০১:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬
ইরানের সম্পদ ব্যবহার করে উপসাগরীয় মিত্রদের ক্ষতিপূরণে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা, বাড়ছে নতুন উত্তেজনা ইতিহাসের ছায়া, ভবিষ্যতের ঝুঁকি: মহাশক্তির প্রতিযোগিতা কি আবার বিশ্বকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? ফেনীতে মোটরসাইকেল আরোহীর রহস্যজনক মৃত্যু, দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা, বলল নয়াদিল্লি বগুড়ার বাংলি নদী থেকে স্কুলছাত্রের মরদেহ উদ্ধার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এনসিপির বৈঠক, রোহিঙ্গা সংকট ও সহযোগিতা জোরদারে আলোচনা নড়াইলে যাত্রীবাহী বাস উল্টে আহত ২০, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যুদ্ধের আগুনে গড়া নতুন ইরান: বিপ্লবের রাষ্ট্র থেকে জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্রে রূপান্তর বার্ধক্য উল্টে দেওয়ার দাবিতে বিপুল বিনিয়োগ, ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার পেল জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইরানের সম্পদ ব্যবহারের চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রের, যুদ্ধবিরতি ঘিরে নতুন উত্তেজনা

জাহাজভাঙা শিল্পে সংস্কার, সাগরে ফিরছে সীতাকুণ্ডের জলদাসদের হারানো জীবন

সাগরই ছিল তাদের পরিচয়, জীবিকা আর জীবনযাপনের কেন্দ্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাছ ধরে জীবন কাটিয়েছে সীতাকুণ্ডের জলদাস সম্প্রদায়। কিন্তু জাহাজভাঙা শিল্পের বিস্তার, দূষণ এবং মাছের সংকট তাদের সেই ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। একসময় যারা সাগরে জাল ফেলতেন, তারাই জীবিকার তাগিদে জাহাজ কাটার শ্রমিকে পরিণত হন। এখন দীর্ঘদিন পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। পরিবেশগত সংস্কার ও কঠোর নিয়ম বাস্তবায়নের ফলে সাগর আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে, আর জলদাসরাও ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছেন তাদের পুরোনো পেশায়।

ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে জীবিকার পরিবর্তন
সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা হরিকমল একসময় ছিলেন জেলে। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় তার জীবন পুরোপুরি বদলে দেয়। ঝড়ে তিনি হারান পরিবারের সদস্যদের, ধ্বংস হয়ে যায় ঘরবাড়ি। একই সময়ে উপকূলীয় পানিতে মাছের পরিমাণ কমতে শুরু করে।

জাহাজভাঙা কারখানার তেল, গ্রিজ ও বিভিন্ন বর্জ্যে দূষিত হতে থাকে সমুদ্রের পরিবেশ। মাছ ধরা আর লাভজনক থাকেনি। বাধ্য হয়ে তিনি জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার মতো আরও অনেক জলদাস পরিবারও একই পথে হাঁটে।

সমুদ্রের মানুষ থেকে জাহাজভাঙার শ্রমিক
বছরের পর বছর ধরে জাহাজভাঙা শিল্পে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়েছে। দুর্ঘটনা, বিস্ফোরণ, ভারী ধাতব অংশের নিচে চাপা পড়া এবং অঙ্গহানির ঘটনা ছিল নিয়মিত। অনেক শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, আবার অনেকে সামান্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে জীবন চালাতে বাধ্য হয়েছেন।

শিল্পটি সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক আসতে শুরু করেন। নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ডের অভাব দীর্ঘদিন ধরে এই খাতকে বিতর্কিত করে রেখেছিল।

বদলে যাচ্ছে উপকূলের চিত্র
এখন সীতাকুণ্ডের উপকূলের দৃশ্য অনেকটাই ভিন্ন। যেখানে আগে ধাতব বর্জ্য, তেল আর গ্রিজে ভরা ছিল সৈকত, সেখানে আবার ঘাস গজাতে শুরু করেছে। বাতাসে তেলের গন্ধের বদলে ফিরেছে সাগরের স্বাভাবিক গন্ধ।

জাহাজভাঙা শিল্পে আধুনিক নিয়ম চালু হওয়ার ফলে অনেক পুরোনো শ্রমিক কাজ হারালেও কর্মপরিবেশ আগের তুলনায় অনেক নিরাপদ হয়েছে। এখন কারখানাগুলোতে তদারকির জন্য প্রকৌশলী ও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা রয়েছেন। দুর্ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

হরিকমলও আর জাহাজভাঙা কারখানায় কাজ করেন না। তবে তিনি এতে হতাশ নন। কারণ এর ফলে তিনি আবার মাছ ধরার পেশায় ফিরতে পেরেছেন।

জাহাজ ভাঙা শিল্প: পাকিস্তান-তুরস্কের অগ্রগতিতে চাপে ভারত, শীর্ষস্থান ধরে  রেখেছে বাংলাদেশ

মাছ ফিরছে, ফিরছে জীবিকাও
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, ধীরে ধীরে মাছের সংখ্যা বাড়ছে। আগের মতো প্রচুর না হলেও জীবিকা নির্বাহের মতো মাছ এখন পাওয়া যাচ্ছে। উপকূলের পরিবেশও আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

সামুদ্রিক পরিবেশ নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের দূষণে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে দূষণ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও উদ্ভিদ আবার ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। যদিও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হতে আরও সময় লাগবে।

সংস্কারের মূল্য
একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলে প্রায় ১৫০টি জাহাজভাঙা কারখানা ছিল। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে সক্ষম এমন মাত্র ১৭টি কারখানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন পরিবেশ ও নিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

এর ফলে হাজারো শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন বা পেশা পরিবর্তন করেছেন। একই সঙ্গে জাহাজ আমদানিও কমেছে। আগে একটি জাহাজ ভাঙতে যেখানে কয়েক মাস লাগত, এখন নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন করতে অনেক বেশি সময় লাগে।

তবে স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করেন, মানবিক কর্মপরিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য এই পরিবর্তন জরুরি ছিল। অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল মিলবে।

প্রকৃতি ও মানুষের নতুন সমঝোতা
সীতাকুণ্ডের উপকূলে এখনও জাহাজভাঙা শিল্প রয়েছে। তবে সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে ফিরছে প্রকৃতির ভারসাম্যও। জলদাস সম্প্রদায়ের অনেকেই আবার মাছ ধরার পেশায় ফিরছেন। তাদের কাছে এটি শুধু জীবিকার বিষয় নয়, নিজেদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার গল্প।

সাগরের সঙ্গে যে সম্পর্ক কয়েক দশক আগে ছিন্ন হতে বসেছিল, এখন তা আবার নতুন করে গড়ে উঠছে। আর সেই পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে আছে সীতাকুণ্ডের উপকূল।

সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পে পরিবেশগত সংস্কারের ফলে উপকূলের পরিবেশ উন্নত হচ্ছে, ফিরছে মাছ ও জলদাস সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের সম্পদ ব্যবহার করে উপসাগরীয় মিত্রদের ক্ষতিপূরণে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা, বাড়ছে নতুন উত্তেজনা

জাহাজভাঙা শিল্পে সংস্কার, সাগরে ফিরছে সীতাকুণ্ডের জলদাসদের হারানো জীবন

১১:৩০:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

সাগরই ছিল তাদের পরিচয়, জীবিকা আর জীবনযাপনের কেন্দ্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাছ ধরে জীবন কাটিয়েছে সীতাকুণ্ডের জলদাস সম্প্রদায়। কিন্তু জাহাজভাঙা শিল্পের বিস্তার, দূষণ এবং মাছের সংকট তাদের সেই ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। একসময় যারা সাগরে জাল ফেলতেন, তারাই জীবিকার তাগিদে জাহাজ কাটার শ্রমিকে পরিণত হন। এখন দীর্ঘদিন পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। পরিবেশগত সংস্কার ও কঠোর নিয়ম বাস্তবায়নের ফলে সাগর আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে, আর জলদাসরাও ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছেন তাদের পুরোনো পেশায়।

ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত থেকে জীবিকার পরিবর্তন
সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা হরিকমল একসময় ছিলেন জেলে। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় তার জীবন পুরোপুরি বদলে দেয়। ঝড়ে তিনি হারান পরিবারের সদস্যদের, ধ্বংস হয়ে যায় ঘরবাড়ি। একই সময়ে উপকূলীয় পানিতে মাছের পরিমাণ কমতে শুরু করে।

জাহাজভাঙা কারখানার তেল, গ্রিজ ও বিভিন্ন বর্জ্যে দূষিত হতে থাকে সমুদ্রের পরিবেশ। মাছ ধরা আর লাভজনক থাকেনি। বাধ্য হয়ে তিনি জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার মতো আরও অনেক জলদাস পরিবারও একই পথে হাঁটে।

সমুদ্রের মানুষ থেকে জাহাজভাঙার শ্রমিক
বছরের পর বছর ধরে জাহাজভাঙা শিল্পে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়েছে। দুর্ঘটনা, বিস্ফোরণ, ভারী ধাতব অংশের নিচে চাপা পড়া এবং অঙ্গহানির ঘটনা ছিল নিয়মিত। অনেক শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, আবার অনেকে সামান্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে জীবন চালাতে বাধ্য হয়েছেন।

শিল্পটি সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক আসতে শুরু করেন। নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ডের অভাব দীর্ঘদিন ধরে এই খাতকে বিতর্কিত করে রেখেছিল।

বদলে যাচ্ছে উপকূলের চিত্র
এখন সীতাকুণ্ডের উপকূলের দৃশ্য অনেকটাই ভিন্ন। যেখানে আগে ধাতব বর্জ্য, তেল আর গ্রিজে ভরা ছিল সৈকত, সেখানে আবার ঘাস গজাতে শুরু করেছে। বাতাসে তেলের গন্ধের বদলে ফিরেছে সাগরের স্বাভাবিক গন্ধ।

জাহাজভাঙা শিল্পে আধুনিক নিয়ম চালু হওয়ার ফলে অনেক পুরোনো শ্রমিক কাজ হারালেও কর্মপরিবেশ আগের তুলনায় অনেক নিরাপদ হয়েছে। এখন কারখানাগুলোতে তদারকির জন্য প্রকৌশলী ও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা রয়েছেন। দুর্ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

হরিকমলও আর জাহাজভাঙা কারখানায় কাজ করেন না। তবে তিনি এতে হতাশ নন। কারণ এর ফলে তিনি আবার মাছ ধরার পেশায় ফিরতে পেরেছেন।

জাহাজ ভাঙা শিল্প: পাকিস্তান-তুরস্কের অগ্রগতিতে চাপে ভারত, শীর্ষস্থান ধরে  রেখেছে বাংলাদেশ

মাছ ফিরছে, ফিরছে জীবিকাও
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, ধীরে ধীরে মাছের সংখ্যা বাড়ছে। আগের মতো প্রচুর না হলেও জীবিকা নির্বাহের মতো মাছ এখন পাওয়া যাচ্ছে। উপকূলের পরিবেশও আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

সামুদ্রিক পরিবেশ নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের দূষণে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে দূষণ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও উদ্ভিদ আবার ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। যদিও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হতে আরও সময় লাগবে।

সংস্কারের মূল্য
একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলে প্রায় ১৫০টি জাহাজভাঙা কারখানা ছিল। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে সক্ষম এমন মাত্র ১৭টি কারখানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন পরিবেশ ও নিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

এর ফলে হাজারো শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন বা পেশা পরিবর্তন করেছেন। একই সঙ্গে জাহাজ আমদানিও কমেছে। আগে একটি জাহাজ ভাঙতে যেখানে কয়েক মাস লাগত, এখন নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন করতে অনেক বেশি সময় লাগে।

তবে স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করেন, মানবিক কর্মপরিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য এই পরিবর্তন জরুরি ছিল। অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল মিলবে।

প্রকৃতি ও মানুষের নতুন সমঝোতা
সীতাকুণ্ডের উপকূলে এখনও জাহাজভাঙা শিল্প রয়েছে। তবে সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে ফিরছে প্রকৃতির ভারসাম্যও। জলদাস সম্প্রদায়ের অনেকেই আবার মাছ ধরার পেশায় ফিরছেন। তাদের কাছে এটি শুধু জীবিকার বিষয় নয়, নিজেদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার গল্প।

সাগরের সঙ্গে যে সম্পর্ক কয়েক দশক আগে ছিন্ন হতে বসেছিল, এখন তা আবার নতুন করে গড়ে উঠছে। আর সেই পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে আছে সীতাকুণ্ডের উপকূল।

সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পে পরিবেশগত সংস্কারের ফলে উপকূলের পরিবেশ উন্নত হচ্ছে, ফিরছে মাছ ও জলদাস সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা।