বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ শিল্পী ডেভিড হকনি আর নেই। ক্যালিফোর্নিয়ার উজ্জ্বল আলো, সুইমিং পুল, মানবসম্পর্ক এবং প্রকৃতির রঙিন উপস্থাপনার মাধ্যমে যিনি আধুনিক শিল্পের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ হয়ে উঠেছিলেন, তিনি ৮৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর জনসংযোগ প্রতিনিধি এরিকা বোল্টন। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
উত্তর ইংল্যান্ডের বিষণ্ন আবহাওয়া থেকে রঙের খোঁজে
ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে বেড়ে ওঠা হকনি ছোটবেলায় হলিউডের কৌতুক অভিনেতা জুটি লরেল ও হার্ডির চলচ্চিত্রে তীব্র ছায়া দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, এমন ছায়া মানেই প্রচুর রোদ আর উজ্জ্বল আলো। সেই আকর্ষণই পরবর্তীতে তাঁকে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে।
১৯৩৭ সালে ব্র্যাডফোর্ডে জন্ম নেওয়া হকনি শিল্পশিক্ষার শুরু থেকেই প্রচলিত নিয়মের বাইরে হাঁটতেন। এমন এক সময়ে, যখন সমকামিতা ব্রিটেনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো, তিনি তাঁর বিমূর্ত চিত্রকর্মে সাহসী ও ব্যতিক্রমী নাম ব্যবহার করতেন। ১৯৫৯ সালে তিনি লন্ডনে চলে যান এবং দ্রুতই ব্রিটিশ পপ আর্ট আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন।

ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন শিল্পভাষার সন্ধান
আমেরিকান শিল্পীদের কাজ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। নিজের শিল্পকর্ম বিক্রির অর্থে তিনি প্রথম নিউইয়র্ক সফর করেন এবং পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
সেখানে গিয়ে তিনি এমন এক শিল্পভাষা গড়ে তোলেন, যা উজ্জ্বল রং, খোলা আকাশ, সুইমিং পুল এবং দৈনন্দিন জীবনের মুহূর্তগুলোকে নতুন মাত্রায় তুলে ধরে। তাঁর আঁকা সুইমিং পুলের দৃশ্য ও মানবমুখী চিত্রকর্মগুলো দ্রুতই আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করে।
বিশ্বখ্যাতি ও রেকর্ডমূল্যের শিল্পকর্ম
হকনির কাজকে অনেক সময় সমালোচকেরা অতিরিক্ত সরল বা ভোগবাদী বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিংশ ও একবিংশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘পোর্ট্রেট অব অ্যান আর্টিস্ট (পুল উইথ টু ফিগারস)’ ২০১৮ সালে ৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। সে সময় এটি জীবিত কোনো শিল্পীর কাজের মধ্যে নিলামে বিক্রি হওয়া সবচেয়ে মূল্যবান শিল্পকর্ম ছিল।
সাফল্যের মধ্যেও ছিলেন সহজ-সরল
অসাধারণ খ্যাতি অর্জনের পরও হকনি নিজেকে আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে দেখতেন। শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল অনন্য। একবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে নৈশভোজে অংশ নিতে গিয়ে তিনি নিরাপত্তা তল্লাশিতে আটকে পড়েন, কারণ অন্য অতিথিদের মতো গাড়িতে নয়, তিনি হেঁটে সেখানে পৌঁছেছিলেন।
প্রকৃতি, পরিবার ও শেষ অধ্যায়
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শিল্পে পরিবর্তন আসে। বন্ধুদের অনেকেই এইডসে মারা যাওয়ার পর তাঁর চিত্রকর্মে মানুষের পরিবর্তে স্থান পায় প্রিয় কুকুরগুলো। পরে তিনি ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে ফিরে স্থানীয় প্রকৃতি, গাছপালা, ক্ষেত ও ঋতুবদলের দৃশ্য আঁকায় মনোযোগ দেন।

এই সময়টিকে তিনি নিজের কর্মজীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ অধ্যায় হিসেবে দেখতেন। পরবর্তীতে ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে একটি খামারবাড়ি কিনে সেখানকার বাগান, ফুল ও গ্রামীণ দৃশ্য নিয়েও বিস্তৃত শিল্পকর্ম তৈরি করেন।
প্রযুক্তির সঙ্গেও ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ। ফ্যাক্স মেশিন থেকে শুরু করে আইপ্যাড—নতুন মাধ্যম ব্যবহার করে শিল্প সৃষ্টিতে তিনি সবসময় আগ্রহী ছিলেন।
শেষ দিন পর্যন্ত কর্মমুখর
ডেভিড হকনির বিশ্বাস ছিল, শিল্পীর অবসর বলে কিছু নেই। জীবনের শেষ পর্বেও তিনি প্রতিদিন কাজ করতেন এবং নতুন কিছু সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। তাঁর কাছে শিল্প ছিল শুধু পেশা নয়, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্ব শিল্পাঙ্গনে তাঁর প্রভাব বহু প্রজন্ম ধরে অনুভূত হবে। ক্যালিফোর্নিয়ার আলো-রঙের প্রতি এক তরুণ শিল্পীর আকর্ষণ থেকে শুরু হয়ে যে যাত্রা বিশ্বজোড়া খ্যাতিতে পৌঁছেছিল, সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















