০২:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
চীনের হুয়াংইয়ান দাওয়ে মিলল ৫০টির বেশি বিপন্ন সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ চীনের ‘গ্লোবাল গভর্ন্যান্স’ শ্বেতপত্র প্রকাশ, বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে নতুন বার্তা নওগাঁয় রেলস্টেশনের কাছে কলেজশিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার, হত্যার অভিযোগ পরিবারের হেফাজতকাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদ: ‘ওপর মহলের নির্দেশে সংবাদ করেছি’ দাবি রুপা ও মোজাম্মেল বাবুর দেড় মাস ধরে মায়ের সঙ্গে কারাগারে দুই বছরের শিশু, কুড়িগ্রাম কারাগারে বন্দি জীবনের বাস্তবতা যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি মতপ্রকাশের শাস্তি? বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে নতুন বিতর্ক ট্রাম্প-সমর্থিত ‘টাইগার’ প্রার্থীকে ঘিরে কলম্বিয়ায় বিতর্ক, নারীদের ভোটে স্পষ্ট বিভাজন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্ত, বাড়ছে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ছাত্র আন্দোলন “দেউলিয়ার পথে ইন্দোনেশিয়া” রাজপথে আরও তীব্র টেক্সাসের ছোট শহরে স্পেসএক্সের অর্থবৃষ্টি: আইপিও-পরবর্তী উচ্ছ্বাসে বদলে যাচ্ছে বাস্ত্রপ

নাগরিক অধিকার নাকি দয়ার দান: প্রতিবন্ধী মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে নতুন ভাবনার সময়

ভারতের কল্যাণরাষ্ট্রের গল্প গত এক দশকে অনেকটাই বদলে গেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং সরকারি সেবার দ্রুত সম্প্রসারণ দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার উদাহরণে পরিণত করেছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে, যাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা এখনও অনিশ্চিত, অসম এবং প্রায়শই অপর্যাপ্ত। তারা হলেন প্রতিবন্ধী মানুষ।

একটি আধুনিক গণতন্ত্রে নাগরিকের মর্যাদা তার বসবাসের ঠিকানা, স্থানীয় প্রশাসনের সদিচ্ছা বা রাজ্য সরকারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না। অথচ প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটছে। একই দেশের দুই নাগরিক, একই ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবনযাপন করলেও, কেবল ভিন্ন রাজ্যে বসবাসের কারণে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। এই বাস্তবতা শুধু প্রশাসনিক বৈষম্য নয়; এটি সমঅধিকারের ধারণার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

প্রতিবন্ধিতা ও দারিদ্র্যের দ্বৈত ফাঁদ

প্রতিবন্ধিতা কেবল শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, শিক্ষা অর্জনের প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক বঞ্চনা। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধিতা সরাসরি দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ায়।

Data: Persons With Disabilities Make up More Than 2% of India's Population,  with Some States Reporting a Higher than National Average - FACTLY

ভারতের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আয়ু বৃদ্ধির প্রবণতা এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিস্তারের কারণে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো সেই হারে বিস্তৃত হয়নি। অনেকেই সরকারি ভাতার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন, আর যারা ভাতা পাচ্ছেন, তাদের বড় অংশের জন্য সেই অর্থ ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্যও যথেষ্ট নয়।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: রাষ্ট্র কি প্রতিবন্ধী মানুষকে কেবল দরিদ্র সহায়তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখবে, নাকি অধিকারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনবে? এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য গভীর। প্রথমটি দয়ার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে, দ্বিতীয়টি নাগরিক অধিকারের ওপর।

সামাজিক ব্যয় নয়, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব উঠলেই সাধারণত ব্যয়ের প্রশ্ন সামনে আসে। কিন্তু এই আলোচনায় প্রায়ই উপেক্ষিত হয় বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

যখন কোনো পরিবারে একজন প্রতিবন্ধী সদস্য ন্যূনতম আয় সুরক্ষা পান, তখন সেই পরিবার খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং স্থানীয় বাজারে ব্যয় বাড়াতে পারে। এর ফলে শুধু ব্যক্তির জীবনমান উন্নত হয় না; স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে তাই শুধুমাত্র রাজস্ব ব্যয় হিসেবে দেখার প্রবণতা অর্থনৈতিকভাবে অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ।

Social protection for people with disabilities: Cash benefits are not  enough - InfoStories

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবন্ধী মানুষকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা থেকে দূরে রাখা নিজেই একটি অর্থনৈতিক ক্ষতি। লক্ষ লক্ষ মানুষ যদি উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে জাতীয় অর্থনীতিও তার সম্ভাব্য সক্ষমতার একটি অংশ হারায়।

এই কারণে প্রতিবন্ধী ভাতা শুধু মানবিক সহায়তা নয়; এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অবকাঠামো।

এক দেশ, এক ন্যূনতম মানদণ্ড

ভারতের বহু সামাজিক কর্মসূচিতে জাতীয় মানদণ্ড ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি সহায়তা কিংবা সরাসরি নগদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তাহলে প্রতিবন্ধী ভাতার ক্ষেত্রে একই ধরনের ন্যূনতম জাতীয় মানদণ্ড কেন থাকবে না?

একটি সর্বজনীন ন্যূনতম প্রতিবন্ধী ভাতা ব্যবস্থা এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে দেশের যেকোনো প্রান্তের নাগরিক অন্তত একটি নির্দিষ্ট মাত্রার আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতভাবে পাবেন। রাজ্যগুলো চাইলে এর ওপর অতিরিক্ত সুবিধা যোগ করতে পারে, কিন্তু মৌলিক অধিকারটি আর ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই এই পথ অনুসরণ করেছে। সেখানে জাতীয় পর্যায়ে নির্ধারিত মানদণ্ড নাগরিকদের জন্য সমতা, বহনযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। ভারতের মতো বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্রেও একই ধারণা বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।

প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজন

No accurate count of population of Persons with Disabilities, says  parliamentary panel - The Hindu

বর্তমান ব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে দায়িত্ব ছড়িয়ে থাকায় জবাবদিহি দুর্বল হয়, তথ্য ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয় এবং সুবিধাভোগীদের জন্য প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে ওঠে।

প্রতিবন্ধী মানুষের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামোর অধীনে আনা গেলে নিবন্ধন, যাচাই, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সুবিধা বিতরণ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। ডিজিটাল অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে; প্রয়োজন শুধু নীতিগত সমন্বয় এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার।

মর্যাদার প্রশ্ন

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ন্যূনতম আয় সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিতর্ক শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি বা প্রশাসনের বিতর্ক নয়। এটি মূলত মর্যাদার প্রশ্ন।

কোনো সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের কীভাবে দেখে, সেটিই তার নৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করে। যদি প্রতিবন্ধী মানুষকে এখনও সহানুভূতির পাত্র হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ভাতা একটি অনুগ্রহ হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি তাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে সামাজিক সুরক্ষা হবে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির স্বাভাবিক পরিণতি।

India's path to AI autonomy - Atlantic Council

ভারত আজ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক সামর্থ্যের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি জাতীয় ন্যূনতম ভাতা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আর কল্পনা নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এই মানুষদের মর্যাদাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করতে প্রস্তুত?

সত্যিকার অর্থে উন্নত রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছেও পৌঁছাচ্ছে কি না, তার মধ্যেই নিহিত। প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সমান সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সেই পরীক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

লেখক: সুশীল কুমার, ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের হুয়াংইয়ান দাওয়ে মিলল ৫০টির বেশি বিপন্ন সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ

নাগরিক অধিকার নাকি দয়ার দান: প্রতিবন্ধী মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে নতুন ভাবনার সময়

০১:০১:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

ভারতের কল্যাণরাষ্ট্রের গল্প গত এক দশকে অনেকটাই বদলে গেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং সরকারি সেবার দ্রুত সম্প্রসারণ দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার উদাহরণে পরিণত করেছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে, যাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা এখনও অনিশ্চিত, অসম এবং প্রায়শই অপর্যাপ্ত। তারা হলেন প্রতিবন্ধী মানুষ।

একটি আধুনিক গণতন্ত্রে নাগরিকের মর্যাদা তার বসবাসের ঠিকানা, স্থানীয় প্রশাসনের সদিচ্ছা বা রাজ্য সরকারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না। অথচ প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটছে। একই দেশের দুই নাগরিক, একই ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবনযাপন করলেও, কেবল ভিন্ন রাজ্যে বসবাসের কারণে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। এই বাস্তবতা শুধু প্রশাসনিক বৈষম্য নয়; এটি সমঅধিকারের ধারণার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

প্রতিবন্ধিতা ও দারিদ্র্যের দ্বৈত ফাঁদ

প্রতিবন্ধিতা কেবল শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, শিক্ষা অর্জনের প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক বঞ্চনা। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধিতা সরাসরি দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ায়।

Data: Persons With Disabilities Make up More Than 2% of India's Population,  with Some States Reporting a Higher than National Average - FACTLY

ভারতের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আয়ু বৃদ্ধির প্রবণতা এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিস্তারের কারণে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো সেই হারে বিস্তৃত হয়নি। অনেকেই সরকারি ভাতার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন, আর যারা ভাতা পাচ্ছেন, তাদের বড় অংশের জন্য সেই অর্থ ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্যও যথেষ্ট নয়।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: রাষ্ট্র কি প্রতিবন্ধী মানুষকে কেবল দরিদ্র সহায়তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখবে, নাকি অধিকারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনবে? এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য গভীর। প্রথমটি দয়ার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে, দ্বিতীয়টি নাগরিক অধিকারের ওপর।

সামাজিক ব্যয় নয়, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব উঠলেই সাধারণত ব্যয়ের প্রশ্ন সামনে আসে। কিন্তু এই আলোচনায় প্রায়ই উপেক্ষিত হয় বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

যখন কোনো পরিবারে একজন প্রতিবন্ধী সদস্য ন্যূনতম আয় সুরক্ষা পান, তখন সেই পরিবার খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং স্থানীয় বাজারে ব্যয় বাড়াতে পারে। এর ফলে শুধু ব্যক্তির জীবনমান উন্নত হয় না; স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে তাই শুধুমাত্র রাজস্ব ব্যয় হিসেবে দেখার প্রবণতা অর্থনৈতিকভাবে অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ।

Social protection for people with disabilities: Cash benefits are not  enough - InfoStories

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবন্ধী মানুষকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা থেকে দূরে রাখা নিজেই একটি অর্থনৈতিক ক্ষতি। লক্ষ লক্ষ মানুষ যদি উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে জাতীয় অর্থনীতিও তার সম্ভাব্য সক্ষমতার একটি অংশ হারায়।

এই কারণে প্রতিবন্ধী ভাতা শুধু মানবিক সহায়তা নয়; এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অবকাঠামো।

এক দেশ, এক ন্যূনতম মানদণ্ড

ভারতের বহু সামাজিক কর্মসূচিতে জাতীয় মানদণ্ড ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি সহায়তা কিংবা সরাসরি নগদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তাহলে প্রতিবন্ধী ভাতার ক্ষেত্রে একই ধরনের ন্যূনতম জাতীয় মানদণ্ড কেন থাকবে না?

একটি সর্বজনীন ন্যূনতম প্রতিবন্ধী ভাতা ব্যবস্থা এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে দেশের যেকোনো প্রান্তের নাগরিক অন্তত একটি নির্দিষ্ট মাত্রার আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতভাবে পাবেন। রাজ্যগুলো চাইলে এর ওপর অতিরিক্ত সুবিধা যোগ করতে পারে, কিন্তু মৌলিক অধিকারটি আর ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই এই পথ অনুসরণ করেছে। সেখানে জাতীয় পর্যায়ে নির্ধারিত মানদণ্ড নাগরিকদের জন্য সমতা, বহনযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। ভারতের মতো বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্রেও একই ধারণা বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।

প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজন

No accurate count of population of Persons with Disabilities, says  parliamentary panel - The Hindu

বর্তমান ব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে দায়িত্ব ছড়িয়ে থাকায় জবাবদিহি দুর্বল হয়, তথ্য ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয় এবং সুবিধাভোগীদের জন্য প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে ওঠে।

প্রতিবন্ধী মানুষের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামোর অধীনে আনা গেলে নিবন্ধন, যাচাই, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সুবিধা বিতরণ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। ডিজিটাল অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে; প্রয়োজন শুধু নীতিগত সমন্বয় এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার।

মর্যাদার প্রশ্ন

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ন্যূনতম আয় সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিতর্ক শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি বা প্রশাসনের বিতর্ক নয়। এটি মূলত মর্যাদার প্রশ্ন।

কোনো সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের কীভাবে দেখে, সেটিই তার নৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করে। যদি প্রতিবন্ধী মানুষকে এখনও সহানুভূতির পাত্র হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ভাতা একটি অনুগ্রহ হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি তাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে সামাজিক সুরক্ষা হবে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির স্বাভাবিক পরিণতি।

India's path to AI autonomy - Atlantic Council

ভারত আজ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক সামর্থ্যের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি জাতীয় ন্যূনতম ভাতা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আর কল্পনা নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এই মানুষদের মর্যাদাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করতে প্রস্তুত?

সত্যিকার অর্থে উন্নত রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছেও পৌঁছাচ্ছে কি না, তার মধ্যেই নিহিত। প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সমান সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সেই পরীক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

লেখক: সুশীল কুমার, ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।