০১:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
ফুটবলের নতুন যুগের সূচনা, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ শুরু আজ বাবা-মা হত্যার অভিযোগে কারাগারে, এবার ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থ দাবি পরিচালকের ছেলের নাসির-তামিমার বিয়ে বৈধ, মামলায় খালাস পেলেন দুজনই ইরানে পানির সংকট, মার্কিন হামলায় ২০ হাজার মানুষের দুর্ভোগ কাউন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস, কেন্টে খেলবেন হাসান মাহমুদ জন্মহার কমে সংকটে জাপান, পাঁচ বছরে জনসংখ্যা কমল ৩০ লাখের বেশি গাজায় বন্দি চিকিৎসকের নিঃসঙ্গ কারাবাস নিয়ে উদ্বেগ, ৫০০ দিনের বেশি সময়েও নেই অভিযোগ ইসরায়েলি হামলায় কাঁপছে লেবাননের প্রাচীন শহর টাইর, নিহত ৮ ইরান যুদ্ধ, দুধের প্যাকেট, সার, বিদ্যুৎ, কোভিড-২ ও এবারের বাজেট ১৮ বছর বয়সেই সংসদ সদস্য, জার্সির তরুণ রাজনীতিককে শুভকামনা জানালেন ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধ, দুধের প্যাকেট, সার, বিদ্যুৎ, কোভিড-২ ও এবারের বাজেট

দিল্লির একজন শিল্পপতি ও শিল্প কন্সালটেন্ট। ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেবার জন্য ফোন করলেও প্রায়ই সময় আলোচনা থাকে শিল্পপণ্য ও ডলারের বাজার নিয়ে। মাস খানেক আগে তিনি কুশল জানার জন্য ফোন করার পরে বললেন, ‘আপনাদের ওখানে গত মাসে আমাদের কয়েক মিলিয়ন ডলার অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ব্যবসা হয়েছে। আরও হতে পারতো কিন্তু আপনাদের তো ডলার সংকট

ইরান যুদ্ধের ফলে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল সংকট এখন দুনিয়া জুড়ে। জাপান আপাতত খাবারের প্যাকেজিংয়ের রঙ করা বাদ দিয়ে ও প্যাকেট ছোট করে খরচ বাঁচাচ্ছে। ব্রিটেন এখনও পুরোনো মজুদ থেকে সরবরাহ করে বাজারে মূল্য ঠিক রেখেছে। তবে লন্ডন টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বেশি দিন আর সেটা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ একদিকে চায়না তাদের রফতানি সীমিত করে নিজস্ব প্রয়োজনে মন দিয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ার গ্যাস ক্ষেত্র নষ্ট ও সেখানে উৎপাদিত বিশ্বের প্রয়োজনীয় ৯% অ্যালুমিনিয়াম এবং সারা বিশ্বের উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হরমুজ প্রণালী সংকটের কারণে।

আর এই লেখা যখন লিখছি সে সময়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের খবর অনুযায়ী ১০ জুন থেকে হরমুজ প্রণালী কার্যত পুরোপুরি বন্ধ। আর এর ঘণ্টা কয়েক আগে ব্লুমবার্গ নিউজের এনালিস্ট ডেভিড ফিকলিং লিখেছেনদিল্লিতে ডায়েট কোকের সংকট চলছে অ্যালুমিনিয়াম ক্যান তৈরির সংকটের ফলে।

A Better Way To Recycle Dirty Aluminum Foil

এত কিছু থাকতে অ্যালুমিনিয়াম নিয়ে কেন এত কথা তার নিশ্চয়ই ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না। এর প্রয়োজনীয়তা যেমন সবাই জানেনগাড়ি থেকে দুধচিপসের প্যাকেট অবধি। তবে তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো ইরান যুদ্ধের ইম্প্যাক্ট অর্থনীতির ও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে কত দূর পর্যন্ত আঘাত করেছে।

বাস্তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুটো জেনারেশন পার হবার পরে পৃথিবী যুদ্ধ পরবর্তী ভয়াবহতা অনেকটা ভুলে গিয়েছিল। ইরান যুদ্ধ যে পৃথিবীকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যুদ্ধটি শেষ করার ক্ষমতা এ মুহূর্তে প্রায় কারো হাতে নেই। তাছাড়া ইরানের দাবি প্রতিদিনই বাড়বে। যে কোনো আলোচনায় সে এখন মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব নিতে চাইবে। কারণ যুদ্ধের ভেতর দিয়ে ইরান মৌলবাদী রাষ্ট্রের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হয়ে গেছে। আর মৌলবাদের থেকে জাতীয়তাবাদের শক্তি হাজার গুণ বেশি। তাই এই দীর্ঘ যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতা নিয়েই আগামী অনেকদিন পৃথিবীকে চলতে হবে।

সে চলার পথ কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে তার প্রমাণ একমাসও হয়নি দিল্লির শিল্প কন্সালট্যান্ট বললেনবাংলাদেশে ডলার সংকট থাকায় তারা বাংলাদেশে চাহিদা অনুযায়ী অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েল বিক্রি করতে পারছে না। আর একমাস যেতেই দেখা যাচ্ছে১০ জুন ফিকলিং লিখছেনঅ্যালুমিনিয়ামের সংকটের কারণে দিল্লিতে ডায়েট কোকের ক্যানে তৈরির সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসেও যে সংকট হয়েছে তাও একই দিনে বোঝা গেল- কারণ সে দেশের সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বছরে ৯টি করে এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার কম দামে দিত। ১০ জুন থেকে ৯টির বদলে ৪টি দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব গ্যাস থাকার কারণেও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দিচ্ছে। কারণ ১৫ থেকে ২৫ পার্সেন্ট উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। যার ফলে সিরামিক পণ্যের সর্বোচ্চ দাম যা রাখা যায় চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা মিলে- উৎপাদন খরচ তার থেকে বেড়ে গেছে। তাই বাস্তবতা মেনে তারা শিল্প বন্ধ করছে। ভারতেও গ্যাসের অভাবে প্রচুর সিরামিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এই গ্যাসের সংকটে তাদের ইউরিয়া সার উৎপাদনেও ধাক্কা লেগেছে। যার আলটিমেট ধাক্কা কৃষিতে। যে কারণে বলা হচ্ছে এই কোয়ার্টারে ভারত ৭.৮ তাদের জিডিপি রাখতে পারলেও আগামীতে পারবে না। এটা ৭-এর নিচে নেমে আসবে। কারণ কৃষি থেকে জিডিপিতে ৪ দশমিক দুই বা তিন এরকম আসে তা ৩-এ নেমে আসবে। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন কমে যাবে। ইন্দোনেশিয়া থেকে তারা জি টু জি-তে যে দামে ইউরিয়া আমদানি করছে সে দামটি স্পট বাজারে ইউরিয়া যে দামে বিক্রি হচ্ছে তার থেকে সামান্য কম।

মজুত সার দ্রুত শেষ হয়ে যাবে, বেকায়দায় সরকার

ভারতের কৃষিখাতে ধাক্কা লাগলে বাংলাদেশ তার বাইরে থাকতে পারে না। যে কাঁচা বাজারে ৪০ বছরের ওপর বাজার করিগ্রোসারী দোকানের মালিকানায় এখন পিতার বদলে পুত্র- তাই সম্পর্কটাও গভীর। গত শুক্রবারে তার কাছে একটা উজ্জ্বল রঙের মুগের ডাল দেখে বললামবাপজান, এটা কি ফরিদপুরের ডাল? সে মাথা নিচু করেযাতে অন্য কাস্টমার শুনতে না পায় তারপরে নিম্ম স্বরে বললোস্যার ইন্ডিয়ান ডালভালো হবে না। মুগের ডাল ছাড়া নিরামিষ হয় নাতাই কিনতে হলো আর কিযুদ্ধের সময় তো ভাতের বদলে ফ্যান খায়- তাই সেখানে চাল কড়া না আকড়াডাল ফরিদপুরের স্বাদেভরা না হয়ে ইন্ডিয়ান পেট ভরানো হলেই আর কিকিন্তু ভারতের কৃষি জিডিপি ৩-এ নামার অর্থ তাদের কৃষি উৎপাদন কমবে। বাংলাদেশের বাজারে তার ধাক্কা লাগবে।

বাংলাদেশ যে তা বুঝতে পারেনি তা নয়১০ জুন মরক্কো থেকে মুসুরির ডাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। ক্রয় মূল্য প্রায় ৯০ টাকাতারপরে এই জ্বালানি তেলের দুর্মূল্যের বাজারেজাহাজভাড়াপথে বাড়তি বীমা খরচবন্দর খরচ দিয়ে দেশের খুচরা বাজারে ওই ডাল কত টাকায় পাওয়া যাবেআর তাও মাত্র ১০ হাজার টন। মরক্কো থেকে ট্রিপল সুপার ফসফেট আমদানির জন্য সরকার দুটি কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে। একটি কোম্পানি টেন্ডারে দাম দিয়েছে ৬৮৮ ডলার অন্যটি ৭২৬ ডলার ১০% প্লাস মাইনাস কন্ডিশানে। ২০২৪ সালে অর্থাৎ যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম ৪৫০ ডলার থেকে ৪৭০ ডলারের বেশি দাম ছিল না। ইউরিয়ার বাজার ৯৪০ থেকে ৯৮০’ ডলারের ভেতর।

তারপরেও জ্বালানি তেলের মতো সার কেনার অনুমতি টেন্ডারে পেলেও কতটা সাপ্লাই দিতে সমর্থ হবে সরবরাহকারীরা তা এখন সব দেশেই বড় প্রশ্ন। আর ১০ জুন রাত থেকে হরমুজ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবার ফলে আগামী দুই একদিনের মধ্যে স্পট মার্কেটে এসব সারের দাম বাড়তি হওয়াই স্বাভাবিক।

গ্রামে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না

এ অবস্থায় যদিও বিদ্যুৎমন্ত্রী পার্লামেন্টে বলেছেনকোনো লোডশেডিং নেই তার প্রতিউত্তরে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেনগ্রামে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এক জুলাই যোদ্ধা” ফেসবুকে সম্প্রতি লিখেছেতার গ্রামের বাড়িতে যদিও ২৪ ঘণ্টায় ঘণ্টা চারেক বিদ্যুৎ থাকে তারপরেও গ্রামীণ পরিবেশ ও হাওয়া বাতাসে সে খুব ভালো আছে। সে আরও ভালো থাকুককিন্তু চার ঘণ্টা বিদ্যুতে কৃষির ও গ্রামের ক্ষুদ্র শিল্পের কী অবস্থা হবে?

এবার কোরবানীর ঈদে ৫০ লাখের কিছু বেশি গরু বিক্রি হয়েছে। তাই খামারীরা গরু নিয়ে ফিরে গেছে বেশিভাগ। ট্রাম্প নামক মহিষটিকে চিড়িয়াখানায় রেখে কয়টা ফ্যান দিতে হয়েছে তা নিশ্চয়ই দেশবাসী দেখেছে মিডিয়ার মাধ্যমে। তাহলে খামারীদের গরুমুরগির অবস্থা চার ঘণ্টা বিদ্যুতের মধ্যে কীভাবে চলছে তা বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়।

এর পরে আসে কোভিড-২ প্লাস। ড. ইউনূসকে ছোটভাই আনীস আলমগীর থেকে অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাও বিশ্ববাটপার বলছেন। কিন্তু বাস্তবে লোকটা বাংলাদেশের জন্য কোভিড-২ প্লাসহয়তো ভবিষ্যতে আরও বেশি বলতে হবে। সরকারি হিসেবে তার মেটিকুলাস ডিজাইনের জুলাই সন্ত্রাসের কারণে ৫০০ শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে গ্রাম ও শহর মিলে ছোট ছোট শিল্প ও খামার ধরা হয়তাহলে বন্ধ হয়েছে কয়েক লাখ। আর এগুলো সহজে খোলার কোনো উপায় নেই। কারণ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর ইউনূস যেমন মব কালচার” তৈরি করেছে বিএনপি তেমনি চাঁদাবাজ কালচার” তৈরি করেছে। এরমধ্যে আবার পুলিশ হত্যাকারীরা উদ্ধত গলায় জানায়সে পুলিশ হত্যা করেছিল- অতএব তাকে পুরস্কৃত করতে হবে। তাহলে এ চাঁদাবাজ বন্ধ করবে কেজ্বালানিবিদ্যুৎখাদ্যমূল্যসার ক্রাইসিসের সঙ্গে মহান চাঁদাবাজরাও যোগ হয়েছে। যার ফলে গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠা ছোট ছোট প্রসেসিং ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামের খামারীদের দুধের দাম কমে গেছে। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পি সি রায়) বলেছিলেনযখন দুধের উৎপাদন খরচের থেকে বিক্রিমূল্য কমে যায় তখন বুঝতে হবে দেশে একটা নীরব দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে। কারণমানুষ কোনোমতে জীবন চালানোর দিকে ঝুঁকে গেছে। তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু ইরান যুদ্ধের প্রভাব নয় পাশাপাশি কোভিড-২ প্লাস ইউনূস”-এর ক্ষতও দগদগে অবস্থায় আছে। একদিকে ইউনূস যেভাবে দেশটিকে তছনছ করে গেছেতার ওপরে এই ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের ধাক্কার মধ্যে বর্তমানে যারা সরকারে আছে তারা ৯ লাখ কোটি টাকার ওপরে বাজেট দিচ্ছে। যার একটা বড় অংশের অর্থের প্রাপ্তি ও উৎস অনেকটা অনিশ্চিত।

উচ্চাভিলাষী বাজেট: খরচ বইবে কে? | দ্য ডেইলি স্টার

তাছাড়া এ ধরনের একটা চলমান ভয়াবহ ক্রাইসিসের মধ্যে অতীতের বাজেটের ধারাবাহিকতা রাখাটাযদিও আমি একজন ক্ষুদ্র সাংবাদিক মাত্রতারপরেও আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয় না। এ সময়ে বাজেট দুই তিন ভাগেই করা উচিত। অনেকে বলেনবাজেট তো সংশোধন করা যায়। কিন্তু সংশোধনের আগেই এমন কিছু অর্থ খরচ হয়ে যায়- পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তখন ওই খরচটি ভুল প্রমাণিত হতেও পারে। এমনি অনেক কারণে এই ভাগটা করতে হয় বলে মনে করি।

কোভিডের বছরে যখন শেখ হাসিনার সরকারের অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল (কেন তিনি অর্থ ও পরিকল্পনার মতো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এটা আজও আমার ক্ষুদ্র মাথায় ঢোকে না)। আগের বাজেটের ধারাবাহিকতা রেখে আরও বড় আকারের বাজেট দিলেন- তখনও লিখেছিলাম বাজেটটি ছয় মাসের হলে ভালো হতো। কারণ কোভিড পরবর্তী অর্থনীতি ও সমস্যা কোথায় যাবে তা এখনই ধারণা করা যাচ্ছে না। তাই বাজেট বড় করার থেকে সমস্যা বুঝে বাজেট নিয়ে এগুনো ভালো। লেখাটি লেখার এক পর্যায়ে বাংলাদেশের সব থেকে সফল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে ফোন করে আমার এ ধারণা জানাই এবং তাকে বলিআপনি এ বছর অর্থমন্ত্রী থাকলে কী করতেনতিনি বলেছিলেনতিনি জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তার আগের বাজেটটি রিপিট করতেন। তারপরে ডিসেম্বরের পরে কোভিডের এফেক্ট পর্যালোচনা করে বাকি সময়টুকুর জন্য বাজেট করতেন।

দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশ | The Daily Star

 

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World

জনপ্রিয় সংবাদ

ফুটবলের নতুন যুগের সূচনা, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ শুরু আজ

ইরান যুদ্ধ, দুধের প্যাকেট, সার, বিদ্যুৎ, কোভিড-২ ও এবারের বাজেট

১১:৪৯:৫০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

দিল্লির একজন শিল্পপতি ও শিল্প কন্সালটেন্ট। ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেবার জন্য ফোন করলেও প্রায়ই সময় আলোচনা থাকে শিল্পপণ্য ও ডলারের বাজার নিয়ে। মাস খানেক আগে তিনি কুশল জানার জন্য ফোন করার পরে বললেন, ‘আপনাদের ওখানে গত মাসে আমাদের কয়েক মিলিয়ন ডলার অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ব্যবসা হয়েছে। আরও হতে পারতো কিন্তু আপনাদের তো ডলার সংকট

ইরান যুদ্ধের ফলে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল সংকট এখন দুনিয়া জুড়ে। জাপান আপাতত খাবারের প্যাকেজিংয়ের রঙ করা বাদ দিয়ে ও প্যাকেট ছোট করে খরচ বাঁচাচ্ছে। ব্রিটেন এখনও পুরোনো মজুদ থেকে সরবরাহ করে বাজারে মূল্য ঠিক রেখেছে। তবে লন্ডন টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বেশি দিন আর সেটা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ একদিকে চায়না তাদের রফতানি সীমিত করে নিজস্ব প্রয়োজনে মন দিয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ার গ্যাস ক্ষেত্র নষ্ট ও সেখানে উৎপাদিত বিশ্বের প্রয়োজনীয় ৯% অ্যালুমিনিয়াম এবং সারা বিশ্বের উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হরমুজ প্রণালী সংকটের কারণে।

আর এই লেখা যখন লিখছি সে সময়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের খবর অনুযায়ী ১০ জুন থেকে হরমুজ প্রণালী কার্যত পুরোপুরি বন্ধ। আর এর ঘণ্টা কয়েক আগে ব্লুমবার্গ নিউজের এনালিস্ট ডেভিড ফিকলিং লিখেছেনদিল্লিতে ডায়েট কোকের সংকট চলছে অ্যালুমিনিয়াম ক্যান তৈরির সংকটের ফলে।

A Better Way To Recycle Dirty Aluminum Foil

এত কিছু থাকতে অ্যালুমিনিয়াম নিয়ে কেন এত কথা তার নিশ্চয়ই ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না। এর প্রয়োজনীয়তা যেমন সবাই জানেনগাড়ি থেকে দুধচিপসের প্যাকেট অবধি। তবে তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো ইরান যুদ্ধের ইম্প্যাক্ট অর্থনীতির ও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে কত দূর পর্যন্ত আঘাত করেছে।

বাস্তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুটো জেনারেশন পার হবার পরে পৃথিবী যুদ্ধ পরবর্তী ভয়াবহতা অনেকটা ভুলে গিয়েছিল। ইরান যুদ্ধ যে পৃথিবীকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যুদ্ধটি শেষ করার ক্ষমতা এ মুহূর্তে প্রায় কারো হাতে নেই। তাছাড়া ইরানের দাবি প্রতিদিনই বাড়বে। যে কোনো আলোচনায় সে এখন মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব নিতে চাইবে। কারণ যুদ্ধের ভেতর দিয়ে ইরান মৌলবাদী রাষ্ট্রের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হয়ে গেছে। আর মৌলবাদের থেকে জাতীয়তাবাদের শক্তি হাজার গুণ বেশি। তাই এই দীর্ঘ যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতা নিয়েই আগামী অনেকদিন পৃথিবীকে চলতে হবে।

সে চলার পথ কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে তার প্রমাণ একমাসও হয়নি দিল্লির শিল্প কন্সালট্যান্ট বললেনবাংলাদেশে ডলার সংকট থাকায় তারা বাংলাদেশে চাহিদা অনুযায়ী অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েল বিক্রি করতে পারছে না। আর একমাস যেতেই দেখা যাচ্ছে১০ জুন ফিকলিং লিখছেনঅ্যালুমিনিয়ামের সংকটের কারণে দিল্লিতে ডায়েট কোকের ক্যানে তৈরির সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসেও যে সংকট হয়েছে তাও একই দিনে বোঝা গেল- কারণ সে দেশের সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বছরে ৯টি করে এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার কম দামে দিত। ১০ জুন থেকে ৯টির বদলে ৪টি দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব গ্যাস থাকার কারণেও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দিচ্ছে। কারণ ১৫ থেকে ২৫ পার্সেন্ট উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। যার ফলে সিরামিক পণ্যের সর্বোচ্চ দাম যা রাখা যায় চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা মিলে- উৎপাদন খরচ তার থেকে বেড়ে গেছে। তাই বাস্তবতা মেনে তারা শিল্প বন্ধ করছে। ভারতেও গ্যাসের অভাবে প্রচুর সিরামিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এই গ্যাসের সংকটে তাদের ইউরিয়া সার উৎপাদনেও ধাক্কা লেগেছে। যার আলটিমেট ধাক্কা কৃষিতে। যে কারণে বলা হচ্ছে এই কোয়ার্টারে ভারত ৭.৮ তাদের জিডিপি রাখতে পারলেও আগামীতে পারবে না। এটা ৭-এর নিচে নেমে আসবে। কারণ কৃষি থেকে জিডিপিতে ৪ দশমিক দুই বা তিন এরকম আসে তা ৩-এ নেমে আসবে। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন কমে যাবে। ইন্দোনেশিয়া থেকে তারা জি টু জি-তে যে দামে ইউরিয়া আমদানি করছে সে দামটি স্পট বাজারে ইউরিয়া যে দামে বিক্রি হচ্ছে তার থেকে সামান্য কম।

মজুত সার দ্রুত শেষ হয়ে যাবে, বেকায়দায় সরকার

ভারতের কৃষিখাতে ধাক্কা লাগলে বাংলাদেশ তার বাইরে থাকতে পারে না। যে কাঁচা বাজারে ৪০ বছরের ওপর বাজার করিগ্রোসারী দোকানের মালিকানায় এখন পিতার বদলে পুত্র- তাই সম্পর্কটাও গভীর। গত শুক্রবারে তার কাছে একটা উজ্জ্বল রঙের মুগের ডাল দেখে বললামবাপজান, এটা কি ফরিদপুরের ডাল? সে মাথা নিচু করেযাতে অন্য কাস্টমার শুনতে না পায় তারপরে নিম্ম স্বরে বললোস্যার ইন্ডিয়ান ডালভালো হবে না। মুগের ডাল ছাড়া নিরামিষ হয় নাতাই কিনতে হলো আর কিযুদ্ধের সময় তো ভাতের বদলে ফ্যান খায়- তাই সেখানে চাল কড়া না আকড়াডাল ফরিদপুরের স্বাদেভরা না হয়ে ইন্ডিয়ান পেট ভরানো হলেই আর কিকিন্তু ভারতের কৃষি জিডিপি ৩-এ নামার অর্থ তাদের কৃষি উৎপাদন কমবে। বাংলাদেশের বাজারে তার ধাক্কা লাগবে।

বাংলাদেশ যে তা বুঝতে পারেনি তা নয়১০ জুন মরক্কো থেকে মুসুরির ডাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। ক্রয় মূল্য প্রায় ৯০ টাকাতারপরে এই জ্বালানি তেলের দুর্মূল্যের বাজারেজাহাজভাড়াপথে বাড়তি বীমা খরচবন্দর খরচ দিয়ে দেশের খুচরা বাজারে ওই ডাল কত টাকায় পাওয়া যাবেআর তাও মাত্র ১০ হাজার টন। মরক্কো থেকে ট্রিপল সুপার ফসফেট আমদানির জন্য সরকার দুটি কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে। একটি কোম্পানি টেন্ডারে দাম দিয়েছে ৬৮৮ ডলার অন্যটি ৭২৬ ডলার ১০% প্লাস মাইনাস কন্ডিশানে। ২০২৪ সালে অর্থাৎ যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম ৪৫০ ডলার থেকে ৪৭০ ডলারের বেশি দাম ছিল না। ইউরিয়ার বাজার ৯৪০ থেকে ৯৮০’ ডলারের ভেতর।

তারপরেও জ্বালানি তেলের মতো সার কেনার অনুমতি টেন্ডারে পেলেও কতটা সাপ্লাই দিতে সমর্থ হবে সরবরাহকারীরা তা এখন সব দেশেই বড় প্রশ্ন। আর ১০ জুন রাত থেকে হরমুজ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবার ফলে আগামী দুই একদিনের মধ্যে স্পট মার্কেটে এসব সারের দাম বাড়তি হওয়াই স্বাভাবিক।

গ্রামে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না

এ অবস্থায় যদিও বিদ্যুৎমন্ত্রী পার্লামেন্টে বলেছেনকোনো লোডশেডিং নেই তার প্রতিউত্তরে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেনগ্রামে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এক জুলাই যোদ্ধা” ফেসবুকে সম্প্রতি লিখেছেতার গ্রামের বাড়িতে যদিও ২৪ ঘণ্টায় ঘণ্টা চারেক বিদ্যুৎ থাকে তারপরেও গ্রামীণ পরিবেশ ও হাওয়া বাতাসে সে খুব ভালো আছে। সে আরও ভালো থাকুককিন্তু চার ঘণ্টা বিদ্যুতে কৃষির ও গ্রামের ক্ষুদ্র শিল্পের কী অবস্থা হবে?

এবার কোরবানীর ঈদে ৫০ লাখের কিছু বেশি গরু বিক্রি হয়েছে। তাই খামারীরা গরু নিয়ে ফিরে গেছে বেশিভাগ। ট্রাম্প নামক মহিষটিকে চিড়িয়াখানায় রেখে কয়টা ফ্যান দিতে হয়েছে তা নিশ্চয়ই দেশবাসী দেখেছে মিডিয়ার মাধ্যমে। তাহলে খামারীদের গরুমুরগির অবস্থা চার ঘণ্টা বিদ্যুতের মধ্যে কীভাবে চলছে তা বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়।

এর পরে আসে কোভিড-২ প্লাস। ড. ইউনূসকে ছোটভাই আনীস আলমগীর থেকে অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাও বিশ্ববাটপার বলছেন। কিন্তু বাস্তবে লোকটা বাংলাদেশের জন্য কোভিড-২ প্লাসহয়তো ভবিষ্যতে আরও বেশি বলতে হবে। সরকারি হিসেবে তার মেটিকুলাস ডিজাইনের জুলাই সন্ত্রাসের কারণে ৫০০ শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে গ্রাম ও শহর মিলে ছোট ছোট শিল্প ও খামার ধরা হয়তাহলে বন্ধ হয়েছে কয়েক লাখ। আর এগুলো সহজে খোলার কোনো উপায় নেই। কারণ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর ইউনূস যেমন মব কালচার” তৈরি করেছে বিএনপি তেমনি চাঁদাবাজ কালচার” তৈরি করেছে। এরমধ্যে আবার পুলিশ হত্যাকারীরা উদ্ধত গলায় জানায়সে পুলিশ হত্যা করেছিল- অতএব তাকে পুরস্কৃত করতে হবে। তাহলে এ চাঁদাবাজ বন্ধ করবে কেজ্বালানিবিদ্যুৎখাদ্যমূল্যসার ক্রাইসিসের সঙ্গে মহান চাঁদাবাজরাও যোগ হয়েছে। যার ফলে গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠা ছোট ছোট প্রসেসিং ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামের খামারীদের দুধের দাম কমে গেছে। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পি সি রায়) বলেছিলেনযখন দুধের উৎপাদন খরচের থেকে বিক্রিমূল্য কমে যায় তখন বুঝতে হবে দেশে একটা নীরব দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে। কারণমানুষ কোনোমতে জীবন চালানোর দিকে ঝুঁকে গেছে। তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু ইরান যুদ্ধের প্রভাব নয় পাশাপাশি কোভিড-২ প্লাস ইউনূস”-এর ক্ষতও দগদগে অবস্থায় আছে। একদিকে ইউনূস যেভাবে দেশটিকে তছনছ করে গেছেতার ওপরে এই ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের ধাক্কার মধ্যে বর্তমানে যারা সরকারে আছে তারা ৯ লাখ কোটি টাকার ওপরে বাজেট দিচ্ছে। যার একটা বড় অংশের অর্থের প্রাপ্তি ও উৎস অনেকটা অনিশ্চিত।

উচ্চাভিলাষী বাজেট: খরচ বইবে কে? | দ্য ডেইলি স্টার

তাছাড়া এ ধরনের একটা চলমান ভয়াবহ ক্রাইসিসের মধ্যে অতীতের বাজেটের ধারাবাহিকতা রাখাটাযদিও আমি একজন ক্ষুদ্র সাংবাদিক মাত্রতারপরেও আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয় না। এ সময়ে বাজেট দুই তিন ভাগেই করা উচিত। অনেকে বলেনবাজেট তো সংশোধন করা যায়। কিন্তু সংশোধনের আগেই এমন কিছু অর্থ খরচ হয়ে যায়- পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তখন ওই খরচটি ভুল প্রমাণিত হতেও পারে। এমনি অনেক কারণে এই ভাগটা করতে হয় বলে মনে করি।

কোভিডের বছরে যখন শেখ হাসিনার সরকারের অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল (কেন তিনি অর্থ ও পরিকল্পনার মতো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এটা আজও আমার ক্ষুদ্র মাথায় ঢোকে না)। আগের বাজেটের ধারাবাহিকতা রেখে আরও বড় আকারের বাজেট দিলেন- তখনও লিখেছিলাম বাজেটটি ছয় মাসের হলে ভালো হতো। কারণ কোভিড পরবর্তী অর্থনীতি ও সমস্যা কোথায় যাবে তা এখনই ধারণা করা যাচ্ছে না। তাই বাজেট বড় করার থেকে সমস্যা বুঝে বাজেট নিয়ে এগুনো ভালো। লেখাটি লেখার এক পর্যায়ে বাংলাদেশের সব থেকে সফল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে ফোন করে আমার এ ধারণা জানাই এবং তাকে বলিআপনি এ বছর অর্থমন্ত্রী থাকলে কী করতেনতিনি বলেছিলেনতিনি জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তার আগের বাজেটটি রিপিট করতেন। তারপরে ডিসেম্বরের পরে কোভিডের এফেক্ট পর্যালোচনা করে বাকি সময়টুকুর জন্য বাজেট করতেন।

দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশ | The Daily Star

 

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World