বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, সোনা ততই নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আলোচনায় আসে। গত কয়েক বছরে সোনার দামের উল্লম্ফন সেই পরিচিত ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। কিন্তু বাজারের ইতিহাস অন্য একটি প্রশ্নও সামনে আনে—যে সম্পদ এত দ্রুত ওপরে ওঠে, তার কি পরে আরও বড় সংশোধনের মধ্য দিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয়?
সাম্প্রতিক বছরগুলোর সোনার র্যালি ছিল অসাধারণ। ২০২২ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত দাম যে গতিতে বেড়েছে, তা কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বাজারের মনস্তত্ত্বের দিক থেকেও ব্যতিক্রমী। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, সোনার বাজারে দীর্ঘমেয়াদি উত্থানের পর উল্লেখযোগ্য পতনও নতুন কিছু নয়। অতীতের প্রতিটি বড় উত্থানের পরে বিনিয়োগকারীরা এমন এক পর্যায় দেখেছেন, যখন দাম নিচে নেমে গিয়ে বহু বছর ধরে স্থিতি খুঁজেছে।
এই বাস্তবতা থেকেই অনেকে ধারণা করছেন যে জানুয়ারির সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে যে পতন শুরু হয়েছে, তা হয়তো এখনও শেষ হয়নি। প্রশ্ন হলো, এবারও কি আগের মতো একই নিয়ম কার্যকর হবে?
ইতিহাসের শিক্ষা কতটা প্রাসঙ্গিক?
বাজার বিশ্লেষণে অতীতের ধারা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিনিয়োগকারীদের আচরণ, মুনাফা তোলার প্রবণতা এবং মূল্যায়নের সীমা অনেক সময় পুনরাবৃত্ত হয়। সোনার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, বড় উত্থানের পর বাজার সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে থাকে।

তবে কেবল চার্টের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সব সময় যথেষ্ট নয়। কারণ প্রতিটি চক্রের পেছনে থাকা চালিকাশক্তি এক নয়। কোনো সময়ে মুদ্রাস্ফীতির ভয় কাজ করে, কোনো সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি, আবার কোনো সময়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা।
বর্তমান চক্রের বিশেষত্ব হলো, একাধিক শক্তিশালী কারণ একই সময়ে সোনাকে সমর্থন দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ক্রয়, চীন ও ভারতের শক্তিশালী খুচরা চাহিদা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ—সবকিছু একসঙ্গে বাজারকে উপরের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এই সমন্বয় অতীতে খুব কমই দেখা গেছে।
সমর্থনের স্তম্ভগুলো দুর্বল হচ্ছে
তবে সাম্প্রতিক তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সেই শক্তিশালী ভিত্তিগুলোর কিছুটা ক্ষয় শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখনও সোনা কিনছে, কিন্তু আগের মতো আক্রমণাত্মক নয়। একইভাবে চীন ও ভারতে গয়না ও খুচরা পর্যায়ের চাহিদাও কমেছে।
এর একটি বড় কারণ হলো মূল্য নিজেই। সোনার দাম যত বাড়ে, সাধারণ ক্রেতাদের জন্য তা তত কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে বাজারের ঐতিহ্যগত চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই চাপের মুখে পড়ে।

বিনিয়োগ তহবিলগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এক সময় যে অর্থ প্রবাহ সোনাকে দ্রুত ওপরে তুলেছিল, তার গতি এখন অনেক কম। সামগ্রিকভাবে চাহিদার বেশ কয়েকটি সূচক দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও দাম এখনও তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এটাই বর্তমান বাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।
নতুন চালক: সুদের হার ও ভূরাজনীতি
সোনার দামের বর্তমান আচরণ বোঝার জন্য প্রচলিত চাহিদা-সরবরাহ বিশ্লেষণের বাইরে যেতে হচ্ছে। বাজার এখন অনেক বেশি মনোযোগ দিচ্ছে মুদ্রানীতি এবং সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশার দিকে।
বিশেষ করে জ্বালানি বাজারের ওঠানামা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তেলের দাম বাড়লে বিনিয়োগকারীরা উচ্চ সুদের হার দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা করেন। এতে সোনার ওপর চাপ তৈরি হয়। বিপরীতে তেলের দাম কমলে সুদ কমার সম্ভাবনা বাড়ে, যা সোনার জন্য ইতিবাচক।
অর্থাৎ সোনা এখন কেবল নিরাপদ আশ্রয়ের সম্পদ নয়; এটি সুদের হার নিয়ে বাজারের অনুমানেরও প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।
এখানেই আরেকটি জটিলতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে পরিস্থিতি, তেলের বাজারকে প্রভাবিত করছে। আর তেলের বাজারের মাধ্যমে সেই প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে সোনার বাজারেও। ফলে সোনার মূল্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল।
:max_bytes(150000):strip_icc()/GettyImages-1227733211-239834d684e0432788a13c6005fe107a.jpg)
পুরোনো নিয়ম কি বদলে যাচ্ছে?
বাজারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাক্যগুলোর একটি হলো—“এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।” ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে যে বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই এই ধারণার ফাঁদে পড়েন। তবুও বর্তমান পরিস্থিতিকে পুরোপুরি অতীতের সঙ্গে মেলানোও কঠিন।
একদিকে চাহিদার কিছু ঐতিহ্যগত উৎস দুর্বল হচ্ছে। অন্যদিকে ডলারের ভবিষ্যৎ, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ কৌশল এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
ফলে সোনার সামনে দুটি সম্ভাবনা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমটি হলো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি—দীর্ঘমেয়াদি এবং গভীর সংশোধন। দ্বিতীয়টি হলো এমন একটি বাজার কাঠামোর উদ্ভব, যেখানে আগের চক্রগুলোর তুলনায় পতন সীমিত থাকবে।
এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন কোন পথটি শেষ পর্যন্ত বাস্তব হবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: সোনার বাজারকে বোঝার জন্য শুধু অতীতের চার্ট নয়, বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের দামের লড়াই কেবল সোনার নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির দিকনির্দেশনা নিয়েও।
ক্লাইড রাসেল 


















