দীর্ঘদিন ধরেই জনসংখ্যা সংকটের মুখে থাকা জাপান নতুন এক উদ্বেগজনক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ আদমশুমারির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশটির জনসংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি কমেছে। জনসংখ্যা হ্রাসের এই গতি এখন জাপানের অর্থনীতি, শ্রমবাজার, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ জনপদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
সরকারি হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে জাপানের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখে। ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৬১ লাখ। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আদমশুমারি পরিচালনার ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় পতন।
বাড়ছে মৃত্যু, কমছে জন্ম
জাপানের জনসংখ্যা ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ১২ কোটি ৮০ লাখে পৌঁছেছিল। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে তা কমছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৭০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ৮ কোটি ৭০ লাখে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেশটিতে বহু বছর ধরে সরকার তরুণদের বেশি সন্তান নেওয়ার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ চালু করলেও প্রত্যাশিত ফল আসেনি। বর্তমানে প্রতি একটি জন্মের বিপরীতে প্রায় দুটি মৃত্যু ঘটছে। ফলে জনসংখ্যার স্বাভাবিক ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চল হয়ে উঠছে জনশূন্য
জনসংখ্যা সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ এলাকায়। কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগের খোঁজে তরুণরা টোকিও, ওসাকা, নাগোয়ার মতো বড় শহরে চলে যাচ্ছে। ফলে অনেক অঞ্চলে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
উত্তরের কিছু অঞ্চলে গত পাঁচ বছরে জনসংখ্যা প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। সেখানে কম মজুরি, কঠিন আবহাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে তরুণদের চলে যাওয়ার প্রবণতা আরও বেশি।
গ্রামাঞ্চলের অনেক স্কুল এখন বৃদ্ধদের সেবাকেন্দ্র বা কমিউনিটি কেন্দ্রে রূপান্তরিত হচ্ছে। লাখ লাখ বাড়ি খালি পড়ে আছে। সরকারি অফিস, হাসপাতাল এবং বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানও আকার ছোট করতে বাধ্য হচ্ছে। কোথাও কোথাও রেলসেবাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
শহরগুলো এখনো টিকে আছে
জনসংখ্যা কমলেও বড় শহরগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে টোকিও মহানগর এলাকায় জনসংখ্যা সামান্য বেড়েছে। ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষের বসবাস ছিল, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ।
ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে টোকিও তরুণদের আকর্ষণ করে চলেছে। শিক্ষার্থী এবং নতুন কর্মজীবীদের আগমনের কারণে শহরটির জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
অভিবাসন নিয়ে দ্বিধা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি কর্মী ও অভিবাসীদের জন্য দরজা আরও উন্মুক্ত করা হলে জনসংখ্যা হ্রাসের কিছুটা প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে জাপান ঐতিহাসিকভাবে অভিবাসন প্রশ্নে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্রবণতাও শক্তিশালী হয়েছে, যার ফলে অভিবাসন নীতি আরও সংবেদনশীল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ
জনসংখ্যা কমতে থাকলে আগামী কয়েক দশকে স্কুল, হাসপাতাল, পুলিশ বিভাগ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মীর সংকট আরও তীব্র হতে পারে। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্তদের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাপানের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে অন্যান্য উন্নত দেশের জন্যও একটি সতর্কবার্তা হতে পারে। কারণ এশিয়া ও বিশ্বের আরও অনেক দেশ একই ধরনের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মুখোমুখি হওয়ার পথে রয়েছে।
জাপানের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, জন্মহার কমে যাওয়া এবং দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং এটি অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যও দীর্ঘমেয়াদি বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















