বিশ্ব অর্থনীতি যখন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের অভিঘাত সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন অনেক দেশই সাময়িক সহায়তা, ভর্তুকি এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখছে। কিন্তু সংকটের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আর দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার এক বিষয় নয়। যে অর্থনীতি কেবল রাষ্ট্রের সহায়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে শেষ পর্যন্ত টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন ভিত্তি খুঁজে নিতে হয়। থাইল্যান্ডের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে থাইল্যান্ড হরমুজ সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিগুলোর একটি। তেলের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় দেশটির সরকার ব্যাপক আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এই ধরনের ব্যয় অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ব্যয়ের মূল্য ভবিষ্যতে কে বহন করবে?
সংকটকালে সরকার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু সেই ভূমিকা চিরস্থায়ী নয়। বিশেষ করে যখন সরকারি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন রাষ্ট্রের ব্যয় করার সক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে যায়। থাইল্যান্ড বর্তমানে সেই সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে বাজেট সংকোচন, ব্যয় পুনর্বিন্যাস কিংবা ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠোর করার চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যদি রাষ্ট্র এক ধাপ পিছিয়ে আসে, তাহলে অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে কে?
উত্তরটি সম্ভবত বেসরকারি খাতের মধ্যেই নিহিত।
অনেক বছর ধরেই থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক আলোচনায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এখন এসব আর কেবল উন্নয়নমূলক লক্ষ্য নয়; এগুলো অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে। কারণ ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কম।

এখানে নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও রয়েছে। সংকট প্রায়ই দুর্বলতাকে উন্মোচিত করে, কিন্তু একই সঙ্গে সংস্কারের পথও তৈরি করে। থাইল্যান্ড যদি বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গঠনে গতি আনে, তাহলে বর্তমান সংকটকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা বিন্দুতে পরিণত করা সম্ভব।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় থাইল্যান্ডের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পরিধি এখনও সীমিত। নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়লে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু রপ্তানি বাড়াতে পারবে না, বরং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও উন্নত করবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উৎস হতে পারে।
একইভাবে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতা কমানোও জরুরি। অনেক সময় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয় অনুমোদন, লাইসেন্স কিংবা নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার কারণে। এসব বাধা দূর করা গেলে বিপুল পরিমাণ মূলধন দ্রুত অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অবকাঠামো এবং উচ্চপ্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু নীতিগত সংস্কার যথেষ্ট নয়। আর্থিক ব্যবস্থাকেও এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে বেসরকারি খাত বিনিয়োগে উৎসাহ পায়। যদি সরকার ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়, অথচ ঋণের খরচ বেড়ে যায়, তাহলে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই মুদ্রানীতির একটি সহায়ক ভূমিকা অপরিহার্য। স্বল্প সুদের পরিবেশ এবং ঋণপ্রাপ্তির সহজ সুযোগ উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নেওয়ার সাহস বাড়ায়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। উচ্চ পারিবারিক ঋণের কারণে অনেক অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলো সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু ঝুঁকি মূল্যায়নের আরও আধুনিক ও তথ্যভিত্তিক কাঠামো তৈরি করা গেলে প্রকৃত সক্ষম উদ্যোক্তারা অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারেন। এতে নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা উভয়ই বাড়বে।
থাইল্যান্ডের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি দ্রুত বার্ধক্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি ধীর হয়ে গেলে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে শ্রমের পরিবর্তে পুঁজি, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ বিনিয়োগ শুধু প্রবৃদ্ধির উৎস নয়, জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়াও।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সরকার অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। বরং রাষ্ট্রের ভূমিকা বদলাবে। সরাসরি ব্যয়ের পরিবর্তে সরকারকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ বিকশিত হতে পারে। অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রক সংস্কার, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে, আর প্রবৃদ্ধির মূল গতি আসবে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে।
হরমুজ সংকট একদিন শেষ হবে। তেলের বাজারও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হবে। কিন্তু সেই পরবর্তী অর্থনীতি অতীতের অনুরূপ হবে না। যেসব দেশ এই পরিবর্তনকে সংস্কার ও পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে, তারাই নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে থাকবে। থাইল্যান্ডের সামনে এখন সেই সিদ্ধান্তের মুহূর্ত—রাষ্ট্রনির্ভর প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে কি তারা বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? ভবিষ্যতের উত্তর অনেকটাই সেই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
আরিস ড্যাকানে 



















