ঘুম নিয়ে আধুনিক মানুষের উদ্বেগ যেন ক্রমেই বাড়ছে। আমরা অনেকেই রাতের শেষে বিছানায় শুয়ে ভাবি—আজ কি যথেষ্ট ঘুম হলো? সাত ঘণ্টা? আট ঘণ্টা? নাকি তারও কম? স্বাস্থ্যবিষয়ক অসংখ্য পরামর্শ, স্মার্ট ডিভাইসের তথ্য আর গবেষণার ফলাফল আমাদের এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে ঘুম নিজেই একটি পরিমাপযোগ্য প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুস্থ থাকার জন্য সত্যিই কি নির্দিষ্ট কোনো ‘জাদুকরী’ ঘুমের সময় আছে?
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বড় গবেষণা আবারও দেখিয়েছে যে খুব কম বা খুব বেশি ঘুম উভয়ই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয়, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য ছয় ঘণ্টা চব্বিশ মিনিট থেকে সাত ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিটের মধ্যে ঘুম সবচেয়ে উপকারী। এর বাইরে গেলে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, যকৃতসহ বিভিন্ন অঙ্গ দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যেতে পারে এবং নানা রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই ফলাফল মোটেও অযৌক্তিক নয়। দীর্ঘদিন ধরেই জানা গেছে যে নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে বহু গবেষণা দেখিয়েছে, জনপ্রিয় ‘আট ঘণ্টা ঘুম’-এর ধারণাটি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। অনেক মানুষের ক্ষেত্রে সাত ঘণ্টার কাছাকাছি ঘুমই যথেষ্ট হতে পারে।
তবে গবেষণার ফলাফলকে সরল সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ারও কারণ নেই। কারণ এই ধরনের গবেষণা সাধারণত সম্পর্ক বা সহসম্পর্ক শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু কারণ নির্ধারণ করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যাঁরা আগে থেকেই অসুস্থ বা শারীরিকভাবে দুর্বল, তাঁরা প্রায়ই বেশি সময় ঘুমান। ফলে বেশি ঘুমকে ক্ষতির কারণ মনে হলেও বাস্তবে অসুস্থতাই হয়তো অতিরিক্ত ঘুমের কারণ। অর্থাৎ কোনটি আগে এবং কোনটি পরে—সেটি সবসময় স্পষ্ট নয়।
আরেকটি সমস্যা হলো ঘুমের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি। বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের অনুমান অনুযায়ী জানান তাঁরা কত ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন। বাস্তবে গত রাতে ঠিক কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন, তা কি আমরা নির্ভুলভাবে বলতে পারি? এই সীমাবদ্ধতা গবেষণার ফল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেয়।
তবু এসব গবেষণা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঘুমকে অবহেলা করা উচিত নয়। কিন্তু এখানেই আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হয়। যদি মানুষ এই বার্তা থেকে এমন ধারণা নেয় যে নির্দিষ্ট সময়ের কম ঘুম মানেই দ্রুত মৃত্যু বা অনিবার্য রোগ, তাহলে সেই উদ্বেগই নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

বিশেষ করে অনিদ্রায় ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিদ্রা শুধু ঘুমের সমস্যা নয়; এটি প্রায়ই উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং অতিরিক্ত আত্মসচেতনতার সঙ্গে জড়িত। কেউ যদি সারাক্ষণ চিন্তা করতে থাকে যে তার ঘুম যথেষ্ট হচ্ছে না এবং এর ফলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে, তাহলে সেই উদ্বেগই তাকে আরও বেশি জাগিয়ে রাখতে পারে। ফলে ঘুমের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ শেষ পর্যন্ত ঘুমের ঘাটতিকেই স্থায়ী করে তোলে।
এই উদ্বেগকে ঘিরে একটি বিশাল বাজারও গড়ে উঠেছে। উন্নত মানের গদি, বিশেষ বালিশ, ভারী কম্বল, সম্পূর্ণ অন্ধকার তৈরির পর্দা, সাদা শব্দ তৈরির যন্ত্র, ঘুম পর্যবেক্ষণকারী স্মার্ট ঘড়ি—সবকিছুই দাবি করে যে তারা আপনার ঘুমকে উন্নত করবে। পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের ওষুধ ও সম্পূরক পণ্য।
সমস্যা হলো, এসব পণ্যের কার্যকারিতা নিয়ে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রায়ই সীমিত। কিছু মানুষের উপকার হতে পারে, কিন্তু সবার ক্ষেত্রে নয়। বরং অনেক সময় ঘুম পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের মধ্যে নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। তারা প্রতিদিনের ঘুমের তথ্য নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে স্বাভাবিক ঘুমের ক্ষমতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ ঘুমের মান উন্নত করার চেষ্টা কখনও কখনও উল্টো ফল দেয়।
ঘুমকে শুধু জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। এটি সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অভ্যাসেরও অংশ। ইতিহাসের বড় অংশজুড়ে মানুষ আজকের মতো নিঃশব্দ, আরামদায়ক এবং ব্যক্তিগত শয়নকক্ষে ঘুমায়নি। আমাদের পূর্বপুরুষেরা খোলা পরিবেশে, অন্যদের সঙ্গে, নানা শব্দের মধ্যে ঘুমাতেন। মাঝরাতে জেগে ওঠাও ছিল অস্বাভাবিক কিছু নয়। আধুনিক যুগে আমরা যে আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশকে স্বাভাবিক মনে করি, মানব ইতিহাসের বিচারে তা খুবই নতুন।
তাই ঘুমের প্রশ্নে সবচেয়ে দরকারি বিষয় হয়তো নিখুঁত সংখ্যার পেছনে ছোটা নয়। বরং নিজের সামগ্রিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকানো। আপনি কি ঘুম নিয়ে মোটামুটি সন্তুষ্ট? দিনের বেলায় কি সতেজ থাকতে পারেন? রাতে দীর্ঘ সময় জেগে থাকতে হয় কি? আপনার ঘুম কি সাধারণভাবে ছয় থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে থাকে? এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় ঘুমের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সংখ্যার চেয়ে বেশি কার্যকর ধারণা দেয়।
যাঁরা ঘুম নিয়ে সংগ্রাম করছেন, তাঁদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ সাধারণত আতঙ্ক বাড়ানো নয়, বরং উদ্বেগ কমানো। নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত আচরণগত চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রেই ওষুধ বা প্রযুক্তির চেয়ে বেশি উপকার দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ঘুম কোনো পরীক্ষার খাতা নয়, যেখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট নম্বর তুলতে হবে। এটি মানুষের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রয়োজন। তাই ঘুমের পরিমাণ নিয়ে অতি হিসাব-নিকাশের বদলে, ঘুম নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা কমানোই হয়তো ভালো ঘুমের প্রথম শর্ত।
ড্যানিয়েল ই. লিবারম্যান 



















