দেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন গ্যাসক্ষেত্র তিতাসে গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় জ্বালানি খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের গ্যাস সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই গ্যাসক্ষেত্রের মজুত দ্রুত কমে আসায় ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থিত তিতাস গ্যাসক্ষেত্র প্রায় ছয় দশক ধরে দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতে গ্যাস সরবরাহ করে আসছে। উৎপাদনের দিক থেকে বিবিয়ানার পরই এর অবস্থান। তবে গত কয়েক বছরে উৎপাদনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পাঁচ বছর আগে যেখানে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো, বর্তমানে তা কমে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
মজুত ফুরিয়ে আসার শঙ্কা
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, তিতাসের উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার হয়ে গেছে। ফলে দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তিতাস নয়, দেশের অন্যান্য বড় গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, একটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দীর্ঘদিন উৎপাদন চললে একসময় মজুত কমে আসবে—এটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প উৎস এবং নতুন অনুসন্ধানের প্রস্তুতি আরও আগে থেকেই জোরদার করা প্রয়োজন ছিল।
তাদের মতে, নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হওয়ায় বর্তমানে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার চাপও বাড়ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
গভীর অনুসন্ধানে নতুন আশার আলো
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তিতাসে নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে গভীর অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দেশের স্থলভাগে প্রথম গভীর অনুসন্ধান কূপ হিসেবে তিতাস-৩১ নম্বর কূপে খননকাজ চলছে। এই কূপে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি তিতাস-২৮, তিতাস-২৯ এবং তিতাস-৩০ নম্বর কূপ খননের কাজও এগিয়ে চলছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব প্রকল্প সফল হলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে।
অনুসন্ধান বাড়ানোর তাগিদ
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ ও উদ্যোগ প্রয়োজন। গত এক দশকে কয়েকটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই তুলনামূলক ছোট হওয়ায় জাতীয় চাহিদা পূরণে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারেনি।
তাদের মতে, দেশীয় উৎস থেকে নতুন গ্যাসের মজুত আবিষ্কার করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
১৯৬২ সালে আবিষ্কৃত তিতাস গ্যাসক্ষেত্র বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতারও চার বছর আগে এই ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়েছিল। ছয় দশকের বেশি সময় পরও দেশের জ্বালানি খাতে এর গুরুত্ব অটুট থাকলেও কমে আসা উৎপাদন এখন নতুন চ্যালেঞ্জের বার্তা দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















