ইউএনবি
বাংলাদেশের বৃহত্তম ভূ-উপরিস্থ সেচ প্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প পদ্মা নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ার পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের পাম্পিং ব্যবস্থার বড় ধরনের পুনর্নকশা করছে। উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুনর্নকশা পরিকল্পনার আওতায় প্রকল্পটি পানি উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পানির স্তর ৩ দশমিক ৯ মিটার থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ৫ মিটারে নামিয়ে আনতে চায়। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও পাম্পগুলো চালু রাখা সম্ভব হবে বলে ইউএনবিকে জানিয়েছেন জিকে প্রকল্পের পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান।
১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর কমান্ড এলাকা এবং প্রায় ৯৫ হাজার ৫০০ হেক্টর সেচযোগ্য জমি নিয়ে ১৯৬২ সালে চালু হওয়া জিকে প্রকল্প দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি উৎপাদনে এখনও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু পাম্প ও খাল অচল হয়ে পড়ায় প্রকল্পের আওতাভুক্ত সেচ এলাকা কমে বর্তমানে প্রায় ৫৫ হাজার হেক্টরে নেমে এসেছে।

প্রকল্প কর্মকর্তাদের মতে, পদ্মা নদীর পানির স্তর ৪ দশমিক ৫ মিটারের নিচে নেমে গেলেই পাম্প স্টেশনের কার্যক্রম ব্যাহত হতে শুরু করে।
১৯৭৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর নদী ব্যবস্থায় শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
মিজানুর রহমান বলেন, এর প্রভাব বিশেষভাবে স্পষ্ট হয় ২০২৪ সালে, যখন হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে পদ্মা নদীর পানির স্তর চার মিটারের নিচে নেমে যাওয়ায় পাম্প স্টেশন পানি তুলতে পারেনি। ফলে প্রকল্পের অধীন সেচ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “পাম্পগুলো চালানো সম্ভব হয়নি, ফলে প্রকল্প এলাকায় কোনো সেচ সহায়তা দেওয়া যায়নি।”
১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন পুনর্নকশা প্রকল্পটি ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে কম পানির স্তরেও নদী থেকে পানি উত্তোলন সম্ভব হবে এবং মৌসুমি পানিসংকট মোকাবিলায় প্রকল্পের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে মিজানুর রহমান সতর্ক করে বলেন, কেবল প্রকৌশলগত সমাধান যথেষ্ট নাও হতে পারে, যদি উজান থেকে নদীতে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ অব্যাহত না থাকে।

তিনি বলেন, “আমরা যদি ন্যূনতম পরিচালন স্তর প্রায় দেড় মিটার কমাতেও সফল হই, তবু উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি না এলে এর সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে।”
বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাসে জিকে প্রকল্পের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। ১৯৫১ সালে এ প্রকল্পের প্রাথমিক জরিপ শুরু হয় এবং ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়।
উত্তোলন ও মাধ্যাকর্ষণনির্ভর সেচব্যবস্থা হিসেবে পরিকল্পিত এই প্রকল্প গঙ্গা থেকে পানি তুলে বিস্তৃত খাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সেচনির্ভর কৃষির বিস্তার এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রকল্পটি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে।
তবে কয়েক দশক ধরে গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ কমে যাওয়ায় প্রকল্পটি ক্রমবর্ধমান পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উজানে পানির প্রাপ্যতা হ্রাস, ইনটেক চ্যানেলে পলি জমা এবং পুরোনো অবকাঠামো প্রকল্পটির কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।

গবেষণা ও ঐতিহাসিক নথিপত্রে দেখা যায়, প্রকল্পের পাম্পগুলো এমন নদী পরিস্থিতির জন্য নকশা করা হয়েছিল, যা বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমের অনেক সময় আর বিদ্যমান থাকে না।
সম্প্রতি কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ী সফরে সাংবাদিকদের একটি দলকে নেতৃত্ব দেওয়া আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান বলেন, পারস্পরিক সমাধান সম্ভব না হলে গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যুটি জাতিসংঘে উত্থাপন করা উচিত।
জিকে প্রকল্পের সেচ নেটওয়ার্কে শত শত কিলোমিটার খাল ও নিষ্কাশন চ্যানেল রয়েছে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ব্যবস্থার পানি ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ কৃষি অঞ্চলে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ করা হয়।
জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা, উজানের পানি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং ক্রমবর্ধমান সেচ চাহিদার প্রেক্ষাপটে জিকে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক পানি বণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হয়ে থাকবে।
Sarakhon Report 


















