বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্যের দ্রুত ক্ষয় শুধু পরিবেশগত সংকটই নয়, বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়েরও কারণ হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, জীববৈচিত্র্য হারানোর ঝুঁকি আর্থিক বাজারগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়ায় অনেক দেশ ভবিষ্যতে ঋণ সংকট ও ঋণের বাড়তি সুদের চাপে পড়তে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান ঋণমান নির্ধারণ পদ্ধতিতে পরিবেশের অবনতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়কে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির বিপুল পরিমাণ সম্পদ ভুলভাবে মূল্যায়িত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রকৃতির ক্ষতি, অর্থনীতিরও ক্ষতি
বিশ্ব অর্থনীতি নানা ধরনের প্রাকৃতিক সেবার ওপর নির্ভরশীল। ফসলের পরাগায়ন, মাছ উৎপাদন, বনজ সম্পদ এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য সুবিধা কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও শিল্প উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষকদের মতে, বন্য পরাগবাহক প্রাণী, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ব অর্থনীতি বছরে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর।

বাড়তে পারে ঋণের সুদের বোঝা
গবেষণায় দেখা গেছে, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির কারণে অনেক দেশের ঋণমান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। ঋণমান কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নিতে দেশগুলোকে বেশি সুদ দিতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী সার্বভৌম ঋণের বার্ষিক সুদ ব্যয় প্রায় ১৬২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা যায়, জীববৈচিত্র্য-সংক্রান্ত ঝুঁকি বিবেচনায় নিলে কিছু দেশের ঋণমান চার থেকে ছয় ধাপ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এতে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
সংকট ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো অর্থনীতিতে
ঋণমান অবনমন শুধু সরকারের জন্য নয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক খাত এবং পেনশন তহবিলের জন্যও নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। কারণ একটি দেশের আর্থিক ঝুঁকি বেড়ে গেলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষকরা মনে করছেন, অতীতে উদীয়মান ঝুঁকি উপেক্ষা করার কারণে যে ধরনের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট দেখা গেছে, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভুল পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখনই পদক্ষেপের আহ্বান
গবেষণার লেখকরা নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তারা আর্থিক মূল্যায়নে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য-সংক্রান্ত ঝুঁকিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
তাদের মতে, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যে ব্যয় প্রয়োজন, তা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির তুলনায় অনেক কম। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পরিবেশগত ক্ষতি একসময় বড় আর্থিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















