চীন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদনশিল্পের শক্তিধর দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। নতুন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কারখানা, শিল্পপার্ক এবং উদ্ভাবনকেন্দ্র গড়ে উঠছে দেশজুড়ে। তবে এই অগ্রগতির সুফল সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না সব অঞ্চলে। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরীণ ও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শহরগুলো এখনো উন্নয়নের মূলধারা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ পশ্চিম চীনের গানসু প্রদেশের তিয়ানশুই শহর। একসময় শিল্পকারখানার জন্য পরিচিত এই শহরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন শিল্পপার্ক, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ এবং বিনিয়োগ সুবিধা দিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এত কিছুর পরও শহরটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি।
প্রযুক্তি এলেও কর্মসংস্থান বাড়েনি

তিয়ানশুইয়ের নতুন কারখানাগুলোতে উন্নত যন্ত্রপাতি ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে সীমিত পরিসরে। অনেক কারখানায় আগের তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা কমে গেছে, জায়গা নিয়েছে রোবট ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যেসব চাকরি রয়েছে সেগুলোর বেতনও তুলনামূলক কম। ফলে তরুণদের বড় অংশ উন্নত সুযোগের খোঁজে সাংহাই, জিয়াংসু বা উপকূলীয় অঞ্চলের বড় শহরগুলোতে চলে যাচ্ছে। গত এক দশকে শহরটির জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
উপকূলীয় শহর ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের বৈষম্য
চীনের প্রযুক্তিখাতের সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে বেইজিং, সাংহাই ও শেনজেনের মতো বড় শহরগুলো। উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষ জনশক্তি এবং শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা এসব শহরকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। গবেষণা ও উন্নয়নভিত্তিক উচ্চ বেতনের চাকরিগুলোও মূলত এসব এলাকাতেই কেন্দ্রীভূত।
অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের অনেক শহরের কাছে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী, গবেষণা অবকাঠামো কিংবা শিল্পসংযোগ নেই। ফলে প্রযুক্তি খাতে জাতীয় অগ্রগতি সত্ত্বেও তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

সম্পত্তি সংকট বাড়াচ্ছে চাপ
প্রযুক্তি শিল্পের পাশাপাশি তিয়ানশুইয়ের মতো শহরগুলোকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে আবাসন বাজারের মন্দাও। বাড়ির দাম কমছে, অনেক আবাসন প্রকল্প অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সম্পত্তি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ফলে খুচরা বিক্রি কমছে, বিপণিবিতান ও রেস্তোরাঁগুলোতে দেখা যাচ্ছে ক্রেতার সংকট। অর্থনৈতিক মন্থরতা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।
শিক্ষায় বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ
চীনের নীতিনির্ধারকেরা এখন বুঝতে শুরু করেছেন যে শুধু কারখানা নির্মাণ অর্থনৈতিক সমস্যার পূর্ণ সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষায় বিনিয়োগই হতে পারে বৈষম্য কমানোর কার্যকর পথ।
কিন্তু তিয়ানশুইয়ের মতো শহরগুলোর আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। ধনী শহরগুলোর তুলনায় শিক্ষাখাতে তাদের ব্যয় অনেক কম। ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জায়গা করে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
উন্নয়নের নতুন প্রশ্ন
চীনের প্রযুক্তি বিপ্লব দেশটির বৈশ্বিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে, এতে সন্দেহ নেই। তবে তিয়ানশুইয়ের মতো শহরগুলোর অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, শুধু প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন দিয়ে সব অঞ্চলের উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া উন্নয়নের সুফল দেশের বড় অংশের মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















