অর্থনীতির স্বাস্থ্য যাচাই করতে আমরা সাধারণত একটি সংখ্যার দিকে তাকাই—জিডিপি প্রবৃদ্ধি। প্রবৃদ্ধি বাড়লে ধরে নেওয়া হয় দেশ এগোচ্ছে, ব্যবসা বাড়ছে, মানুষের আয় বাড়ছে এবং জীবনমান উন্নত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় এই সরল সমীকরণকে মিথ্যা প্রমাণ করে। সাম্প্রতিক থাইল্যান্ড তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, কয়েক প্রান্তিক ধরে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। কাগজে-কলমে এটি একটি ইতিবাচক সংকেত। কিন্তু একই সময়ে সরকারকে জনগণের আর্থিক কষ্ট লাঘবে বারবার নগদ সহায়তা কর্মসূচি চালু করতে হয়েছে। এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে: যদি অর্থনীতি সত্যিই শক্তিশালী হয়ে থাকে, তাহলে মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কেন কমছে না?
সংখ্যা ও বাস্তবতার এই ফারাক নতুন নয়। অনেক সময় সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক এমন একটি চিত্র তৈরি করে, যা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। অর্থনীতির পরিভাষায় জিডিপি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি সমাজের অর্থনৈতিক সুস্থতার পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি নয়। বিশেষ করে যখন প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ আসে এমন উৎস থেকে, যা প্রকৃত উৎপাদন বা আয়ের সম্প্রসারণকে প্রতিফলিত করে না।
উদাহরণ হিসেবে মজুত বৃদ্ধি বা ইনভেন্টরি জমার বিষয়টি ধরা যেতে পারে। জাতীয় আয় হিসাবের কাঠামোতে এটি বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা আমদানিকারকরা বেশি পণ্য মজুত করলে জিডিপি বাড়তে পারে। কিন্তু এই বৃদ্ধি সব সময় অর্থনৈতিক শক্তির লক্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বা মূল্যবৃদ্ধির ভয়ে অতিরিক্ত মজুত গড়ে তোলার ফল।
যদি প্রবৃদ্ধির হিসাব থেকে এই ধরনের অস্থায়ী প্রভাব বাদ দেওয়া হয়, তাহলে অর্থনীতির প্রকৃত গতি অনেক দুর্বল বলে প্রতীয়মান হতে পারে। তখন বোঝা যায় কেন সাধারণ পরিবারগুলো বাজারে ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছে, কেন ব্যবসায়ীরা বিক্রি কমে যাওয়ার অভিযোগ করছেন এবং কেন ভোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
তবে অর্থনৈতিক দুর্বলতার জবাবে নগদ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এই ধরনের পদক্ষেপ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যাগুলো দূর করতে পারে না। বরং প্রশ্ন ওঠে, এই বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে।
যখন সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টির পথ বেছে নেয়, তখন তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি। অর্থনীতির ইতিহাস দেখায়, কৃত্রিমভাবে অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রবৃদ্ধি তৈরি করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন আসে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে।

আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক সময়ে থাইল্যান্ডের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী বলে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রথম নজরে এটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু রপ্তানির এই উল্লম্ফন যদি দেশীয় উৎপাদনের সমান হারে না বাড়ে, তাহলে এর পেছনের বাস্তবতা খতিয়ে দেখা জরুরি।
একটি দেশের কারখানাগুলো যদি খুব সামান্য হারে উৎপাদন বাড়ায়, অথচ রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—রপ্তানি হওয়া পণ্যগুলো আসলে কোথায় তৈরি হচ্ছে? এমন পরিস্থিতিতে একটি দেশ ধীরে ধীরে উৎপাদনকেন্দ্রের বদলে পুনঃরপ্তানির প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে সামান্য প্রক্রিয়াকরণ বা পুনর্বিন্যাসের পর অন্য দেশে পাঠানো হচ্ছে।
এই প্রবণতা স্বল্পমেয়াদে রপ্তানির সংখ্যা বাড়াতে পারে, কিন্তু দেশীয় শিল্পভিত্তিকে শক্তিশালী করে না। বরং উৎপাদনশীল খাত দুর্বল হয়ে পড়লে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং শিল্প বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে আমদানি দ্রুত বাড়তে থাকলে বাণিজ্য ভারসাম্যও চাপের মুখে পড়ে।
অর্থনীতির প্রকৃত সমস্যা তখন আর সাময়িক বাজার অস্থিরতা বা জ্বালানি মূল্যের ওঠানামায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটে রূপ নেয়, যেখানে উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায় এবং অর্থনীতি ক্রমশ বাহ্যিক নির্ভরতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
অতএব, কেবল প্রবৃদ্ধির হার বা রপ্তানির মোট মূল্য দেখে অর্থনীতির সাফল্য ঘোষণা করা বিপজ্জনক হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের উচিত সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে বোঝা। মানুষের আয়, ভোগক্ষমতা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, শিল্পের সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের মান—এসব সূচক একসঙ্গে বিবেচনা না করলে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক নীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা বাস্তব সমস্যাকে সঠিকভাবে শনাক্ত করে। প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল পরিসংখ্যান যদি দুর্বল অর্থনীতির ওপর একটি আবরণ মাত্র হয়, তাহলে সেই আবরণ যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা সমস্যার সমাধান নয়। বরং ভুল রোগ নির্ণয়ের মতো, এটি সঠিক চিকিৎসার পথকেই আরও দূরে সরিয়ে দেয়।
চার্টচাই পারাসুক 


















