দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁ। জেলার সাপাহার, পোরশাসহ বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ বাগানে এখন ঝুলছে মৌসুমের আম। আবহাওয়াজনিত নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কৃষকরা শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত। চলতি মাসের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে জেলার প্রধান জাত আম্রপালি বাজারে আসতে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিপুল উৎপাদনের পরও নওগাঁয় এখনো গড়ে ওঠেনি বড় পরিসরের আম প্রক্রিয়াজাত শিল্প কিংবা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বাড়ছে উৎপাদন, বাড়ছে উদ্বেগ
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমিকের মজুরি ক্রমাগত বাড়লেও বাজারে ন্যায্য দাম নিশ্চিত হয় না। বিশেষ করে মৌসুমের চূড়ান্ত সময়ে বাজারে আমের সরবরাহ বেড়ে গেলে ব্যবসায়ীরা দাম কমিয়ে দেন। এতে কৃষকদের দরকষাকষির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টন। গত বছর ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে চাষ করে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়েছিল।
অল্প সময়ের বাজার, বড় ক্ষতির আশঙ্কা
সাপাহার উপজেলার কুচকুড়িলিয়া গ্রামের আমচাষি রেদওয়ানুর রহমান মুন জানান, আম্রপালি পাকতে শুরু করার পর মাত্র ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তা বিক্রি করতে হয়। এর বেশি সময় গাছে রাখা সম্ভব নয়। ফলে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আম বাজারে এলে দাম কমে যায় এবং কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন।
তার মতে, বৃহৎ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগার বা আমভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলে কৃষকরা এই ক্ষতি থেকে অনেকটাই রক্ষা পেতেন।
এদিকে পোরশা উপজেলার আমইর গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর আবহাওয়া আম চাষের জন্য ততটা অনুকূলে ছিল না। প্রায় সব বাগানেই ফলন কিছুটা কম। গত বছর তিনি মানভেদে প্রতি মণ আম্রপালি ১ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন। তবে এ বছর প্রতি মণ ৩ হাজার টাকার নিচে দাম নেমে গেলে উৎপাদন ব্যয় তোলাই কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তার।
প্রতি বছর শত কোটি টাকার আম অপচয়
সাপাহারকে দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ক্রেতা সেখানে ভিড় করেন।

সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত জানান, এই মৌসুমি বাজারে প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার আম বেচাকেনা হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত সুবিধা না থাকায় মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আম নষ্ট হয়ে যায়। এর আর্থিক মূল্য ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে।
তার মতে, বড় আকারের প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে অতিরিক্ত উৎপাদনের জন্য স্থায়ী বাজার তৈরি হবে, অপচয় কমবে এবং কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই উপকৃত হবেন।
সমাধানে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও সমস্যাটির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল জানান, বিভিন্ন সমন্বয় সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। রপ্তানিযোগ্য মানের আম উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় সাপাহার অঞ্চলে কুলিং হাউস ও প্যাকিং হাউস স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তার মতে, এসব অবকাঠামো গড়ে উঠলে আমের গুণগত মান সংরক্ষণ, ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমানো এবং কৃষকদের লাভজনকতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
উৎপাদন বাড়লেও বাজারজাতকরণের সময়সীমা, সংরক্ষণ সংকট এবং মূল্য অস্থিরতা এখনো নওগাঁর আমচাষিদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কোল্ড-চেইন অবকাঠামো এবং রপ্তানিমুখী সুবিধায় বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















