিকার যাচাই কিংবা সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত খরচ হয়। এসব খরচ এড়িয়ে গেলে উৎপাদন ব্যয় কমে এবং পণ্য তুলনামূলক সস্তায় বিক্রি করা সম্ভব হয়। এই যুক্তি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই যুক্তি কি সব দেশের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে? বাস্তবতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতির আওতায় শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এসেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যার নিয়মও তারা নির্ধারণ করবে, প্রয়োগও করবে তারাই। এখানেই বিষয়টি কেবল মানবাধিকার বা শ্রম অধিকারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর নেতৃত্ব ধরে রাখার কৌশলেও পরিণত হয়। বিশ্ব বাণিজ্যে নেতৃত্ব ধরে রাখতে দেশটি এখন সেই কৌশলই প্রয়োগ করছে। বাংলাদেশের সামনে নতুন ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

কারণ দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত, যার সবচেয়ে বড় একক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৮.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার বড় অংশই পোশাক। এমন অবস্থায় যদি যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। ইউএসটিআর ইতোমধ্যে একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো প্রস্তাব করেছে। যারা সহযোগিতা করছে না, তাদের জন্য অতিরিক্ত শুল্ক ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত হার ১০ শতাংশ, কারণ ঢাকা কিছু সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এটিকে স্বস্তির কারণ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনা, আমদানি নজরদারি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। আরও বড় চ্যালেঞ্জ: বাণিজ্যচুক্তির শর্ত শুধু জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নয়, সম্প্রতি সই হওয়া বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিও (এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চুক্তির ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ বাক্যাংশ ব্যবহার করা হয়েছে ১৩১ বার, যেখানে ‘ইউএস শ্যাল’। অর্থাৎ অধিকাংশ বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের ওপর বর্তেছে। কোনো আইনে বা চুক্তিতে ইংরেজি ‘শ্যাল’ কথা থাকা অর্থ হচ্ছে এসব বিষয় পালন করা বাধ্যতামূলক। ‘উইল’ লেখা থাকাটা হয় ইচ্ছাধীন বিষয়। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে শ্যাল কথাটি আছে মোট ১৭৯ বার, উইল ৩ বার। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ আছে মাত্র ৬ বার। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন। তবে এরই মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানা পণ্য কেনার চুক্তি করছে। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে মার্কিন পণ্যের শুল্ক কমাতে হবে, বিভিন্ন অশুল্ক বাধা অপসারণ করতে হবে, কৃষিপণ্য ও ওষুধ আমদানিতে মার্কিন মানদণ্ড গ্রহণ করতে হবে, ডিজিটাল বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে এবং শ্রম ও পরিবেশ আইনে ব্যাপক সংস্কার আনতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বাংলাদেশের অন্য কোনো দেশের সঙ্গে করা কিছু বাণিজ্য বা ডিজিটাল চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানাতে পারবে। আপত্তি দূর না হলে চুক্তি বাতিল করে আগের শুল্কহার পুনর্বহাল করার সুযোগও রাখা হয়েছে। এ ধরনের ধারা অনেক অর্থনীতিবিদের কাছে বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কেনাকাটার বাধ্যবাধকতা চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্দিষ্ট মার্কিন পণ্য কেনার অঙ্গীকার। বাংলাদেশকে আগামী পাঁচ বছর প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ টন গম আমদানি করতে হবে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও সয়াবিনজাত পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি, ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয় এবং সামরিক সরঞ্জাম কেনার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। সেই প্রশ্নটি হলো, একই পণ্য যদি অন্য কোনো দেশ থেকে কম দামে পাওয়া যায়, তাহলে কেবল বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার জন্য বেশি দামে কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে? আর বাংলাদেশের মতো বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যে থাকা অর্থনীতির জন্য এটি ছোট প্রশ্ন নয়। বিশ্ব বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতা একসময় বিশ্বায়নের মূল দর্শন ছিল মুক্ত বাণিজ্য। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্য ক্রমশ ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য এখন শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, অন্যদিকে চীন সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস ও উন্নয়ন সহযোগী। রাশিয়ার সঙ্গেও রয়েছে জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্পর্ক। ফলে কোনো এক পক্ষের স্বার্থকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া বাংলাদেশের জন্য সহজ নয়। বাংলাদেশের করণীয় কী? প্রথমত, শ্রম অধিকার ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বাস্তব সংস্কার প্রয়োজন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে নয়, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রপ্তানির স্বার্থেই এটি জরুরি। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সক্রিয় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। আগামী শুনানি ও মতামত প্রদানের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বাণিজ্য সম্পর্কের বহুমুখীকরণ জরুরি। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বাজারে প্রবেশ বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। চতুর্থত, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম বা টিকফা কাঠামোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা দরকার। দ্বিপক্ষীয় মতপার্থক্য সমাধানের জন্য এটি একটি প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম। শেষ কথা বাংলাদেশ এর আগেও বহুবার কঠিন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়া, রানা প্লাজার পর শ্রমমান নিয়ে চাপ, বৈশ্বিক মন্দা কিংবা মহামারির অভিঘাত, সবকিছুই দেশকে নতুন করে প্রস্তুত হতে বাধ্য করেছে। আজকের চ্যালেঞ্জও তেমনই, তবে আরও জটিল। কারণ এবার চাপ আসছে শুধু শুল্কের মাধ্যমে নয়; আসছে শ্রম অধিকার, পরিবেশ, ডিজিটাল বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন দেয়াল তৈরি করছে, তা ইস্পাতের নয়; তৈরি হচ্ছে কমপ্লায়েন্স, তথ্যস্বচ্ছতা, মানবাধিকার যাচাই এবং কৌশলগত শর্তের স্তরে স্তরে। এই দেয়াল অতিক্রম করতে হলে বাংলাদেশকে শুধু কূটনৈতিক দক্ষতা নয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নীতিগত দূরদর্শিতারও পরিচয় দিতে হবে। কারণ পরীক্ষাটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিপক্বতা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নপথেরও পরীক্ষা। আবারও সেই কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক 

জনপ্রিয় সংবাদ

আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ

আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ

০৮:০০:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাসে শক্তিধর দেশগুলো বরাবরই নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছে। কখনও শুল্ক, কখনও কোটা, কখনও পরিবেশগত মানদণ্ড, আবার কখনও শ্রম অধিকার। এসব কৌশল কোনো না কোনো সময়ে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন কৌশল সামনে এনেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বা ফোর্সড লেবার। আপাতদৃষ্টিতে এটি মানবাধিকার রক্ষার উদ্যোগ হলেও এর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর। আর এই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আবারও কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) সম্প্রতি প্রায় ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে অভিযোগ তুলেছে যে, এসব দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য প্রবেশ করছে অথবা সেই ঝুঁকি রয়েছে। ওই ৬০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও। এক্ষেত্রে অভিযোগ আনা হয়েছে দুটি। একটি জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার জন্য কার্যকর আইন নেই এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিদ্যমান বিধিবিধানের প্রয়োগও যথেষ্ট নয়। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এখন ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ ব্যবহার করে নতুন ধরনের বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগের পথে হাঁটছে। অর্থাৎ মানবাধিকার প্রশ্নকে এবার সরাসরি বাণিজ্যনীতির অংশ বানানো হচ্ছে। দেশটি ঠিক একই ধরণের কাজ করেছিল জিএসপি স্থগিতের ক্ষেত্রেও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক বড় বড় শিল্প দুর্ঘটনা ঘটলেও রানা প্লাজা ধসের পর ২০১৩ সালের ২৭ জুন বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ বাজার সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকান্ড এবং পরের বছর রানা প্লাজা ধসে সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংগঠন ‘আমেরিকান অর্গানাইজেশন অব লেবার-কংগ্রেস ফর ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (এএফএল-সিআইও) এর আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই জিএসপি সুবিধা স্থগিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। শুল্কমুক্ত বিশেষ এ সুবিধা বাংলাদেশের পাঁচ হাজার পণ্যের ক্ষেত্রে ছিল। যদিও তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে এ সুবিধা ছিল না। স্থগিতের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করতো। জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়া নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা মধ্যেই তখন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নতি এবং শ্রমিকদের সংগঠন করার সুযোগসহ ১৬টি শর্ত পূরণ হলে জিএসপি সুবিধা ফেরত দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন বার্তায় তৎকালীন সরকার শর্ত পূরণে তৎপর হয়। পূরণ করা হয় একে একে সব শর্ত। কিন্তু স্থগিত হওয়া সেই জিএসপি সুবিধা আরও ফিরে পায়নি বাংলাদেশ। নৈতিকতার আড়ালে অর্থনীতির হিসাব ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, যে দেশগুলো তাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় শ্রমমান নিশ্চিত করে না, তারা উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যায্য সুবিধা পায়। কারণ শ্রম নিরীক্ষা, কমপ্লায়েন্স, মানবাধিকার যাচাই কিংবা সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত খরচ হয়। এসব খরচ এড়িয়ে গেলে উৎপাদন ব্যয় কমে এবং পণ্য তুলনামূলক সস্তায় বিক্রি করা সম্ভব হয়। এই যুক্তি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই যুক্তি কি সব দেশের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে? বাস্তবতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতির আওতায় শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এসেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যার নিয়মও তারা নির্ধারণ করবে, প্রয়োগও করবে তারাই। এখানেই বিষয়টি কেবল মানবাধিকার বা শ্রম অধিকারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর নেতৃত্ব ধরে রাখার কৌশলেও পরিণত হয়। বিশ্ব বাণিজ্যে নেতৃত্ব ধরে রাখতে দেশটি এখন সেই কৌশলই প্রয়োগ করছে। বাংলাদেশের সামনে নতুন ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

কারণ দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত, যার সবচেয়ে বড় একক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৮.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার বড় অংশই পোশাক। এমন অবস্থায় যদি যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। ইউএসটিআর ইতোমধ্যে একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো প্রস্তাব করেছে। যারা সহযোগিতা করছে না, তাদের জন্য অতিরিক্ত শুল্ক ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত হার ১০ শতাংশ, কারণ ঢাকা কিছু সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এটিকে স্বস্তির কারণ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনা, আমদানি নজরদারি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। আরও বড় চ্যালেঞ্জ: বাণিজ্যচুক্তির শর্ত শুধু জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নয়, সম্প্রতি সই হওয়া বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিও (এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চুক্তির ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ বাক্যাংশ ব্যবহার করা হয়েছে ১৩১ বার, যেখানে ‘ইউএস শ্যাল’। অর্থাৎ অধিকাংশ বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের ওপর বর্তেছে। কোনো আইনে বা চুক্তিতে ইংরেজি ‘শ্যাল’ কথা থাকা অর্থ হচ্ছে এসব বিষয় পালন করা বাধ্যতামূলক। ‘উইল’ লেখা থাকাটা হয় ইচ্ছাধীন বিষয়। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে শ্যাল কথাটি আছে মোট ১৭৯ বার, উইল ৩ বার। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার, আর ‘ইউএস শ্যাল’ আছে মাত্র ৬ বার। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন। তবে এরই মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানা পণ্য কেনার চুক্তি করছে। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে মার্কিন পণ্যের শুল্ক কমাতে হবে, বিভিন্ন অশুল্ক বাধা অপসারণ করতে হবে, কৃষিপণ্য ও ওষুধ আমদানিতে মার্কিন মানদণ্ড গ্রহণ করতে হবে, ডিজিটাল বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে এবং শ্রম ও পরিবেশ আইনে ব্যাপক সংস্কার আনতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বাংলাদেশের অন্য কোনো দেশের সঙ্গে করা কিছু বাণিজ্য বা ডিজিটাল চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানাতে পারবে। আপত্তি দূর না হলে চুক্তি বাতিল করে আগের শুল্কহার পুনর্বহাল করার সুযোগও রাখা হয়েছে। এ ধরনের ধারা অনেক অর্থনীতিবিদের কাছে বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কেনাকাটার বাধ্যবাধকতা চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্দিষ্ট মার্কিন পণ্য কেনার অঙ্গীকার। বাংলাদেশকে আগামী পাঁচ বছর প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ টন গম আমদানি করতে হবে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও সয়াবিনজাত পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি, ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয় এবং সামরিক সরঞ্জাম কেনার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। সেই প্রশ্নটি হলো, একই পণ্য যদি অন্য কোনো দেশ থেকে কম দামে পাওয়া যায়, তাহলে কেবল বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার জন্য বেশি দামে কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে? আর বাংলাদেশের মতো বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যে থাকা অর্থনীতির জন্য এটি ছোট প্রশ্ন নয়। বিশ্ব বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতা একসময় বিশ্বায়নের মূল দর্শন ছিল মুক্ত বাণিজ্য। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্য ক্রমশ ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য এখন শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, অন্যদিকে চীন সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস ও উন্নয়ন সহযোগী। রাশিয়ার সঙ্গেও রয়েছে জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্পর্ক। ফলে কোনো এক পক্ষের স্বার্থকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া বাংলাদেশের জন্য সহজ নয়। বাংলাদেশের করণীয় কী? প্রথমত, শ্রম অধিকার ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বাস্তব সংস্কার প্রয়োজন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে নয়, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রপ্তানির স্বার্থেই এটি জরুরি। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সক্রিয় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। আগামী শুনানি ও মতামত প্রদানের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বাণিজ্য সম্পর্কের বহুমুখীকরণ জরুরি। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বাজারে প্রবেশ বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। চতুর্থত, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম বা টিকফা কাঠামোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা দরকার। দ্বিপক্ষীয় মতপার্থক্য সমাধানের জন্য এটি একটি প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম। শেষ কথা বাংলাদেশ এর আগেও বহুবার কঠিন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়া, রানা প্লাজার পর শ্রমমান নিয়ে চাপ, বৈশ্বিক মন্দা কিংবা মহামারির অভিঘাত, সবকিছুই দেশকে নতুন করে প্রস্তুত হতে বাধ্য করেছে। আজকের চ্যালেঞ্জও তেমনই, তবে আরও জটিল। কারণ এবার চাপ আসছে শুধু শুল্কের মাধ্যমে নয়; আসছে শ্রম অধিকার, পরিবেশ, ডিজিটাল বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন দেয়াল তৈরি করছে, তা ইস্পাতের নয়; তৈরি হচ্ছে কমপ্লায়েন্স, তথ্যস্বচ্ছতা, মানবাধিকার যাচাই এবং কৌশলগত শর্তের স্তরে স্তরে। এই দেয়াল অতিক্রম করতে হলে বাংলাদেশকে শুধু কূটনৈতিক দক্ষতা নয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নীতিগত দূরদর্শিতারও পরিচয় দিতে হবে। কারণ পরীক্ষাটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিপক্বতা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নপথেরও পরীক্ষা। আবারও সেই কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক