২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে জাপানের অভিযান শুরু হচ্ছে রবিবার। দীর্ঘ এক যুগ পর এবার দলটিকে ঘিরে প্রত্যাশা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ২০১৪ সালে শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়ে ব্রাজিল বিশ্বকাপে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০১৮ ও ২০২২ আসরে তুলনামূলকভাবে কম প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু টানা দুটি বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে পৌঁছানো এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক উন্নতির কারণে এবার জাপানকে অনেকেই সম্ভাব্য চমক হিসেবে দেখছেন।
প্রধান কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর অধীনে গত সাড়ে তিন বছরে দলটির উন্নতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কাতার বিশ্বকাপেও দায়িত্বে থাকা এই কোচের নেতৃত্বে জাপান আত্মবিশ্বাসী এবং পরিণত এক দলে পরিণত হয়েছে।
প্রস্তুতিতে আত্মবিশ্বাসী জাপান
বিশ্বকাপের আগে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে আইসল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়েছে জাপান। এটি ছিল তাদের টানা ষষ্ঠ জয় এবং পরপর পঞ্চম ম্যাচ যেখানে তারা কোনো গোল হজম করেনি।

গোলরক্ষক জিয়ন সুজুকি মনে করেন, জাপানের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স প্রতিপক্ষদের কাছ থেকে বাড়তি সম্মান আদায় করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সম্মান পেলেও নিজেদের দায়িত্ব ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না।
একই সুর শোনা গেছে তারকা মিডফিল্ডার তাকেফুসা কুবোর কণ্ঠেও। তার মতে, কঠিন ম্যাচ জিতে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তিনি বিশ্বাস করেন, কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এবার বেশি প্রস্তুতির সুযোগ পাওয়ায় দল নিজেদের সামর্থ্য আরও ভালোভাবে প্রদর্শন করতে পারবে।
ইউরোপভিত্তিক শক্তিশালী স্কোয়াড
জাপানের ২৬ সদস্যের দলে একজন ছাড়া প্রায় সব আউটফিল্ড খেলোয়াড়ই ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেন। ফলে অভিজ্ঞতা, গুণগত মান এবং প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতার দিক থেকে দলটি বেশ সমৃদ্ধ।
এদিকে দীর্ঘদিনের চোট কাটিয়ে স্কোয়াডে ফিরেছেন ডিফেন্ডার তাকেহিরো তোমিয়াসু। প্রায় দুই বছর পর জাতীয় দলে ফিরে তিনি জানিয়েছেন, শুধু স্মৃতি তৈরির জন্য নয়, দেশের হয়ে দায়িত্ব পালন করতেই তিনি বিশ্বকাপে এসেছেন। মাঠে নামলে সর্বোচ্চটা দেওয়াই তার লক্ষ্য।
তবে সব খবর ইতিবাচক নয়। ইনজুরির কারণে স্কোয়াডে জায়গা পাননি কাওরু মিতোমা ও তাকুমি মিনামিনো। এর সঙ্গে বড় ধাক্কা আসে অধিনায়ক ওয়াতারু এন্দোর ছিটকে যাওয়ায়। পায়ের সমস্যার জটিলতায় শেষ মুহূর্তে তাকে দল ছাড়তে হয়েছে। পরে তার জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে স্ট্রাইকার শুতো মাচিনোকে।

দলের শক্তি দলগত মানসিকতায়
বিশ্বকাপের আগে এন্দো জোর দিয়েছিলেন দলগত চেতনার ওপর। তার মতে, ব্যক্তিগত নায়ক হওয়ার চিন্তার চেয়ে দলের সাফল্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আইসল্যান্ড ম্যাচের উদাহরণ টেনে তিনি দেখিয়েছেন, বদলি খেলোয়াড়দের অবদানই জয় এনে দিয়েছে। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে শুধু প্রথম একাদশ নয়, পুরো স্কোয়াডের প্রস্তুতি ও অংশগ্রহণই সাফল্যের চাবিকাঠি।
এবার মিতোমার অনুপস্থিতিতে বাঁ প্রান্তে বড় দায়িত্ব নিতে হবে কেইতো নাকামুরাকে। তবে তিনি বাড়তি চাপ অনুভব করছেন না বলে জানিয়েছেন। তার মতে, অনুপস্থিত খেলোয়াড়দের নিয়ে ভাবার চেয়ে যারা আছেন তাদের নিয়েই জয়ের পথ খুঁজে বের করা জরুরি।
অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের মেলবন্ধন
জাপানের ১৩ জন খেলোয়াড় এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছেন। তরুণদের মানসিক চাপ কমাতে স্কোয়াডে রাখা হয়েছে অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ইউতো নাগাতোমোকে।

৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার তার পঞ্চম বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছেন, যা কোনো এশীয় খেলোয়াড়ের জন্য প্রথম। তিনি মনে করেন, দলের পরিবেশ ইতিবাচক রাখা এবং তরুণদের চাপমুক্ত রাখা তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
নাগাতোমোর ভাষায়, একটি দল জীবন্ত সত্তার মতো। প্রতিদিন পরিস্থিতি বদলায়, তাই তরুণদের এমন পরিবেশ দিতে হবে যাতে তারা মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে পারে।
নতুন ইতিহাসের অপেক্ষায়
গত কয়েকটি বিশ্বকাপে ধারাবাহিক উন্নতির মাধ্যমে জাপান নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। তবে এবার লক্ষ্য শুধু শেষ ষোলো নয়, আরও অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া। অভিজ্ঞতা, প্রতিভা, শৃঙ্খলা এবং দলগত মানসিকতার সমন্বয়ে সামুরাই ব্লু এখন নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে। সেই স্বপ্ন কতদূর বাস্তব হয়, তার উত্তর মিলবে আগামী কয়েক সপ্তাহেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















