এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ককে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারত্বগুলোর একটি হিসেবে দেখা হতো। দুই দেশের নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক ও বিশ্লেষকেরা বিশ্বাস করতেন যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ, চীনের উত্থানের মোকাবিলা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ক্রমেই গভীর হবে।
কিন্তু গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ সেই আশাবাদকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা শুধু কোনো একক নীতিগত মতভেদের ফল নয়; বরং এটি আস্থার সংকট, কৌশলগত অগ্রাধিকারের পরিবর্তন এবং পরস্পরের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার সম্মিলিত প্রতিফলন।
আস্থাহীনতার শিকড়
সম্পর্কের অবনতির লক্ষণ প্রথমে নীতিনির্ধারণী মহলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওয়াশিংটনের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৌশলগত বিশ্লেষক দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক একটি সংবেদনশীল মোড়ে পৌঁছেছে। তাদের মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের ভিত্তি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যার মূল উৎস ছিল এমন কিছু মার্কিন পদক্ষেপ, যা নয়াদিল্লি নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে বা অন্তত সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে উদাসীন বলে মনে করেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান-সংক্রান্ত মার্কিন অবস্থান, বাণিজ্যিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতার কাঠামোতে ভারতের গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা ভারতীয় নীতিমহলে গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছে।

অনেক ভারতীয় বিশ্লেষকের মতে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান সংকট কেবল সাময়িক কূটনৈতিক বিরোধ নয়। বরং এটি এমন একটি পর্যায়, যেখানে দুই দেশ একে অপরের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।
তিনটি সংকেত
সম্পর্কের অবনতিকে বোঝার জন্য তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, পাকিস্তানকে ঘিরে মার্কিন অবস্থান। ভারত দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পরিসরে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের কিছু বক্তব্য ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়াদিল্লির কাছে বিপরীত বার্তা বহন করেছে। ফলে ভারতীয় মহলে এমন ধারণা শক্তিশালী হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করছে।
দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য। ভারতীয় পণ্যের ওপর উচ্চমাত্রার শুল্ক আরোপ শুধু অর্থনৈতিক চাপই সৃষ্টি করেনি, বরং রাজনৈতিক বার্তাও বহন করেছে। বিশেষত রুশ জ্বালানি আমদানির কারণে অতিরিক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অনেকের কাছে এমন একটি সংকেত হিসেবে ধরা পড়েছে, যা ভারতকে সহযোগী নয়, বরং সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করছে।
তৃতীয়ত, কোয়াড জোটের প্রতি আগ্রহের দৃশ্যমান হ্রাস। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত যে প্ল্যাটফর্মকে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, তার কার্যক্রমে এখন সেই রাজনৈতিক উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে না। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের অভাব এবং স্পষ্ট কৌশলগত বার্তার অনুপস্থিতি ভারতের মধ্যে এই প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে, ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার কি বদলে যাচ্ছে?

রুবিওর সফর কেন প্রত্যাশা পূরণ করতে পারল না
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরকে অনেকেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। ধারণা ছিল, সফরটি অন্তত আস্থার ঘাটতি কমানোর জন্য কিছু স্পষ্ট বার্তা দেবে।
কিন্তু সফরের ফলাফল সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বাণিজ্য নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। কোয়াড নিয়েও বড় ধরনের কোনো ঘোষণা আসেনি। একই সঙ্গে ভারত যেসব বিষয়ে স্পষ্ট সমর্থন আশা করেছিল, সেসব ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটনের অবস্থান ছিল সতর্ক এবং অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সফরের পর মার্কিন প্রশাসনের প্রকাশ্য বক্তব্য ও রাজনৈতিক আচরণে ভারতের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এটি প্রতীকী হলেও কূটনীতিতে প্রতীক প্রায়ই বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করে। যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সফরের পর সংশ্লিষ্ট দেশটি আলোচনার কেন্দ্রে না থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আসলে সেই সম্পর্ক কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে?
‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর সীমাবদ্ধতা
বর্তমান পরিস্থিতির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক বাস্তবতা। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ক্রমশ এমন একটি কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে, যেখানে তাৎক্ষণিক জাতীয় স্বার্থকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের ওপরে স্থান দেওয়া হচ্ছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু মিত্র ও অংশীদারদের জন্য এটি অনিশ্চয়তার উৎসও বটে।
ভারতের মতো দেশ, যারা নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, তারা স্বাভাবিকভাবেই এমন অংশীদারের ওপর নির্ভর করতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে যার নীতি প্রতিদিনের রাজনৈতিক বিবেচনায় দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

তবুও সম্পর্কের ভিত্তি অটুট
তবে বর্তমান সংকটকে স্থায়ী বিচ্ছেদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বাস্তব ভিত্তি এখনও শক্তিশালী। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারসাম্য রক্ষা, প্রযুক্তি উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রগুলোতে উভয় দেশের স্বার্থ এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে মিলিত।
এ কারণেই সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনকে শেষ অধ্যায় হিসেবে নয়, বরং একটি পুনর্মূল্যায়নের পর্যায় হিসেবে দেখা উচিত। তবে এটিও সত্য যে আস্থা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনর্গঠন করতে সময় লাগে। কৌশলগত স্বার্থ দুই দেশকে কাছাকাছি আনতে পারে, কিন্তু সেই সম্পর্ককে টেকসই করতে হলে পারস্পরিক বিশ্বাসের বিকল্প নেই।
আজকের বাস্তবতা হলো, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এখনও অংশীদার; কিন্তু তারা আর আগের মতো আত্মবিশ্বাসী অংশীদার নয়। আর সেই পরিবর্তনই আগামী কয়েক বছরের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অধ্যাপক মুজাম্মিল আহমদ খান 



















