কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন প্রযুক্তি শিল্পের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। প্রায় প্রতিদিনই নতুন কোনো মডেল, নতুন কোনো সেবা বা নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি সামনে আসছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এমন এক ভবিষ্যতের কথা বলছে, যেখানে কাজ দ্রুত হবে, তথ্য পাওয়া সহজ হবে এবং মানুষের জীবনের নানা জটিলতা কমে আসবে। কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের মধ্যেই আরেকটি প্রবণতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে—বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। তারা প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করছে না, কিন্তু প্রযুক্তির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে চাইছে।
এই প্রবণতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি কোনো অতীতমুখী নস্টালজিয়া নয়। অনেকেই ভাবতে পারেন, পুরোনো যন্ত্রপাতি বা সীমিত ক্ষমতার ডিভাইসের প্রতি আগ্রহ মানেই অতীতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। আজকের অনেক তরুণ এমন প্রযুক্তি খুঁজছেন, যা তাদের মনোযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার ওপর কম হস্তক্ষেপ করে।
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, অনেক মানুষ নিজ হাতে তৈরি বা পরিবর্তিত কম্পিউটার, পুরোনো মিউজিক প্লেয়ার কিংবা একক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ডিজিটাল যন্ত্রের দিকে ঝুঁকছেন। এসব ডিভাইসের আকর্ষণ তাদের প্রযুক্তিগত ক্ষমতায় নয়; বরং সীমাবদ্ধতায়। কারণ সীমাবদ্ধতা কখনো কখনো স্বাধীনতার অনুভূতি তৈরি করে। এমন একটি যন্ত্র, যা শুধু বই পড়ার জন্য তৈরি, সেটি ব্যবহারকারীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম টান থেকে দূরে রাখে। একটি সাধারণ ডিজিটাল নোটপ্যাড চিন্তাকে সংগঠিত করতে সাহায্য করে, কিন্তু প্রতিটি বাক্যের পাশে কোনো অ্যালগরিদমিক পরামর্শ হাজির করে না।
এই প্রবণতা মূলত একটি বৃহত্তর প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে: প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ কে নির্ধারণ করবে? ব্যবহারকারী, নাকি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো?
গত এক দশকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। অনুসন্ধান ব্যবস্থা, বিনোদন প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন সেবা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসকে পুনর্গঠন করেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং মনোযোগকে পণ্যে পরিণত করার প্রবণতা।
বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্ম এমন এক পৃথিবীতে বড় হয়েছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি অনলাইন কর্মকাণ্ড কোনো না কোনো অ্যালগরিদম দ্বারা পর্যবেক্ষিত হয়েছে। তারা খুব কাছ থেকে দেখেছে কীভাবে সুবিধা ধীরে ধীরে নির্ভরতায় পরিণত হয়। কীভাবে একটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর সময় ধরে রাখতে তার আচরণ বিশ্লেষণ করে। কীভাবে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বাজারজাতযোগ্য তথ্যে রূপ নেয়।

এই অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা তৈরি করেছে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারকে তারা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির স্বাভাবিক ধাপ হিসেবে দেখলেও, সেটিকে অন্ধভাবে গ্রহণ করতে রাজি নয়।
প্রযুক্তি শিল্পের একটি বড় সমস্যা হলো, তারা প্রায়ই নতুন উদ্ভাবনকে অনিবার্য বলে উপস্থাপন করে। যেন কোনো প্রযুক্তি একবার আবির্ভূত হলে সেটিকে গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। এই যুক্তি সুবিধাজনক, কারণ এতে শ্রমবাজার, সৃজনশীলতা, কপিরাইট, গোপনীয়তা কিংবা পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ককে গুরুত্বহীন করে তোলা যায়।
কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। একটি প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে, উপকারীও হতে পারে, তবুও মানুষ তার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। উদাহরণ হিসেবে চিকিৎসা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা জননিরাপত্তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক প্রয়োগের কথা বলা যায়। দাবানল শনাক্ত করা, বিপজ্জনক এলাকা বিশ্লেষণ করা কিংবা চিকিৎসা গবেষণায় সহায়তা করার মতো ক্ষেত্রগুলোতে এর সম্ভাবনা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে এসব সাফল্য কি প্রমাণ করে যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এআই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত? অনেক তরুণের উত্তর হলো—না।
এই ‘না’ প্রযুক্তিবিরোধী অবস্থান নয়। বরং এটি পছন্দের স্বাধীনতার দাবি। মানুষ চাইলে এআই ব্যবহার করবে, চাইলে করবে না। মানুষ নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে কোন প্রযুক্তি তার জন্য প্রয়োজনীয় এবং কোনটি নয়। এই দাবির কেন্দ্রে রয়েছে মানবিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আজকের শিক্ষার্থীরা চাইলে মুহূর্তের মধ্যে প্রবন্ধ লিখতে, সমস্যার সমাধান করতে বা তথ্য বিশ্লেষণ করতে এআইয়ের সাহায্য নিতে পারে। কিন্তু শেখার প্রক্রিয়ায় সংগ্রামেরও একটি মূল্য আছে। কোনো সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে করতেই বিচারবোধ তৈরি হয়, সৃজনশীলতা বিকশিত হয় এবং স্থিতিস্থাপকতা গড়ে ওঠে। সবকিছু যদি যন্ত্রের কাছে সমর্পণ করা হয়, তবে দক্ষতার বিকাশের সেই গুরুত্বপূর্ণ পথ সংকুচিত হতে পারে।
এ কারণেই প্রযুক্তি নিয়ে বর্তমান বিতর্ককে শুধু উদ্ভাবনের প্রশ্ন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একই সঙ্গে ক্ষমতা, সম্মতি এবং স্বাধীনতার প্রশ্ন। প্রযুক্তি যত শক্তিশালীই হোক, ব্যবহারকারীর সম্মতি ছাড়া তাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা প্রতিরোধের মুখে পড়বেই।
সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিরোধী এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি শিল্পের বিপুল বিনিয়োগকে থামাতে পারবে না। ইতিহাস বলে, বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সাধারণত নিজেদের পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু এই প্রতিরোধের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি মনে করিয়ে দেয় যে অগ্রগতি মানেই একমুখী যাত্রা নয়। মানুষের অধিকার আছে প্রশ্ন করার, বেছে নেওয়ার এবং প্রয়োজন হলে না বলার।
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে কোনো আলোচনায় এই নীতিটি ভুলে গেলে চলবে না: প্রযুক্তি মানুষের জন্য, মানুষ প্রযুক্তির জন্য নয়।
ক্যাথরিন থরবেক 



















