দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাণ শিল্প নতুন এক উত্থানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব কনটেইনার জাহাজ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজের বৈশ্বিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দেশটির শিপইয়ার্ডগুলোতে কাজের চাপও দ্রুত বাড়ছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখা বিদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি এখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
জাহাজশিল্পে নতুন স্বর্ণযুগ
বিশ্ববাজারে জাহাজ নির্মাণে দক্ষিণ কোরিয়া আবারও শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক অর্ডারের বড় অংশ এখন দেশটির নির্মাতাদের হাতে যাচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শিল্পনগরী উলসানকে ঘিরে কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। বড় বড় জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি ক্রেতাদের বিপুল অর্ডার বাস্তবায়নে ব্যস্ত সময় পার করছে।
এই শিল্পের সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি। দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়ছে। একসময় যারা এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই অবসর নিয়েছেন অথবা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে চলে গেছেন।

তরুণদের অনাগ্রহ, বিদেশিদের আগমন
জাহাজ নির্মাণ খাতকে অনেক তরুণ কোরীয় ঝুঁকিপূর্ণ, কষ্টসাধ্য এবং তুলনামূলক কম আয়ের পেশা হিসেবে দেখেন। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই শিল্পে যোগদানের আগ্রহ কমছে। উলসানের মতো শিল্পাঞ্চল থেকেও তরুণদের অন্য খাতে চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এই শূন্যস্থান পূরণে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের। গত এক দশকে জাহাজশিল্পে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বর্তমানে শিল্পটির মোট শ্রমশক্তির প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিদেশি।
দক্ষ কর্মীদের জন্য ভিসা নীতিতে পরিবর্তন আনার ফলে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ আরও সহজ হয়েছে। শিল্পমালিকরা বলছেন, তাদের ছাড়া বর্তমান উৎপাদন চাহিদা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।
স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রশ্ন
তবে বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষও দেখা দিচ্ছে। আগে শিফট শেষে শ্রমিকদের ভিড়ে রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও ছোট ব্যবসাগুলো জমজমাট থাকত। এখন অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, সেই চিত্র বদলে গেছে।

অনেক বিদেশি শ্রমিক দেশ ছাড়ার আগেই ভিসা ও নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন খরচের কারণে ঋণের বোঝা নিয়ে আসেন। ফলে তারা উপার্জনের বড় অংশ নিজ দেশে পরিবারকে পাঠিয়ে দেন। স্থানীয়ভাবে ব্যয় করার প্রবণতা তুলনামূলক কম হওয়ায় উপকূলীয় শহরগুলোর ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছে না।
রাজনৈতিক আলোচনায় অভিবাসন
বিদেশি শ্রমিক ইস্যু এখন রাজনৈতিক পর্যায়েও গুরুত্ব পাচ্ছে। কর্মসংস্থান, মজুরি এবং নিয়োগনীতিকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠছে। শ্রমিকদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা এবং স্থানীয়দের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।
এদিকে জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত প্রণোদনা এবং পরিবারসহ দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলছে। তাদের আশা, এতে শ্রমিকরা দেশের ভেতরেই বেশি ব্যয় করবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে।

সামনে কোন পথে দক্ষিণ কোরিয়া?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজশিল্পের বর্তমান সাফল্য অনেকটাই বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের উদ্বেগও উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে।
শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে দক্ষ বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ, মজুরি কাঠামো এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ভারসাম্যও নিশ্চিত করতে হবে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য আগামী দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা খুঁজে বের করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















