০৯:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
তিন কারখানায় ১,৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই, ঈদের ছুটি শেষে কাজে এসে চাকরি হারানোর অভিযোগ উপসাগরে নতুন উত্তেজনা: কুয়েত-বাহরাইনের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে মে মাসে গণপিটুনিতে ৩১ জন নিহত, ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী-শিশু ফ্রেঞ্চ ওপেনে ইতিহাস গড়ার লড়াই: শিরোপার ফাইনালে মায়া চওয়ালিন্সকা ও মিরা আন্দ্রেয়েভা প্রবাসফেরত যুবককে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে কুপিয়ে হত্যা, গ্রেফতারে অভিযান হাসিনার ১৭ বছরে যত বেড়েছিল, বিএনপির ৩ মাসেই ততটা বেড়েছে গ্যাসের দাম- এন সি পি নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেসের জীবন সংকটে, ফুসফুস প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় মেটে-মারিত হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬১৩ সিলেটে মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৫১ জনের, সর্বোচ্চ মৃত্যু এ বছর তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৩.৪১ শতাংশ পতন, ১১ মাসে আয় ৩৫.৩১ বিলিয়ন ডলার

ভারতের দুর্বল মৌসুমি বায়ু কি বাংলাদেশের বর্ষাকে বদলে দেবে?

দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা শুধু একটি ঋতু নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। কৃষকের বীজ বোনা থেকে শুরু করে নদীর পানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নগরজীবন, এমনকি খাদ্য নিরাপত্তা পর্যন্ত অসংখ্য বিষয় নির্ভর করে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর। তাই প্রতিবছর জুন মাসে বর্ষার আগমন নিয়ে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়, তেমনি উদ্বেগও থাকে—এবার বৃষ্টি কেমন হবে?

এ বছর সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির বেশিরভাগ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে এল নিনো পরিস্থিতির প্রভাব মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম আবহাওয়াগত ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ভারতের এই পূর্বাভাস স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রশ্ন হলো, ভারতের সম্ভাব্য বৃষ্টি ঘাটতি কি বাংলাদেশের জন্যও একই বার্তা বহন করছে?

বর্ষার পথচলা এবং বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশের বর্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন আবহাওয়াগত ঘটনা নয়। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুপ্রবাহ মিলেই বাংলাদেশের মৌসুমি আবহাওয়ার চরিত্র নির্ধারণ করে।

ভারতে মৌসুমি বায়ু সাধারণত কেরালা উপকূল দিয়ে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে উত্তর ও পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। এর একটি শাখা বঙ্গোপসাগর ঘুরে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়ের দিকে আসে। বাংলাদেশের অধিকাংশ বৃষ্টিপাত এই বঙ্গোপসাগরীয় শাখার ওপর নির্ভরশীল।

তাই ভারতের বর্ষার অগ্রগতি ধীর হলে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়া পুরোপুরি ভারতের পরিস্থিতির অনুকরণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ কিংবা গভীর নিম্নচাপ বাংলাদেশের বৃষ্টিপাতকে স্বতন্ত্রভাবে প্রভাবিত করে।

এল নিনো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আবহাওয়াবিদদের আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাকে এল নিনো বলা হয়।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, শক্তিশালী এল নিনোর সময় ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। ফলে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে এবং তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

তবে এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে সমান নয়। কখনও ভারতের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টি কম হলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চল তুলনামূলক ভালো বৃষ্টিপাত পায়। বাংলাদেশের জন্য এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আবহাওয়া আসাম ও মেঘালয়ের বৃষ্টিপাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

২০২৫ সালের মৌসুমী বায়ুর অস্বাভাবিক হিমালয় পেরোনো যাত্রা - প্রথম আলো -  নিউইয়র্ক | Prothom Alo New York

সিলেট অঞ্চলে কী হতে পারে?

বাংলাদেশে বন্যার আলোচনায় সিলেটের নাম প্রায়ই উঠে আসে। কারণ এই অঞ্চলের নদীগুলোর বড় অংশের উৎস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে।

ভারতের আবহাওয়া বিভাগ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা বলেছে। যদি এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকবে।

কিন্তু অন্য একটি ঝুঁকি রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, মৌসুমি বৃষ্টিপাত দীর্ঘ সময় ধরে সমানভাবে না হয়ে স্বল্প সময়ে অত্যন্ত ঘনভাবে নেমে আসে। এর ফলে কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতেই হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।

২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা এখনো সিলেটবাসীর স্মৃতিতে তাজা। তাই শুধু মোট বৃষ্টিপাত নয়, বৃষ্টির সময়কাল এবং তীব্রতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষির সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বাংলাদেশের কৃষি এখনো অনেকাংশে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে আমন ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে সময়মতো বর্ষার আগমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি বর্ষা দেরিতে আসে, তাহলে বীজতলা প্রস্তুতি এবং চারা রোপণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, যা উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে।

অন্যদিকে অতিবৃষ্টিও সমান ক্ষতিকর। অনেক সময় কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে কৃষিজমি প্লাবিত হয়, চারা নষ্ট হয় এবং রোগবালাই বৃদ্ধি পায়।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনিশ্চয়তা। আগে কৃষকরা মৌসুমের একটি নির্দিষ্ট ছন্দের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। এখন সেই ছন্দ ক্রমশ বদলে যাচ্ছে।

শহরের জন্য জলাবদ্ধতার নতুন বাস্তবতা

অনেকের ধারণা, দুর্বল মৌসুমি বায়ু মানেই কম বৃষ্টি। বাস্তবে বিষয়টি সবসময় এমন নয়।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে। মোট বৃষ্টিপাত হয়তো কিছুটা কম হতে পারে, কিন্তু সেই বৃষ্টি কম দিনের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়তে পারে।

ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা বরিশালের মতো শহরগুলোতে স্বল্প সময়ে প্রবল বর্ষণ দেখা দিতে পারে। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই বড় ধরনের জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।

শহর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ভবিষ্যতের নগর ব্যবস্থাপনায় শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বরং চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোর জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে।

২০২৫ সালের মৌসুমি বায়ুর অস্বাভাবিক হিমালয় পেরোনো যাত্রা - প্রথম আলো -  নিউইয়র্ক | Prothom Alo New York

নদী ও বন্যা পরিস্থিতি

বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর অনেকগুলোর উৎস ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার বৃষ্টিপাত সরাসরি বাংলাদেশের নদী পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে।

যদি ভারতের মধ্যাঞ্চলে বৃষ্টি কম হয়, তাহলে কিছু নদীতে পানিপ্রবাহ কমতে পারে। আবার উত্তর-পূর্ব ভারতে স্বাভাবিক বা অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে পানি দ্রুত বাড়তে পারে।

ফলে একই মৌসুমে দেশের এক অঞ্চলে বন্যা এবং অন্য অঞ্চলে পানির ঘাটতি—দুই ধরনের পরিস্থিতিও দেখা দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে নতুন বর্ষা

বিজ্ঞানীরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষা আগের মতো নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌসুমি বায়ুর আচরণ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

একদিকে দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে হঠাৎ অতিবৃষ্টি—এই দুই চরম অবস্থার মধ্যে দোলাচল বাড়ছে। ফলে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির পুরোনো ধারণাগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশগুলোর একটি। তাই মৌসুমি বায়ুর প্রতিটি পরিবর্তন এখানে সরাসরি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে।

সামনে নজর কোথায়?

আগামী কয়েক সপ্তাহে মৌসুমি বায়ুর গতি, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের সৃষ্টি, উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃষ্টিপাত এবং এল নিনোর শক্তি—এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের বর্ষার প্রকৃত চিত্র।

ভারতে বৃষ্টি ঘাটতির পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে সতর্কবার্তা। তবে বাংলাদেশের জন্য সেটি সরাসরি একই ফলাফল বয়ে আনবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।

বরং বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অনিশ্চয়তা। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও নদীভাঙন, কোথাও জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বর্ষা হতে পারে বৈপরীত্যের এক মৌসুম।

এ কারণেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কৃষি পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির মধ্যে সমন্বয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে এখন শুধু বর্ষার মেঘ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ ছায়াও ভাসছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তিন কারখানায় ১,৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই, ঈদের ছুটি শেষে কাজে এসে চাকরি হারানোর অভিযোগ

ভারতের দুর্বল মৌসুমি বায়ু কি বাংলাদেশের বর্ষাকে বদলে দেবে?

০৭:০৪:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা শুধু একটি ঋতু নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। কৃষকের বীজ বোনা থেকে শুরু করে নদীর পানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নগরজীবন, এমনকি খাদ্য নিরাপত্তা পর্যন্ত অসংখ্য বিষয় নির্ভর করে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর। তাই প্রতিবছর জুন মাসে বর্ষার আগমন নিয়ে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়, তেমনি উদ্বেগও থাকে—এবার বৃষ্টি কেমন হবে?

এ বছর সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির বেশিরভাগ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে এল নিনো পরিস্থিতির প্রভাব মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম আবহাওয়াগত ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ভারতের এই পূর্বাভাস স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রশ্ন হলো, ভারতের সম্ভাব্য বৃষ্টি ঘাটতি কি বাংলাদেশের জন্যও একই বার্তা বহন করছে?

বর্ষার পথচলা এবং বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশের বর্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন আবহাওয়াগত ঘটনা নয়। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুপ্রবাহ মিলেই বাংলাদেশের মৌসুমি আবহাওয়ার চরিত্র নির্ধারণ করে।

ভারতে মৌসুমি বায়ু সাধারণত কেরালা উপকূল দিয়ে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে উত্তর ও পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। এর একটি শাখা বঙ্গোপসাগর ঘুরে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়ের দিকে আসে। বাংলাদেশের অধিকাংশ বৃষ্টিপাত এই বঙ্গোপসাগরীয় শাখার ওপর নির্ভরশীল।

তাই ভারতের বর্ষার অগ্রগতি ধীর হলে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়া পুরোপুরি ভারতের পরিস্থিতির অনুকরণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ কিংবা গভীর নিম্নচাপ বাংলাদেশের বৃষ্টিপাতকে স্বতন্ত্রভাবে প্রভাবিত করে।

এল নিনো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আবহাওয়াবিদদের আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাকে এল নিনো বলা হয়।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, শক্তিশালী এল নিনোর সময় ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। ফলে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে এবং তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

তবে এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে সমান নয়। কখনও ভারতের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টি কম হলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চল তুলনামূলক ভালো বৃষ্টিপাত পায়। বাংলাদেশের জন্য এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আবহাওয়া আসাম ও মেঘালয়ের বৃষ্টিপাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

২০২৫ সালের মৌসুমী বায়ুর অস্বাভাবিক হিমালয় পেরোনো যাত্রা - প্রথম আলো -  নিউইয়র্ক | Prothom Alo New York

সিলেট অঞ্চলে কী হতে পারে?

বাংলাদেশে বন্যার আলোচনায় সিলেটের নাম প্রায়ই উঠে আসে। কারণ এই অঞ্চলের নদীগুলোর বড় অংশের উৎস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে।

ভারতের আবহাওয়া বিভাগ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা বলেছে। যদি এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকবে।

কিন্তু অন্য একটি ঝুঁকি রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, মৌসুমি বৃষ্টিপাত দীর্ঘ সময় ধরে সমানভাবে না হয়ে স্বল্প সময়ে অত্যন্ত ঘনভাবে নেমে আসে। এর ফলে কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতেই হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।

২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা এখনো সিলেটবাসীর স্মৃতিতে তাজা। তাই শুধু মোট বৃষ্টিপাত নয়, বৃষ্টির সময়কাল এবং তীব্রতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষির সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বাংলাদেশের কৃষি এখনো অনেকাংশে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে আমন ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে সময়মতো বর্ষার আগমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি বর্ষা দেরিতে আসে, তাহলে বীজতলা প্রস্তুতি এবং চারা রোপণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, যা উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে।

অন্যদিকে অতিবৃষ্টিও সমান ক্ষতিকর। অনেক সময় কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে কৃষিজমি প্লাবিত হয়, চারা নষ্ট হয় এবং রোগবালাই বৃদ্ধি পায়।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনিশ্চয়তা। আগে কৃষকরা মৌসুমের একটি নির্দিষ্ট ছন্দের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। এখন সেই ছন্দ ক্রমশ বদলে যাচ্ছে।

শহরের জন্য জলাবদ্ধতার নতুন বাস্তবতা

অনেকের ধারণা, দুর্বল মৌসুমি বায়ু মানেই কম বৃষ্টি। বাস্তবে বিষয়টি সবসময় এমন নয়।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে। মোট বৃষ্টিপাত হয়তো কিছুটা কম হতে পারে, কিন্তু সেই বৃষ্টি কম দিনের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়তে পারে।

ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা বরিশালের মতো শহরগুলোতে স্বল্প সময়ে প্রবল বর্ষণ দেখা দিতে পারে। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই বড় ধরনের জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।

শহর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ভবিষ্যতের নগর ব্যবস্থাপনায় শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বরং চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোর জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে।

২০২৫ সালের মৌসুমি বায়ুর অস্বাভাবিক হিমালয় পেরোনো যাত্রা - প্রথম আলো -  নিউইয়র্ক | Prothom Alo New York

নদী ও বন্যা পরিস্থিতি

বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর অনেকগুলোর উৎস ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার বৃষ্টিপাত সরাসরি বাংলাদেশের নদী পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে।

যদি ভারতের মধ্যাঞ্চলে বৃষ্টি কম হয়, তাহলে কিছু নদীতে পানিপ্রবাহ কমতে পারে। আবার উত্তর-পূর্ব ভারতে স্বাভাবিক বা অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে পানি দ্রুত বাড়তে পারে।

ফলে একই মৌসুমে দেশের এক অঞ্চলে বন্যা এবং অন্য অঞ্চলে পানির ঘাটতি—দুই ধরনের পরিস্থিতিও দেখা দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে নতুন বর্ষা

বিজ্ঞানীরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষা আগের মতো নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌসুমি বায়ুর আচরণ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

একদিকে দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে হঠাৎ অতিবৃষ্টি—এই দুই চরম অবস্থার মধ্যে দোলাচল বাড়ছে। ফলে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির পুরোনো ধারণাগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশগুলোর একটি। তাই মৌসুমি বায়ুর প্রতিটি পরিবর্তন এখানে সরাসরি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে।

সামনে নজর কোথায়?

আগামী কয়েক সপ্তাহে মৌসুমি বায়ুর গতি, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের সৃষ্টি, উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃষ্টিপাত এবং এল নিনোর শক্তি—এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের বর্ষার প্রকৃত চিত্র।

ভারতে বৃষ্টি ঘাটতির পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে সতর্কবার্তা। তবে বাংলাদেশের জন্য সেটি সরাসরি একই ফলাফল বয়ে আনবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।

বরং বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অনিশ্চয়তা। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও নদীভাঙন, কোথাও জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বর্ষা হতে পারে বৈপরীত্যের এক মৌসুম।

এ কারণেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কৃষি পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির মধ্যে সমন্বয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে এখন শুধু বর্ষার মেঘ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ ছায়াও ভাসছে।