শৈশবের শুরুতেই মস্তিষ্কের বিকাশের ধরন ভবিষ্যতে কিশোর বয়সে বিষণ্নতার লক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সিঙ্গাপুরে পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছেলে ও মেয়েদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক এক নয়; বরং তাদের মস্তিষ্কের বিকাশের পথ এবং পরবর্তী বিষণ্নতার উপসর্গের ধরন আলাদা হতে পারে।
গবেষণার ফলাফল বলছে, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু কৈশোরের দিকে নজর দিলে চলবে না। বরং শৈশবের প্রথম দিক থেকেই শিশুদের মানসিক দুর্বলতার সম্ভাব্য সংকেত খুঁজে দেখা প্রয়োজন। এতে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মেয়েদের ও ছেলেদের মধ্যে ভিন্ন চিত্র
গবেষণায় দেখা গেছে, মেয়েদের ক্ষেত্রে আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও অনুভূতি প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশগুলোর বিকাশগত পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে মন খারাপ, আত্মসম্মানবোধ কমে যাওয়া এবং বিষণ্নতার মতো উপসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অন্যদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু মস্তিষ্কীয় অঞ্চলের পরিবর্তনের সঙ্গে ক্লান্তি, উদ্যমহীনতা এবং নিজের সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক অনুভূতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, এই পার্থক্য দেখায় যে বিষণ্নতার ঝুঁকি ও প্রকাশভঙ্গি ছেলে ও মেয়েদের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না।

বাড়ছে কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
এই গবেষণা এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন সিঙ্গাপুরে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অক্ষমতা ও মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে মানসিক রোগ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জনস্বাস্থ্যের ওপর মানসিক চাপের প্রভাব সিঙ্গাপুরে সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রায় প্রতি তিনজনের একজন বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং একাকিত্বের মতো মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সমস্যার কথা জানিয়েছে।
কীভাবে পরিচালিত হয়েছে গবেষণা
‘সেক্স-স্পেসিফিক নিউরোডেভেলপমেন্টাল পাথওয়েজ টু ডিপ্রেসিভ সিম্পটমস’ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করে এ-স্টার ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পটেনশিয়াল। এতে অংশ নেয় কেকে উইমেনস অ্যান্ড চিলড্রেনস হসপিটাল, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হেলথ সিস্টেম, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইয়ং লু লিন স্কুল অব মেডিসিন এবং ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা।

গবেষণায় ‘গ্রোয়িং আপ ইন সিঙ্গাপুর টুয়ার্ডস হেলদি আউটকামস’ নামের দীর্ঘমেয়াদি জন্মভিত্তিক গবেষণার তথ্য ব্যবহার করা হয়। এতে ১ হাজার ২০০-এর বেশি মা ও তাদের সন্তানদের গর্ভকাল থেকে শৈশব পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়েছে।
গবেষকেরা ৫৪৯ শিশুর ৯১৭টি মস্তিষ্কের স্ক্যান বিশ্লেষণ করেন। এসব স্ক্যান নেওয়া হয়েছিল শিশুদের সাড়ে চার, ছয় এবং সাড়ে সাত বছর বয়সে।
প্রাথমিক বয়সেই গুরুত্বপূর্ণ সংকেত
গবেষণায় দেখা যায়, সাড়ে চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে মেয়েদের মস্তিষ্কে পরিবর্তনের গতি ছেলেদের তুলনায় বেশি ছিল। পরে ১৩ বছর বয়সে তাদের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গের সঙ্গে সেই বিকাশগত ধারা মিলিয়ে দেখা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, ১৩ বছর বয়সে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি বিষণ্নতার লক্ষণ জানিয়েছে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, একটি মাত্র মস্তিষ্কের স্ক্যান দেখে কারও ভবিষ্যৎ বিষণ্নতা নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে সব ছেলে বা সব মেয়ে একই বিকাশগত পথ অনুসরণ করে না।

তাদের মতে, এই গবেষণা মূলত দেখিয়েছে যে ছেলে ও মেয়েদের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি ভিন্নভাবে গড়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও গবেষণা হলে আগেভাগে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা কৌশল উন্নত করা সম্ভব হবে।
মস্তিষ্কের বিকাশ ও কিশোর বিষণ্নতা
শৈশবের মস্তিষ্কের বিকাশ ও ছেলে-মেয়েদের ভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। গবেষকদের বিশ্বাস, শিশুদের মস্তিষ্ক কীভাবে বিকশিত হয় এবং সেই প্রক্রিয়ায় লিঙ্গভেদে কী পার্থক্য থাকে তা আরও ভালোভাবে বোঝা গেলে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা আরও সময়োপযোগী ও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















