মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বিশ্বের অনেক ভ্রমণপ্রেমী এবার ছুটির গন্তব্য হিসেবে স্পেনকে বেছে নিচ্ছেন। এর ফলে দেশটির পর্যটন খাত নতুন রেকর্ডের দিকে এগোচ্ছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চলতি বছর স্পেনে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ১০ কোটির ঘর ছুঁতে পারে।
পর্যটনে অভাবনীয় উত্থান
কোভিড মহামারির সময় স্পেনের পর্যটননির্ভর শহরগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। তবে সেই ধাক্কা কাটিয়ে দেশটির পর্যটন খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক দেশটি সফর করেন।
ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের জনপ্রিয় শহর বেনিদর্মে এখন আবারও পর্যটকদের ভিড়। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছরও বুকিংয়ের হার আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কিছু দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় স্পেনকে তুলনামূলক নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে দেখছেন ভ্রমণকারীরা।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব
পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অনেক পর্যটক তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে নিরাপদ বলে বিবেচিত দেশগুলোতে ভ্রমণ করেন। বর্তমানে সেই সুবিধা পাচ্ছে স্পেন।
যেসব পর্যটক সাধারণত তুরস্ক, মিসর বা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতেন, তাদের একটি অংশ এখন স্পেনে আসছেন। সরকারি পরিসংখ্যানও এই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশটিতে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি
স্পেনের অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় ১৩ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় অর্থনীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে, যার পেছনে পর্যটনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
তবে জ্বালানি ব্যয়ের সম্ভাব্য বৃদ্ধি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। বিমান ভাড়াসহ ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে গেলে ইউরোপীয়দের বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের ক্ষোভ বাড়ছে
পর্যটন খাতের সাফল্যের পাশাপাশি স্পেনে বাড়ছে স্থানীয়দের অসন্তোষও। বার্সেলোনা, ভ্যালেন্সিয়া, বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ এবং ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ নিয়ে প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটকদের কারণে শহরে ভিড় বাড়ছে, পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আবাসন সংকট। অনেক এলাকায় স্বল্পমেয়াদি পর্যটক আবাসনের বিস্তারের ফলে বাড়িভাড়া দ্রুত বেড়ে গেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বাসস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পর্যটন শিল্প সম্পর্কে আগের মতো ইতিবাচক মনোভাব নেই। তারা মনে করেন, অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি এই খাত তাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা নেতিবাচক প্রভাবও ফেলছে।
সরকারের নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ

পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্পেনের বিভিন্ন শহর প্রশাসন নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে। পর্যটকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি আবাসনের অনুমোদন সীমিত করা হচ্ছে। বার্সেলোনা ইতোমধ্যে ২০২৮ সালের মধ্যে শহরের সব স্বল্পমেয়াদি পর্যটক অ্যাপার্টমেন্টের লাইসেন্স বাতিলের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
এ ছাড়া পর্যটন কর বাড়ানোসহ আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যাতে পর্যটনের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হয়।
ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ
পর্যটন শিল্পের প্রতিনিধিরা স্বীকার করছেন যে পর্যটনের কারণে স্থানীয় জীবনে প্রভাব পড়ে। তবে তাদের মতে, পর্যটকদের স্বাগত জানানোর সংস্কৃতি এবং আতিথেয়তাই স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটনের অর্থনৈতিক সুবিধা বজায় রেখে স্থানীয় জনগণের জীবনমান রক্ষা করার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখন স্পেনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও স্থানীয়দের সমর্থন ছাড়া এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















