মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লেই একটি পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে চলে আসে—বিশ্ব কি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে? সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগর ঘিরে নতুন বাণিজ্যিক সংযোগ, আরব দেশগুলোর মধ্যে পরিবহন সহযোগিতা এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার আলোচনা এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। অনেকের কাছে মনে হচ্ছে, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের যুগে হয়তো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব, যা হরমুজকে পাশ কাটিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ সচল রাখতে পারবে।
কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে আলোচনা চলছে, তার বড় অংশই ভূগোল, আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির মৌলিক বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। ফলে ‘বিকল্প’ শব্দটি যতটা আকর্ষণীয় শোনায়, বাস্তবে তার ভিত্তি ততটাই দুর্বল।
প্রথমত, হরমুজ কোনো মানবসৃষ্ট অবকাঠামো নয় যে প্রয়োজনে আরেকটি তৈরি করা যাবে। এটি একটি প্রাকৃতিক সামুদ্রিক পথ, যার গঠন লক্ষ লক্ষ বছরের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফল। বিশ্বের বৃহত্তম তেলবাহী জাহাজগুলো যে গভীরতা ও নৌপথের সুবিধা ব্যবহার করে চলাচল করতে পারে, তা অন্যত্র কৃত্রিমভাবে পুনর্নির্মাণ করা অত্যন্ত কঠিন, প্রায় অসম্ভব। ভূগোলের কিছু বাস্তবতা আছে, যা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা অর্থনৈতিক বিনিয়োগ দিয়ে বদলে ফেলা যায় না।
লোহিত সাগরকে ঘিরে যে নতুন পরিবহন উদ্যোগগুলোর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো বাণিজ্য সহজ করবে, আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। কিন্তু এসব উদ্যোগকে হরমুজের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ এগুলোর উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্ষেত্রের।

হরমুজের গুরুত্ব বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের দিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এটি এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রণালি, যার মাধ্যমে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের অধিকার বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। কোনো একক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইচ্ছা বা ঘোষণার ভিত্তিতে এর আইনি অবস্থান বদলে যায় না। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেয় কোন জলসীমায় কার অধিকার এবং কোথায় আন্তর্জাতিক চলাচলের স্বাধীনতা প্রযোজ্য।
এই আইনি কাঠামোই হরমুজকে কেবল একটি আঞ্চলিক জলপথ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশে পরিণত করেছে। ফলে এটিকে দীর্ঘমেয়াদে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যতটা আলোচনায় শোনা যায়, বাস্তবে তা ততটা সহজ নয়।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও একই কথা বলে। প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার এত বড় অংশ একসঙ্গে অন্য কোনো সামুদ্রিক রুটে স্থানান্তর করার মতো অবকাঠামো বর্তমানে নেই। শুধু নতুন বন্দর বা জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা তৈরি করলেই এই সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা প্রায়ই দেখা যায়। অনেকে মনে করেন, কোনো সংকটের কারণে হরমুজে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে খুব বেশি সময় লাগে না। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। জ্বালানি বাজার একটি বহুমাত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে জাহাজ চলাচল, বীমা, মজুত ব্যবস্থাপনা, শোধনাগারের উৎপাদন পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে জড়িত।

একটি সাময়িক বিঘ্নও এই পুরো ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। প্রণালি আবার খুলে গেলেও জাহাজের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন এবং বাজারের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে। অর্থাৎ জলপথ খুলে যাওয়া আর পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়।
এ কারণে সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে কেবল আঞ্চলিক রাজনীতির আলোকে দেখলে ভুল হবে। এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। হরমুজে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও তা ছড়িয়ে পড়ে।
অবশ্যই বিকল্প বন্দর উন্নয়ন, নতুন পাইপলাইন নির্মাণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। এগুলো অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায় এবং নির্দিষ্ট ঝুঁকির প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু এসব ব্যবস্থাকে হরমুজের পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এগুলো ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু হরমুজের ভূমিকাকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
তাই প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত অন্যত্র। হরমুজকে কীভাবে প্রতিস্থাপন করা যায়, তা নয়; বরং কীভাবে এর নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়। কারণ ভূগোল, আন্তর্জাতিক আইন এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা—এই তিনটি ক্ষেত্রই একই সিদ্ধান্তের দিকে ইঙ্গিত করে: হরমুজ প্রণালি এখনো বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ধমনি, এবং অদূর ভবিষ্যতে তার কোনো প্রকৃত সামুদ্রিক বিকল্প নেই।
ড. আবদুল্লাহ বেলহাইফ আল নুয়াইমি 


















