ফুসফুসের ক্যানসার এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসারগুলোর একটি। ধূমপানের হার কমলেও এই রোগের ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি। যারা ধূমপান ছেড়েছেন, তাদের মধ্যেও ঝুঁকি রয়ে যায়। পাশাপাশি দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকা মানুষদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি। তবে নতুন গবেষণা বলছে, ভবিষ্যতে একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আগেভাগেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে, যা ক্যানসার প্রতিরোধে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ঝুঁকি শনাক্তে ১৪টি প্রোটিনের সন্ধান
আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল প্রায় ৫০ হাজার মানুষের রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে এমন ১৪টি প্রোটিন শনাক্ত করেছে, যেগুলোর মাত্রা ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ার অন্তত পাঁচ বছর আগে থেকেই বেড়ে যেতে শুরু করে।
গবেষণায় উন্নত যন্ত্রনির্ভর বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে হাজার হাজার প্রোটিনের তথ্য পরীক্ষা করা হয়। পরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও আটটি আলাদা তথ্যভাণ্ডারে এই ফলাফল যাচাই করা হয়। সেখানেও একই ধরনের সম্পর্ক পাওয়া যায়, এমনকি এমন জনগোষ্ঠীতেও যেখানে ধূমপায়ীর সংখ্যা খুব কম।
প্রদাহের সঙ্গে ক্যানসারের যোগসূত্র
গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, শরীরে একটি নির্দিষ্ট প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া সক্রিয় হলে এই ১৪টি প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ফুসফুসের ক্যানসারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বায়ুদূষণের কারণে শরীরে একটি সংকেতবাহী অণু নিঃসৃত হয়, যা ফুসফুসের কোষে সুপ্ত অবস্থায় থাকা ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তনকে সক্রিয় করে। এরপর সেই কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে টিউমারে পরিণত হতে পারে।
প্রাণীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই সংকেতবাহী অণুর কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে টিউমার তৈরি হওয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে প্রতিরোধমূলক ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।
বিদ্যমান ওষুধেই মিলছে সম্ভাবনা
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রদাহ-নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ ইতোমধ্যেই কিছু প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। গবেষকরা পুরোনো একটি বড় ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার তথ্য পুনর্বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এই ধরনের ওষুধ গ্রহণকারীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
তবে সবার ক্ষেত্রে ফল এক রকম নয়। যাদের শরীরে ওই ১৪টি প্রোটিনের মাত্রা কম ছিল, তাদের বিপুল সংখ্যাকে চিকিৎসা দিতে হতো একটি ক্যানসার প্রতিরোধ করতে। কিন্তু যাদের প্রোটিনের মাত্রা বেশি ছিল, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। অর্থাৎ সঠিক মানুষকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা দিলে ফল অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে

এখন গবেষকদের প্রধান লক্ষ্য হলো এমন একটি বাণিজ্যিক রক্ত পরীক্ষা তৈরি করা, যা সহজেই এই ১৪টি প্রোটিন শনাক্ত করতে পারবে। পাশাপাশি অন্য প্রদাহনাশক ওষুধগুলোর কার্যকারিতাও যাচাই করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসারের চিকিৎসায় গত কয়েক দশকে যত অগ্রগতি হয়েছে, প্রতিরোধে ততটা মনোযোগ দেওয়া হয়নি। কিন্তু নতুন এই গবেষণা দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতে ক্যানসার হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতে পারে। এতে শুধু মৃত্যুহারই কমবে না, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















