০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের আরেক যুদ্ধ, আরেক শিক্ষা: বোকামিরও নিজস্ব গতি আছে ভোজ্যতেলের প্যাকেট হবে নির্দিষ্ট মাপে, দাম তুলনা সহজ করতে নতুন নিয়ম ভারতের ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রথম রাজপথে শক্তি প্রদর্শন যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলায় নতুন উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে ড্রোন-কাণ্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র বাংলাদেশ ব্যাংক কেন ডলার কিনছে? রিজার্ভ, বিনিময় হার ও অর্থনীতির ভারসাম্যের গল্প খুলনায় বিশেষ অভিযানে কসাই লিটনসহ গ্রেফতার ৫৯ রাতের মধ্যে ১৮ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত তিন কারখানায় ১,৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই, ঈদের ছুটি শেষে কাজে এসে চাকরি হারানোর অভিযোগ উপসাগরে নতুন উত্তেজনা: কুয়েত-বাহরাইনের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে মে মাসে গণপিটুনিতে ৩১ জন নিহত, ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী-শিশু

মধ্যপ্রাচ্যের আরেক যুদ্ধ, আরেক শিক্ষা: বোকামিরও নিজস্ব গতি আছে

যুদ্ধ শুরু হলে মানুষ সাধারণত দুটি বিপরীত বিশ্বাস একসঙ্গে ধারণ করে। একদিকে তারা বিপদের আশঙ্কা করে, অন্যদিকে মনে করে পরিস্থিতি এতটাই অযৌক্তিক যে তা বেশিদিন চলতে পারে না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এই দ্বিতীয় ধারণাটিই প্রায়শই ভুল প্রমাণিত হয়। কোনো সংঘাত অযৌক্তিক হলেই তা দ্রুত শেষ হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং অনেক সময় রাজনৈতিক ভুল হিসাব, অহংকার, ভুল যোগাযোগ এবং নেতৃত্বের দ্বিধা মিলেই একটি সীমিত সংঘাতকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে টেনে নেয়।

গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে যা ঘটেছে, তা এই বাস্তবতারই আরেক উদাহরণ। যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি, নতুন আলোচনার ঘোষণা, আবার সামরিক হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক চক্রে ঘুরেছে, যেখানে কোনো ঘোষণাকেই চূড়ান্ত বলে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিন শান্তির ইঙ্গিত, পরদিন ধ্বংসের হুমকি; এক সপ্তাহে সমঝোতার সম্ভাবনা, পরের সপ্তাহে নতুন উত্তেজনা। ফলে ঘটনাপ্রবাহের চেয়ে অনিশ্চয়তাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে স্থায়ী বাস্তবতা।

এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করতে গেলে তিনটি প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? এটি শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়; বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম ধমনী। যদি ইরান এমন কোনো ব্যবস্থার দিকে এগোয়, যেখানে প্রণালির ব্যবহার কার্যত তাদের রাজনৈতিক অনুমতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রকৃত সমঝোতা কতদূর সম্ভব? যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরেই। যদি তেহরান সত্যিই অস্ত্রমানের সক্ষমতা থেকে সরে আসে, তবে সামরিক চাপকে সফল বলা যাবে। কিন্তু যদি সংঘাতের শেষে ইরান কেবল সময় কিনে নেয় এবং তার কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখে, তাহলে বিজয়ের প্রচারণা বাস্তবতার সঙ্গে মিলবে না।

তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক বিন্যাস কি সত্যিই গড়ে উঠছে? কয়েক বছর ধরে যে আঞ্চলিক পুনর্গঠনের আলোচনা চলছে, তার মধ্যে সৌদি আরব, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, এমনকি দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও নতুন কাঠামোয় আনার কথা বলা হচ্ছে। যদি তা বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে সাম্প্রতিক যুদ্ধ কেবল সামরিক ঘটনা নয়, বৃহত্তর কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ : সর্বশেষ পরিস্থিতি | জাতীয় | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা  (বাসস)

তবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। আর এখানেই সমস্যার মূল। যুদ্ধক্ষেত্রে ধোঁয়া যতটা বিভ্রান্তি তৈরি করে, আধুনিক রাজনীতিতে তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ অনেক সময় তার চেয়েও বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে এই বাস্তবতা আরও তীব্রভাবে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টরা সাধারণত সংকটের সময়ে প্রস্তুত বক্তৃতা, আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন কিংবা নিয়ন্ত্রিত বার্তার ওপর নির্ভর করতেন। ট্রাম্প তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান, কখনও দিনে বহুবার। এর ফলে নীতিগত অবস্থান, কৌশলগত সংকেত এবং ব্যক্তিগত আবেগ প্রায় একই প্ল্যাটফর্মে মিশে যায়।

সমস্যা শুধু বার্তার সংখ্যা নয়; সমস্যা তার দিক পরিবর্তনের গতিতে। এক পোস্টে চরম সামরিক হুমকি, পরের পোস্টে শান্তি আলোচনার প্রশংসা। একদিন আক্রমণের ঘোষণা, পরদিন স্থগিতাদেশ। এই ধারাবাহিক ওঠানামা মিত্র, প্রতিপক্ষ এবং সাধারণ পর্যবেক্ষক—সবার জন্যই বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা কঠিন করে তোলে।

তবে ট্রাম্পকে ব্যতিক্রমী মনে হলেও, বৃহত্তর চিত্রটি খুব একটা নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে একটি পুনরাবৃত্ত ধারা দেখা যায়। যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু তা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। প্রায় সব প্রেসিডেন্টই স্থলবাহিনী মোতায়েনের রাজনৈতিক মূল্য এড়িয়ে বিমান শক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অথবা সীমিত সামরিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে চেয়েছেন। প্রত্যেকেই আশা করেছেন যে প্রতিপক্ষ দ্রুত নতি স্বীকার করবে। কিন্তু প্রতিপক্ষও সাধারণত নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সমানভাবে দৃঢ় থাকে।

ফলে সংঘাতের চক্র তৈরি হয়: আঘাত, অপেক্ষা, আলোচনা, হতাশা, নতুন চাপ, আবার আলোচনা। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও সেই পুরোনো ছকের বাইরে নয়।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে। যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই হরমুজ প্রণালি জোরপূর্বক খুলে দিতে চেয়েছিল? যদি চেয়ে থাকে, তাহলে কেন শেষ পর্যন্ত সেই পথ বেছে নেয়নি? সম্ভাব্য উত্তরটি নতুন নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতারা প্রায়ই যুদ্ধের মানবিক ও রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। নিহত সেনাদের কফিন, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জড়ানো, জনমতের পরিবর্তন—এসব বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত কৌশলগত পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলে।

সুতরাং এই সংঘাতের গল্প কেবল ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের নয়। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগে যুদ্ধ পরিচালনার গল্পও। আমরা প্রায়ই বিশ্বাস করতে চাই যে অযৌক্তিক কোনো পরিস্থিতি বেশিদিন টিকবে না। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা ভিন্ন। অনেক সময় সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় কারণ সংশ্লিষ্ট সবাই ভুল করে, দ্বিধায় ভোগে অথবা বাস্তবতার চেয়ে নিজেদের বর্ণনায় বেশি বিশ্বাস করে।

এ কারণেই আজকের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা যুদ্ধের ময়দান থেকে নয়, রাজনৈতিক আচরণ থেকে আসে। কারণ বোকামি কখনও কখনও পরাজিত হয় না; বরং পরিস্থিতিকে নিজের মতো করে গড়ে নেয়। আর যখন আমরা প্রতিটি ঘোষণা, প্রতিটি হুমকি এবং প্রতিটি প্রতিশ্রুতিকে যাচাই না করেই সত্য বলে ধরে নিই, তখন সেই বোকামির অংশীদার হয়ে পড়ি আমরাও।

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের আরেক যুদ্ধ, আরেক শিক্ষা: বোকামিরও নিজস্ব গতি আছে

মধ্যপ্রাচ্যের আরেক যুদ্ধ, আরেক শিক্ষা: বোকামিরও নিজস্ব গতি আছে

০৮:০০:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

যুদ্ধ শুরু হলে মানুষ সাধারণত দুটি বিপরীত বিশ্বাস একসঙ্গে ধারণ করে। একদিকে তারা বিপদের আশঙ্কা করে, অন্যদিকে মনে করে পরিস্থিতি এতটাই অযৌক্তিক যে তা বেশিদিন চলতে পারে না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এই দ্বিতীয় ধারণাটিই প্রায়শই ভুল প্রমাণিত হয়। কোনো সংঘাত অযৌক্তিক হলেই তা দ্রুত শেষ হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং অনেক সময় রাজনৈতিক ভুল হিসাব, অহংকার, ভুল যোগাযোগ এবং নেতৃত্বের দ্বিধা মিলেই একটি সীমিত সংঘাতকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে টেনে নেয়।

গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে যা ঘটেছে, তা এই বাস্তবতারই আরেক উদাহরণ। যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি, নতুন আলোচনার ঘোষণা, আবার সামরিক হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক চক্রে ঘুরেছে, যেখানে কোনো ঘোষণাকেই চূড়ান্ত বলে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিন শান্তির ইঙ্গিত, পরদিন ধ্বংসের হুমকি; এক সপ্তাহে সমঝোতার সম্ভাবনা, পরের সপ্তাহে নতুন উত্তেজনা। ফলে ঘটনাপ্রবাহের চেয়ে অনিশ্চয়তাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে স্থায়ী বাস্তবতা।

এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করতে গেলে তিনটি প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? এটি শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়; বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম ধমনী। যদি ইরান এমন কোনো ব্যবস্থার দিকে এগোয়, যেখানে প্রণালির ব্যবহার কার্যত তাদের রাজনৈতিক অনুমতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রকৃত সমঝোতা কতদূর সম্ভব? যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরেই। যদি তেহরান সত্যিই অস্ত্রমানের সক্ষমতা থেকে সরে আসে, তবে সামরিক চাপকে সফল বলা যাবে। কিন্তু যদি সংঘাতের শেষে ইরান কেবল সময় কিনে নেয় এবং তার কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখে, তাহলে বিজয়ের প্রচারণা বাস্তবতার সঙ্গে মিলবে না।

তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক বিন্যাস কি সত্যিই গড়ে উঠছে? কয়েক বছর ধরে যে আঞ্চলিক পুনর্গঠনের আলোচনা চলছে, তার মধ্যে সৌদি আরব, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, এমনকি দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও নতুন কাঠামোয় আনার কথা বলা হচ্ছে। যদি তা বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে সাম্প্রতিক যুদ্ধ কেবল সামরিক ঘটনা নয়, বৃহত্তর কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ : সর্বশেষ পরিস্থিতি | জাতীয় | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা  (বাসস)

তবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। আর এখানেই সমস্যার মূল। যুদ্ধক্ষেত্রে ধোঁয়া যতটা বিভ্রান্তি তৈরি করে, আধুনিক রাজনীতিতে তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ অনেক সময় তার চেয়েও বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে এই বাস্তবতা আরও তীব্রভাবে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টরা সাধারণত সংকটের সময়ে প্রস্তুত বক্তৃতা, আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন কিংবা নিয়ন্ত্রিত বার্তার ওপর নির্ভর করতেন। ট্রাম্প তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান, কখনও দিনে বহুবার। এর ফলে নীতিগত অবস্থান, কৌশলগত সংকেত এবং ব্যক্তিগত আবেগ প্রায় একই প্ল্যাটফর্মে মিশে যায়।

সমস্যা শুধু বার্তার সংখ্যা নয়; সমস্যা তার দিক পরিবর্তনের গতিতে। এক পোস্টে চরম সামরিক হুমকি, পরের পোস্টে শান্তি আলোচনার প্রশংসা। একদিন আক্রমণের ঘোষণা, পরদিন স্থগিতাদেশ। এই ধারাবাহিক ওঠানামা মিত্র, প্রতিপক্ষ এবং সাধারণ পর্যবেক্ষক—সবার জন্যই বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা কঠিন করে তোলে।

তবে ট্রাম্পকে ব্যতিক্রমী মনে হলেও, বৃহত্তর চিত্রটি খুব একটা নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে একটি পুনরাবৃত্ত ধারা দেখা যায়। যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু তা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। প্রায় সব প্রেসিডেন্টই স্থলবাহিনী মোতায়েনের রাজনৈতিক মূল্য এড়িয়ে বিমান শক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অথবা সীমিত সামরিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে চেয়েছেন। প্রত্যেকেই আশা করেছেন যে প্রতিপক্ষ দ্রুত নতি স্বীকার করবে। কিন্তু প্রতিপক্ষও সাধারণত নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সমানভাবে দৃঢ় থাকে।

ফলে সংঘাতের চক্র তৈরি হয়: আঘাত, অপেক্ষা, আলোচনা, হতাশা, নতুন চাপ, আবার আলোচনা। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও সেই পুরোনো ছকের বাইরে নয়।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে। যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই হরমুজ প্রণালি জোরপূর্বক খুলে দিতে চেয়েছিল? যদি চেয়ে থাকে, তাহলে কেন শেষ পর্যন্ত সেই পথ বেছে নেয়নি? সম্ভাব্য উত্তরটি নতুন নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতারা প্রায়ই যুদ্ধের মানবিক ও রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। নিহত সেনাদের কফিন, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জড়ানো, জনমতের পরিবর্তন—এসব বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত কৌশলগত পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলে।

সুতরাং এই সংঘাতের গল্প কেবল ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের নয়। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগে যুদ্ধ পরিচালনার গল্পও। আমরা প্রায়ই বিশ্বাস করতে চাই যে অযৌক্তিক কোনো পরিস্থিতি বেশিদিন টিকবে না। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা ভিন্ন। অনেক সময় সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় কারণ সংশ্লিষ্ট সবাই ভুল করে, দ্বিধায় ভোগে অথবা বাস্তবতার চেয়ে নিজেদের বর্ণনায় বেশি বিশ্বাস করে।

এ কারণেই আজকের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা যুদ্ধের ময়দান থেকে নয়, রাজনৈতিক আচরণ থেকে আসে। কারণ বোকামি কখনও কখনও পরাজিত হয় না; বরং পরিস্থিতিকে নিজের মতো করে গড়ে নেয়। আর যখন আমরা প্রতিটি ঘোষণা, প্রতিটি হুমকি এবং প্রতিটি প্রতিশ্রুতিকে যাচাই না করেই সত্য বলে ধরে নিই, তখন সেই বোকামির অংশীদার হয়ে পড়ি আমরাও।