বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। রপ্তানি আয়ের চার-পঞ্চমাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে, আর কর্মসংস্থান নির্ভর করে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের ওপর। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের তথ্য বলছে, দেশের পোশাক রপ্তানি আবারও চাপের মুখে পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং বেশ কয়েকটি অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি কমেছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা এটিকে সাময়িক ধাক্কা হিসেবে দেখলেও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে।
প্রধান বাজারে কেন কমছে রপ্তানি
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১৭.৩৫ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের ১৮.২৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় কম। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডের মতো বড় বাজারে ৪ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত পতন দেখা গেছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ৭.০২ বিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাজ্যে ৪.০১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। প্রবৃদ্ধি না থাকলেও এই দুই বাজার এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ভোক্তারা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে পোশাক কেনায় সংযমী হয়ে উঠেছেন। অনেক পরিবার এখন পোশাকের পরিবর্তে খাদ্য, জ্বালানি ও আবাসন ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
যুদ্ধ, ভূরাজনীতি ও অনিশ্চয়তার প্রভাব
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থা ও ভোক্তা আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি ব্যয় এবং সরবরাহ ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে বৈশ্বিক পোশাক ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে অথবা আরও সতর্ক ক্রয়নীতি গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে বর্তমানে বড় ব্র্যান্ডগুলো ছোট ছোট অর্ডার দিচ্ছে এবং দ্রুত সরবরাহের ওপর জোর দিচ্ছে। এর ফলে ঐতিহ্যগত বৃহৎ উৎপাদনভিত্তিক মডেলের ওপর নির্ভরশীল অনেক সরবরাহকারী চাপের মুখে পড়েছে।

প্রতিযোগিতায় নতুন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রগতি। ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া কাঁচামালের সহজলভ্যতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি সহায়তার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
শিল্পমালিকদের মতে, আন্তর্জাতিক কিছু বড় ক্রেতা ধীরে ধীরে তাদের সোর্সিং কৌশল বৈচিত্র্যময় করছে। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ থেকে ব্যাপকভাবে অর্ডার সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তবে মূল্য প্রতিযোগিতা, দ্রুত সরবরাহ এবং কাঁচামাল সুবিধার ক্ষেত্রে অন্য দেশগুলো কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ ব্যয় বাড়ছে
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, শ্রম এবং আর্থিক ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে একই হারে মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন এবং সরবরাহব্যবস্থার আধুনিকায়ন এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
অপ্রচলিত বাজারও দুর্বল
একসময় যে অপ্রচলিত বাজারগুলো বাংলাদেশের জন্য আশার আলো ছিল, সেখানেও এখন চাপ দেখা যাচ্ছে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, রাশিয়া ও তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি বাজারে রপ্তানি ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি এখন শুধু পশ্চিমা বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়; এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের ভোক্তা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















