মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ইতিহাসে যুদ্ধবিরতি কখনোই কেবল যুদ্ধ থামানোর চুক্তি নয়; এটি আসলে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, সামরিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি পরীক্ষা। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নতুন মার্কিন-মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিও সেই পরীক্ষার বাইরে নয়। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, এই সমঝোতা যতটা শান্তির প্রতিশ্রুতি বহন করছে, তার চেয়ে বেশি বহন করছে অনিশ্চয়তার ভার।
চুক্তির ঘোষণার মাত্র একদিন পরই দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা এবং হতাহতের ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা এখনও একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কাগজে-কলমে সমঝোতা হলেও মাটিতে অস্ত্রের ভাষা এখনও থামেনি। এ কারণেই লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই উদ্যোগকে দেশের জন্য “শেষ সুযোগ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে শুধু কূটনৈতিক আশাবাদ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার গভীর উদ্বেগও প্রতিফলিত হয়েছে।
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দক্ষিণ লেবাননের নির্দিষ্ট এলাকায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কিছু পরীক্ষামূলক অঞ্চলে লেবাননের সেনাবাহিনী একক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে এবং সেখানে কোনো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকবে না। তাত্ত্বিকভাবে এটি একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব তার নিজস্ব বাহিনীর হাতে থাকা উচিত।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বহু বছর ধরে দক্ষিণ লেবাননের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় হিজবুল্লাহ একটি প্রভাবশালী শক্তি। তাদের উপস্থিতি শুধু সামরিক নয়; সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে এমন একটি পরিকল্পনা, যেখানে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে, সেটি কার্যকর করতে গেলে কেবল প্রশাসনিক সক্ষমতাই নয়, রাজনৈতিক ঐকমত্যও প্রয়োজন।
সেখানেই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়। হিজবুল্লাহ এই ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনের নেতা নাইম কাসেমের বক্তব্যে পরিষ্কার যে তাদের কাছে মূল প্রশ্ন হলো ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার। তাদের দৃষ্টিতে আংশিক ব্যবস্থা বা ধাপে ধাপে নিরাপত্তা পুনর্বিন্যাস কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। অন্যদিকে ইসরায়েলের অবস্থানও সমানভাবে অনমনীয়। তারা মনে করে, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া এবং তাদের নিরস্ত্রীকরণ অপরিহার্য।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্র অত্যন্ত সংকীর্ণ। এক পক্ষ অস্ত্র ত্যাগের কথা শুনতে প্রস্তুত নয়, অন্য পক্ষ অস্ত্রধারী প্রতিপক্ষকে মেনে নিতে রাজি নয়। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মূল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সংঘাতের আঞ্চলিক মাত্রা। লেবাননের পরিস্থিতি এখন আর শুধু লেবাননের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে ঘিরে বৃহত্তর কৌশলগত সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের চলমান যোগাযোগ, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে এই যুদ্ধবিরতির সঙ্গে যুক্ত।

তবে নতুন চুক্তির ভাষা ইঙ্গিত দেয় যে লেবাননকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হতে না দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা। কারণ লেবাননের ভবিষ্যৎ যদি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়, তাহলে দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তবু আশাবাদের কিছু কারণ আছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহে যে মাত্রার সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, তার তুলনায় উভয় পক্ষের অন্তত আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। কূটনীতি এখনও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। কিন্তু সেটিই যথেষ্ট নয়। একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি তখনই টিকে থাকতে পারে, যখন মাঠের বাস্তবতা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ন্যূনতম সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজকের পরিস্থিতিতে সেই সামঞ্জস্য এখনও অনুপস্থিত। ফলে নতুন চুক্তিকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি বরং একটি সুযোগ—সম্ভবত শেষ বড় সুযোগ—যার মাধ্যমে সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা যেতে পারে। কিন্তু যদি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিজেদের মৌলিক অবস্থান থেকে একচুলও সরে না আসে, তাহলে এই যুদ্ধবিরতি হয়তো ইতিহাসে আরেকটি ক্ষণস্থায়ী বিরতি হিসেবেই স্থান পাবে, স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হিসেবে নয়।
স্টিফেন এন. আর. 


















