ভারতের গণতন্ত্রকে প্রায়ই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলা হয়। এই পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক নীতি—প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার। সংবিধান কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে না; এটি নিশ্চিত করতে চায় যে যোগ্য প্রত্যেক নাগরিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারবেন। তাই ভোটার তালিকা তৈরি করার কাজ প্রশাসনিক দায়িত্বের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন।
ভারতের সর্বোচ্চ আদালতকে বহুবার সংবিধানের প্রহরী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ আদালতের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সংবিধানের মৌলিক প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করা। নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু সেই ক্ষমতার লক্ষ্য কখনোই নাগরিকদের বাদ দেওয়া নয়। বরং যোগ্য নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি কাজ করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি হলো নিয়ম, আর বর্জন হলো ব্যতিক্রম। কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলে তার পেছনে স্পষ্ট কারণ থাকতে হবে, নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় থাকতে হবে। অন্যথায় ভোটাধিকার কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা ক্ষুণ্ন হতে পারে।
সম্প্রতি বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর-সংক্রান্ত বিতর্ক এই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে বিহারে পরিচালিত এক পর্যায়ের অনুশীলনের ফলে ২০০৩ সালের ভোটার তালিকার তুলনায় প্রায় ৪৭ লাখ নাম বাদ পড়েছিল। অর্থাৎ প্রতি একশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে প্রায় ছয়জন শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকার বাইরে চলে গিয়েছিলেন। এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ব্যাপক সংকোচনের ইঙ্গিত বহন করে।
আদালত একই সঙ্গে কিছু নীতিগত বিষয়ও স্পষ্ট করেছে। পুরোনো ভোটার তালিকায় নাম থাকা নাগরিকদের ক্ষেত্রে একটি প্রাথমিক গ্রহণযোগ্যতা বা বৈধতার ধারণা প্রযোজ্য। অন্যদিকে যাদের নাম নেই, তাদের নির্দিষ্ট নথির মাধ্যমে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তির যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব হলো কারণ ব্যাখ্যা করে নোটিশ দেওয়া এবং যুক্তিসংগত আদেশ প্রদান করা। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগও থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে তা যাচাইয়ের সুযোগ থাকা জরুরি।
এই প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় একটি বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী বিপুলসংখ্যক নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর বহু নাগরিক আপিল করেন। যদিও মোট বাদ পড়া মানুষের তুলনায় আপিলকারীর সংখ্যা সীমিত ছিল, তবু নিষ্পত্তিকৃত আপিলগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশে আবেদনকারীরা সফল হন এবং তাদের নাম পুনর্বহাল করা হয়।

এই ফলাফল একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। যদি বিচারিক পুনর্বিবেচনার পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ পুনরায় ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পান, তাহলে প্রাথমিক বর্জনের সিদ্ধান্ত কতটা নির্ভুল ছিল? আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যেসব ক্ষেত্রে একই ধরনের কার্যকর পুনর্বিবেচনা হয়নি, সেখানে অনেক নাগরিক হয়তো অন্যায়ভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন?
গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর জনআস্থাও অপরিহার্য। কিন্তু আস্থা কোনো প্রতিষ্ঠানের ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা এবং জবাবদিহিতার ওপর। যখন বিপুলসংখ্যক নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে এবং পরে তার একটি বড় অংশ পুনর্বহালের যোগ্য বলে প্রমাণিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—প্রক্রিয়াটি কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল?
গণতন্ত্রের শক্তি নির্বাচনের দিনে ব্যালট বাক্সে নয়, তার আগেই নির্ধারিত হয় ভোটার তালিকায়। কারণ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অধিকার তখনই অর্থবহ, যখন একজন নাগরিকের নাম তালিকায় থাকে। তাই ভোটার তালিকা সংশোধনের যে কোনো উদ্যোগের সাফল্য কেবল কতজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা দিয়ে মাপা যায় না; বরং মাপা উচিত কতজন যোগ্য নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত রাখা গেছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রশাসনিক দক্ষতার নয়, গণতান্ত্রিক বৈধতার। যদি ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় বড় সংখ্যায় ভুলের সম্ভাবনা থাকে, তবে তার প্রভাব কেবল একটি নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তা নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা এবং গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রভাবিত করে। সেই কারণে ভোটাধিকার রক্ষার প্রতিটি প্রক্রিয়াকে কঠোর পরীক্ষা, স্বাধীন পর্যালোচনা এবং সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে সেখানেই নির্ভর করে।
পি চিদাম্বরম 


















