গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ নিয়ে আমরা সাধারণত আবহাওয়ার ভাষায় কথা বলি। কত ডিগ্রি তাপমাত্রা, কতদিন ধরে তাপপ্রবাহ চলবে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী কত দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে—আলোচনা সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু শহরের ভেতরে বসবাসকারী মানুষের অভিজ্ঞতা, বিশেষত নারীদের অভিজ্ঞতা, আমাদের বলে যে এই সংকট কেবলমাত্র আবহাওয়ার নয়। এটি সামাজিক বৈষম্য, নগর পরিকল্পনা এবং ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি বাস্তবতা।
একই শহরে বসবাস করলেও সবাই সমানভাবে গরমের শিকার হয় না। শহরের মধ্যবিত্ত বা সচ্ছল নাগরিকের কাছে তাপপ্রবাহ মানে হয়তো বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি, কিছুটা অস্বস্তি বা বাইরে কম বের হওয়া। কিন্তু নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য, বিশেষ করে নারীদের জন্য, গরম একটি সার্বক্ষণিক চাপ, যা তাদের শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, আয় এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুকে প্রভাবিত করে।
অনেক ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি বা নিম্নআয়ের আবাসিক এলাকায় বাড়িগুলো এত ছোট এবং অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলসম্পন্ন যে দিনের তাপ রাতেও বেরিয়ে যেতে পারে না। টিনের ছাদ, কংক্রিটের দেয়াল এবং চারপাশে সবুজের অভাব ঘরগুলোকে তাপ ধরে রাখার যন্ত্রে পরিণত করে। রাত নামার পরও যখন ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নামে না, তখন বিশ্রাম বা ঘুম বিলাসিতায় পরিণত হয়।
এই বাস্তবতার একটি লিঙ্গভিত্তিক মাত্রা রয়েছে। বহু নারী কর্মক্ষেত্রে নয়, ঘরের ভেতরেই দিনের অধিকাংশ সময় কাটান। রান্না, সন্তান দেখাশোনা, বয়স্কদের যত্ন এবং গৃহস্থালির কাজের বড় অংশ এখনও তাদের কাঁধে। ফলে তারা গরম থেকে বাঁচার সুযোগও কম পান। বাইরে গিয়ে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার স্বাধীনতা বা বিকল্প অনেকের নেই। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তাদের ঘরের মধ্যেই আটকে রাখে।
অর্থনৈতিক চাপও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা বহু নারী মৌসুমি বা খণ্ডকালীন কাজের ওপর নির্ভরশীল। তীব্র গরম উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়, কাজের সুযোগ সংকুচিত করে এবং আয় অনিশ্চিত করে তোলে। ফলে তাপপ্রবাহ কেবল স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি জীবিকার সংকটও তৈরি করে।

তবে এই অবস্থাকে শুধুমাত্র বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অনিবার্য ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তন অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কিন্তু শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে মানুষের তৈরি সিদ্ধান্তের ভূমিকাও কম নয়। গত কয়েক দশকে অনেক শহরে সবুজ এলাকা কমেছে, বড় গাছ কাটা হয়েছে, ছায়াহীন সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প বেড়েছে এবং কংক্রিটনির্ভর অবকাঠামো দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। রাস্তা, ভবন, বাসস্টপ বা উন্মুক্ত জনপরিসরের নকশায় তাপ সহনশীলতার বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকেছে।
ফলে শহর নিজেই একটি ‘তাপ ফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। যে স্থাপত্য ও অবকাঠামো মানুষের জীবনকে সহজ করার কথা ছিল, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে গরমকে আরও তীব্র করে তুলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা তাই কেবল প্রকৃতির সৃষ্টি নয়; এটি পরিকল্পনারও ফল।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বায়ুদূষণের মতো বিষয়গুলো জনআলোচনায় যতটা গুরুত্ব পায়, নগর তাপপ্রবাহ ততটা পায় না। অথচ এর প্রভাব সমানভাবে গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি। বিশেষ করে নারীদের অভিজ্ঞতা প্রায়ই পরিসংখ্যানের আড়ালে থেকে যায়। সরকারি নীতি নির্ধারণে তাপমাত্রার গড় হিসাব থাকে, কিন্তু একটি ছোট ঘরে কয়েকজন মানুষের সঙ্গে বসবাস করা একজন কিশোরী রাতে পড়াশোনা করতে পারছে কি না, একজন মা উদ্বেগ ও ক্লান্তিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন কি না—এসব প্রশ্ন খুব কমই উঠে আসে।
এ কারণেই নগর তাপপ্রবাহ নিয়ে আলোচনায় ‘জীবিত অভিজ্ঞতা’কে কেন্দ্রে আনা জরুরি। শহরের বাস্তবতা বোঝার জন্য কেবল আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সেই মানুষদের কথা শোনা, যারা প্রতিদিন এই তাপের মধ্যে জীবনযাপন করেন। বিশেষ করে নারীদের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায় যে তাপপ্রবাহ একটি পরিবেশগত সমস্যা হলেও এর প্রভাব গভীরভাবে সামাজিক।
ভবিষ্যতের শহরকে যদি সত্যিই বাসযোগ্য করতে হয়, তাহলে তাপপ্রবাহকে কেবল জলবায়ু সংকট হিসেবে নয়, ন্যায়বিচার ও সমতার প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে। কারণ গরম সবার ওপর সমানভাবে নেমে এলেও, তার বোঝা সবাই সমানভাবে বহন করে না। আর সেই অসম বোঝার গল্পই আজকের নগর গ্রীষ্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য।
নামিতা ভান্ডার 



















