ডিমকে সাধারণত একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়। কারণ এটি সস্তা, সহজলভ্য এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ডিম প্রায়শই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস। কিন্তু যখন এই মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম, সরবরাহ ও উৎপাদন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন বিষয়টি আর শুধু কৃষি বা ব্যবসার প্রশ্ন থাকে না; এটি হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, প্রতিযোগিতা এবং জনস্বার্থের প্রশ্ন।
গত কয়েক দশকে থাইল্যান্ডের ডিম শিল্পে এমনই একটি পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় যে খাতটি অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তা ধীরে ধীরে কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপ—প্রজনন স্টক, খাদ্য উৎপাদন, বাচ্চা মুরগি সরবরাহ, বিপণন ও খুচরা বিক্রি—একই করপোরেট কাঠামোর আওতায় চলে আসায় বাজারে প্রতিযোগিতার পরিসর সংকুচিত হয়েছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি আপাতদৃষ্টিতে কারিগরি নীতি: প্যারেন্ট স্টক বা মূল প্রজনন মুরগি আমদানির কোটা ব্যবস্থা। শুরুতে এর উদ্দেশ্য ছিল বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ ঠেকানো এবং মূল্যস্থিতি বজায় রাখা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থাই বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রজনন স্টকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, তারা কার্যত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

যখন বাজারের ভিত্তি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তার প্রভাব উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীন খামারিরা প্রয়োজনীয় বাচ্চা মুরগি সংগ্রহে বাধার মুখে পড়েন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং দরকষাকষির ক্ষমতা কমে আসে। ফলে অনেকেই বাজারের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হন, অন্যথায় ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।
সমস্যা কেবল বাজার কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ব্যবসায়িক চর্চার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে খামারিদের বাচ্চা মুরগির সঙ্গে নির্দিষ্ট খাদ্য, টিকা বা অন্যান্য উপকরণও কিনতে হয়। এর ফলে বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মূল নীতির সঙ্গে এ ধরনের ব্যবস্থা সাংঘর্ষিক।
এই পরিস্থিতির বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের কাঁধেও গিয়ে পড়ে। ডিম সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকার অন্যতম অপরিহার্য উপাদান হলেও অনেক সময় এর দাম এমন পর্যায়ে থাকে, যা নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষত যখন একটি খাদ্যপণ্যকে সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন তার মূল্যবৃদ্ধি সামাজিক বৈষম্যকে আরও প্রকট করে।
এখানে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, থাইল্যান্ড আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক কম দামে ডিম রপ্তানি করতে পারলেও দেশীয় ভোক্তাদের প্রায়ই বেশি মূল্য দিতে হয়। উদ্বৃত্ত উৎপাদন ব্যবস্থাপনার নামে বিভিন্ন প্রণোদনা ও রপ্তানি সহায়তা বাজারকে স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো অভ্যন্তরীণ বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্যকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখার সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে।

অর্থনীতির ভাষায় এটি শুধু অতিরিক্ত মুনাফার প্রশ্ন নয়; এটি সামগ্রিক কল্যাণের ক্ষতির বিষয়। সীমিত প্রবেশাধিকার থেকে যে বিশেষ সুবিধা বা ‘রেন্ট’ তৈরি হয়, তার সুফল পায় অল্প কয়েকজন। বিপরীতে এর ব্যয় বহন করে বৃহত্তর সমাজ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, যখন কোনো শিল্পখাতের প্রধান অংশীজনরাই নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তখন জনস্বার্থ ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায় এবং বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো রক্ষাই হয়ে ওঠে নীতির প্রধান উদ্দেশ্য।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কৃষি খাতে নিয়ন্ত্রণ বা বিধিনিষেধের প্রয়োজন নেই। বরং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হওয়া উচিত বাজারে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত করা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা। স্থিতিশীলতার নামে যদি দক্ষতা, উদ্ভাবন ও ন্যায্যতা বিসর্জন দিতে হয়, তবে সেই স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
সুতরাং প্রয়োজন ধ্বংস নয়, সংস্কার। প্রজনন স্টকে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যাতে সমবায় ও নতুন উদ্যোক্তারাও অংশ নিতে পারে। খামারিদের ওপর অযৌক্তিক বাণিজ্যিক শর্ত আরোপ বন্ধ করতে শক্তিশালী নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলতে হবে, যাতে সেখানে শুধু বড় ব্যবসায়ী নয়, ভোক্তা ও ক্ষুদ্র উৎপাদকদের কণ্ঠও প্রতিফলিত হয়।

অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং প্রতিযোগিতা আইনের কার্যকর প্রয়োগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজারে ক্ষমতার অপব্যবহার সব সময় প্রকাশ্যভাবে ঘটে না; অনেক সময় তা ধীরে ধীরে, অদৃশ্য উপায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ডিমের বাজার নিয়ে এই বিতর্ক আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যখন একটি দেশের সবচেয়ে মৌলিক খাদ্যপণ্যও প্রতিযোগিতাহীন বাজারের প্রভাবে বিকৃত হতে শুরু করে, তখন সেটি কেবল একটি শিল্পখাতের সমস্যা নয়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে অর্থনৈতিক কাঠামোর কোথাও ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। সেই ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা শুধু কৃষক বা ভোক্তার স্বার্থেই নয়, একটি সুস্থ ও ন্যায্য অর্থনীতির স্বার্থেও জরুরি।
কামফোল পানতাকুয়া 



















