মোহাম্মদ জাহিদ খানের পরিবার তাদের দুটি পুরোনো পাসপোর্টকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মূল্যবান স্মারকের মতো সংরক্ষণ করে রেখেছে। এই পাসপোর্ট দুটি শুধু ভ্রমণের নথি নয়, বরং করাচি থেকে দুবাইয়ে শুরু হওয়া এক পরিবারের কয়েক প্রজন্মের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সাফল্যের জীবন্ত সাক্ষী।
গল্পটির শুরু ১৯৬৩ সালে। করাচির বাসিন্দা মোহাম্মদ উমের খান এবং বদরুন নিসার পরিবার তখনও জানত না যে তাদের ভবিষ্যৎ আরব উপসাগরের তীরে গড়ে উঠবে। আজ সেই যাত্রা পাঁচ প্রজন্ম পেরিয়ে এসেছে। মুরশিদ বাজারের একটি ছোট ফ্ল্যাট এবং পাশের দর্জির দোকান থেকে শুরু হয়ে পরিবারটি এখন একটি সফল লজিস্টিকস ব্যবসা এবং দুবাই হিলসের একটি প্রশস্ত ভিলার মালিক।
জাহিদ খান গর্বের সঙ্গে বলেন, “পাঁচ প্রজন্ম ধরে চলা এই গল্প সত্যিকারের সাফল্যের গল্প।”
পুরোনো দুবাইয়ের স্মৃতি
বদরুন নিসা আজকের ঝলমলে দুবাইয়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শহরকে মনে করতে পারেন। তখন ছিল না বিশাল শপিং মল, ক্যাফে, প্রশস্ত ফুটপাত কিংবা সারি সারি রেস্তোরাঁ।
১৯৬৫ সালে তিনি জাহাজে করে করাচি থেকে দুবাইয়ে আসেন। সমুদ্রের মাঝখানে জাহাজ নোঙর করার পর অন্য একটি নৌযানে উঠতে হয়েছিল। দড়ি আর মইয়ের ঝক্কি পেরিয়ে অবশেষে তারা পৌঁছান দেইরায়।

তার বাবা ১৯৬৩ সালেই দুবাইয়ে এসে দর্জির কাজ শুরু করেছিলেন। পরে স্ত্রী ও সন্তানদেরও নিয়ে আসেন। বদরুন নিসা স্মরণ করেন, তখন মুরশিদ বাজারে খুব বেশি কিছু ছিল না। তবে পুরোনো দোকানপাট, মাছের বাজার এবং কাঠের দরজাওয়ালা বাড়িগুলোর কথা এখনও তার মনে স্পষ্ট।
১৬ বছর বয়সে তিনি করাচিতে ফিরে গিয়ে বিয়ে করেন এবং স্বামী মোহাম্মদ উমের খানকে নিয়ে আবার দুবাইয়ে ফিরে আসেন। তাদের সব সন্তানই জন্মগ্রহণ করেছে রশিদ হাসপাতালে।
“আমার পুরো জীবনই এখানে কেটেছে—শৈশব, যৌবন এবং এখন বার্ধক্য,” বলেন তিনি।
সিনেমা, আবরা আর ছোট ছোট আনন্দ
সেই সময় জীবন ছিল অনেক সরল। বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল সিনেমা দেখা। পরিবারটি নাসির চকে একটি খোলা আকাশের নিচের সিনেমা হলে গিয়ে ‘মুঘল-ই-আজম’ ও ‘গঙ্গা যমুনা’ দেখেছিল।
আজকের শিশুদের কাছে শপিং মল ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন হলেও তখন এমন কোনো ধারণাই ছিল না। জাহিদ খান ও তার ভাইবোনেরা দেইরা ও বুর দুবাই ঘুরে বেড়াতেন, আবরায় চড়ে শহর দেখতেন। অল্প টাকায় কয়েকটি পরিবার একসঙ্গে আবরায় ভ্রমণ করত।
তার ভাই মোহাম্মদ খালিদ স্মরণ করেন, “আমাদের শৈশব ছিল দারুণ। আমরা খুব দুষ্টু ছিলাম।”
তারা নিজেদের চোখের সামনে দুবাইয়ের দ্রুত বিকাশও দেখেছেন। বিশেষ করে ট্রেড সেন্টারের নির্মাণ তাদের কাছে ছিল বিস্ময়কর। খালিদ বলেন, “প্রথমবার ওপরে উঠে নিচে তাকিয়ে মনে হয়েছিল আমি যেন বিমানে বসে আছি।”

জাহাজের সঙ্গে কাটানো জীবন
মোহাম্মদ উমের খান ছিলেন শান্ত স্বভাবের মানুষ। পাকিস্তানে তিনি শিপিং খাতে কাজ শুরু করেছিলেন এবং দুবাইয়েও সেই পেশা চালিয়ে যান।
শ্বশুর তাকে দর্জির দোকানে কাজের প্রস্তাব দিলেও সেলাইয়ের কাজ তার জানা ছিল না। তাই অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিনি পোর্ট রশিদে চাকরি পান। কর্মস্থলে পৌঁছাতেও তখন আবরা ও ট্রাক ব্যবহার করতে হতো।
দিনের ১২ ঘণ্টা তিনি কাজ করতেন। ভোরে বের হওয়ার সময় সন্তানরা ঘুমিয়ে থাকত, আর রাতে ফিরে আসার সময়ও তারা ঘুমিয়েই থাকত।
তিনি বলেন, “আমার জীবন ছিল শুধু কাজ, কাজ আর কাজ।”
পরে তিনি সি-ল্যান্ডে চাকরি করেন। অফিস থেকে বেরিয়ে পোর্ট রশিদে ঢোকা জাহাজ দেখতেন এবং ছাদে উঠে কনটেইনার আসা-যাওয়া পর্যবেক্ষণ করতেন।
নতুন অধ্যায়
১৯৯৬ সালে মোহাম্মদ উমের খান নিজের লজিস্টিকস ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে পুরো পরিবারই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
তবে সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এবং ২০০০ সালের শুরুতে তারা আজমান ও দুবাইয়ের মধ্যে বসবাস করতেন। একসময় পরিবারের সবার জন্য ছিল মাত্র একটি গাড়ি। কখনও কখনও প্রচণ্ড গরমে কারামা থেকে বুর দুবাই পর্যন্ত হেঁটেও অফিসে যেতে হয়েছে।

কঠোর পরিশ্রমের ফল অবশ্য এসেছে। ব্যবসা ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। এখন পরিবারের সদস্যরা লজিস্টিকস ও সম্পত্তি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
জাহিদ বলেন, “আজমানে আমাদের পারিবারিক বাড়ি আছে। পরে আমরা ভাইয়েরা এখানে চলে আসি। গত বছর এই ভিলাটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং বাবা-মাকেও এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।”
ঈদের বদলে যাওয়া চিত্র
ষাটের দশকে ঈদ ছিল অনেকটাই নিরিবিলি। পরিবারটি ঘরে বসেই খাবার খেত, বিশেষ কোনো বড় আয়োজন থাকত না।
কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। খালিদের বাড়িতে ঈদের সময় ২০০ জনেরও বেশি অতিথির সমাগম ঘটে। বাড়ি ভরে যায় হাসি, আনন্দ আর নানান খাবারে, যার মধ্যে বিরিয়ানি অবশ্যই থাকে।
একসময় যে পরিবার নতুন জীবন খুঁজতে করাচি থেকে দুবাই এসেছিল, আজ তারা পাঁচ প্রজন্মের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার গড়ে তুলেছে। আর সেই গল্পের নীরব সাক্ষী হয়ে এখনও টেবিলের ওপর পড়ে আছে দুটি পুরোনো পাসপোর্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















